সমাজবিজ্ঞানের প্যারাডাইম ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্যরাডাইমের পার্থক্য
সমাজবিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্যারাডাইমের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। এ সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো:
সমাজবিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্যারাডাইমের পার্থক্য
১। সমাজবিজ্ঞানের প্যারাডাইম বৈজ্ঞানিকভাবে এক বা একাধিক তত্ত্বকে নির্মাণ করতে ব্যবহৃত হয়। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের Paradigm পৃথিবীর অজ্ঞাত ধারণার ও বিষয়বস্তুর তত্ত্ব নির্মাণে গঠিত হয়।
২। সমাজবিজ্ঞানের প্যারাডাইম সম্পূর্ণ নতুন ধারণা এবং জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়েছে। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্যারাডাইম এর ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণার বিষয়বস্তু পরীক্ষাগারে এনে পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে তত্ত্ব নির্মাণ করে থাকেন।
৩। সমাজবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়বস্তুকে গবেষণাগারে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আনা যায় না। মূলত সমাজবিজ্ঞানে কোনো পরীক্ষাগার নেই। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে একজন পদার্থবিজ্ঞানী গবেষণার বিষয়বস্তু গবেষণাগারে এনে তা যথেচ্ছা ব্যবহার করেন এবং ফলাফল সংক্ষিপ্ত করে তত্ত্ব নির্মাণ করেন।
৪। সমাজবিজ্ঞানের জন্য কোনো নিরপেক্ষ মানদন্ড নেই। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের Paradigm এর নিরপেক্ষ মানদণ্ড আছে।
৫। সমাজবিজ্ঞান প্যারাডাইমের মাধ্যমে অপ্রাণীবাচক বিষয় নিয়ে অধ্যয়ন করে। এখানে গবেষণার সময় যতটা সম্ভব বস্তুনিষ্ট থাকার চেষ্টা করা হয়। প্রাকৃতিক বিজ্ঞান প্রাণীবাচক বিষয় নিয়ে গবেষণা করে প্যারাডাইম তৈরি করে।
৬। সমাজবিজ্ঞানে প্রত্যয়ের ধারণা প্রদান করা হয়। সম্ভাব্যতার উপর গুরুত্ব কমিয়ে গুপ্ত অনুমান ও প্রত্যয়সমূহের ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ১০০% সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। এখানে সম্ভাব্যতা বা অনুমানের কোনো ভিত্তি নেই।
৭। সমাজবিজ্ঞানে পুঞ্জিভূত তত্ত্বসমূহের কার্যকর ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। এটি সমাজবিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় প্রত্যয়সমূহের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করে। অপরদিকে, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে গাণিতিক প্রতীকের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়।
৮। সমাজবিজ্ঞানে প্রত্যয়সমূহের সুসম্বন্ধকরণ করা হয়। গুণবাচক বিশ্লেষণের সারসংক্ষেপকরণ করতে সমাজবিজ্ঞানের Paradigm অনন্য ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে পরিমাণবাচক ও সংখ্যাত্বক পরিমাপ করা হয়।
৯। সমাজবিজ্ঞানীরা গুণবাচক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে থাকে। যেমন-বয়স, জন্মাহার সংখ্যা, মৃত্যুহার, শিক্ষার হার প্রভৃতি। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে পদার্থবিজ্ঞানীরা কতকগুলো প্যারাডাইম ঠিক করে নেন এবং পরে তা তত্ত্বে পরিণত করেন। বিজ্ঞানীদের এই প্যারাডাইমগুলোর একটা সার্বজনীন গুরুত্ব আছে।
১০। সমাজবিজ্ঞানে পুরাতন সমাজতাত্ত্বিক প্যারাডাইম ধ্রুপদী সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। যেমন- দৃষ্টবাদ, ক্রিয়াবাদ, কাঠামোবাদ ইত্যাদি। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে প্যারাডাইম পুরাতনকে পাত্তা না দিয়ে সবসময় নতুন নতুন দিক খুঁজে বের করে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করে।
১১। সমাজবিজ্ঞান গতিশীল ও পরিবর্তনশীল। সমাজবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু মানুষ জানে তাকে নিয়ে কী গবেষণা করা হচ্ছে এবং সেই আলোকে নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে। অপরদিকে, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে অণুজানে না বিজ্ঞানীরা তার সম্পর্কে কী চিন্তা করছে অথবা সেই জ্ঞানের আলোকে অণু তার আচরণ পরিবর্তন করতে পারে না।
১২। সমাজবিজ্ঞানে যেকোনো ঘটনা বিশ্লেষণে মূল্যবোধের মানদণ্ড রয়েছে। অন্যদিকে, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে নতুন অনুঘটকের উপস্থিতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে মানদণ্ড তৈরি করে প্যারাডাইম ঠিক করা হয়।
১৩। সমাজবিজ্ঞানে স্থান-কাল পাত্রভেদে প্রত্যয়ের প্রপঞ্চসমূহকে পৃথক করা যায়। যেমন- পশ্চিমা কোনো এক দেশের সংস্কৃতি ও এশিয়ার কোনো এক দেশের সংস্কৃতি এক নয় বরং ভিন্ন ও পৃথক। কিন্তু, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে স্থান-কাল পাত্রভেদে প্রাণী বা বস্তুকে পৃথক করা যায় না। একই অণু বা কণার কার্যক্রম সমগ্র পৃথিবীতে এক। যেমন- সূর্যের আলো। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্যারাডাইম নির্মাণে সমগ্র পৃথিবীর প্রকৃতিকে একইসূত্রে গেঁথে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সমাজবিজ্ঞানের প্যারাডাইম ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্যারাডাইমের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ করা যায়। তবুও এগুলো সামান্যকীরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুসন্ধান করে কাজের ফলাফল যাচাই করা হয়। সৃষ্টির শুরুর দিকেই প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের শুরু কিন্তু মানব সভ্যতার উন্নতির ফলে আধুনিক যুগে সমাজবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা ঘটেছে। এখানে মানুষ ও তার সমাজ নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা করা হয়। কিন্তু প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে প্রকৃতির বিষয়বস্তুর উপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
