সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের সামান্যীকরণের স্বরূপ আলোচনা
ভূমিকা: সমগ্র সমাজব্যবস্থায় জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় কতটুকু প্রয়োজনীয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা আছে সেটা নির্ধারণ করা হয় সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের মাধ্যমে। এ প্রেক্ষিতে একটি বিষয়কে বিজ্ঞান হতে হলে বিষয়টির তাত্ত্বিক সামাজীকরণ ও সর্বজনীয়তা অবশ্যই থাকতে হবে।
সাধারণীকরণ বা সামান্যীকরণ হচ্ছে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের নির্ধারক। কোনো একটি বিষয়কে বিজ্ঞানের মর্যাদা পেতে বিষয়টির সামান্যীকরণ থাকা অপরিহার্য। একটি তত্ত্বের সর্বজনীনতা কতটুকু সেটা নির্ভর করে সেই তত্ত্বের সামান্যীকরণের ওপর। সাধারণভাবে বলা যায়, সামান্যীকরণ হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যা অনুসন্ধান কাজের ফলাফল যাচাই এর জন্য ব্যবহৃত হয়।
সামাজিক তত্ত্বে সামান্যীকরণ
এম. জিন্সবার্গ (M. Ginsberg) তাঁর "Reason and Unreason Society" গ্রন্থে বলেন, 'A generalization is a general proposition rearing classes objects or elements or the existence of a definite relationship among types of events or objects or classes.'
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এর পক্ষে মতামত যাচাইয়ের জন্য ১০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিকের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণা থেকে যদি দেখা যায় যে, তারা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পক্ষে, তাহলে গবেষক বলতে পারেন যে, বাংলাদেশের সকল মানুষই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এর পক্ষে। এটিই হলো সামান্যীকরণ। তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিশ্লেষণের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরের ধাপ সামান্যীকরণ। মূলত গবেষণার ফলাফল যখন নমুনার ওপর ভিত্তি করে সামগ্রকের ক্ষেত্রে সত্য হয় তখনই তা সামান্যীকরণ। একটি তত্ত্বের সামান্যীকরণের যথার্থতা ও ব্যাপ্তিতা যত বেশি হবে তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতাও তত বেশি হবে। অর্থাৎ গবেষণার ফলাফল যদি স্থান, কাল, পাত্র পেরিয়ে যায় তা সূত্র বা তত্ত্বে পরিণত হতে পারে। কোনো একটি তত্ত্ব সম্পর্কে যে সামান্যীকরণ করা হয় তা ভবিষ্যতে গবেষণার দিক ও ফাঁক নির্দেশ করে। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে সামান্যীকরণ হয় তা প্রকৃতিগতভাবে অস্থায়ী থাকে যাকে Variable Generalization or Approximate Generalization বলা হয়। সমাজবিজ্ঞানে সাধারণীকরণ বা সামান্যীকরণের দুটি রূপ দেখা যায়। ১। অভিজ্ঞতামূলক সাধারণীকরণ বা সামান্যীকরণ। (Empirical Generalization) ২। বিশ্লেষণাত্মক সাধারণীকরণ বা সামান্যীকরণ। (Analytical Generalization)
১। অভিজ্ঞতামূলক সামান্যীকরণ:
এই ধরনের সামান্যীকরণ অভিজ্ঞতামূলক অথবা পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে কারণ নির্ণয়ের বিষয়টি মুখ্য নয় বরং অবস্থাটি কেমন হবে তাই মুখ্য।
২। বিশ্লেষণাত্মক সামান্যীকরণ
বিশ্লেষণাত্মক সামান্যীকরণে গবেষক তার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গবেষণালব্ধ বিষয় সম্পর্কে একটি ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন এবং বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে একটি কার্যকারণ (Causation) সম্পর্ক নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। একে অভিজ্ঞতামূলক সামান্যীকরণের পরবর্তী ধাপ হিসেবে গণ্য করা হয়।
সমাজবিজ্ঞানের সামান্যীকরণ বা সাধারণীকরণ ও তার সীমাবদ্ধতা:
একটি অ্যাকাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে সমাজবিজ্ঞানের প্রধান প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সর্বজনীন কোনো একটি সত্য হলে সমাজবিজ্ঞানে নেই এবং কখনো ছিল না। যদিও অগাস্ট কোঁতের প্রচেষ্টা ছিল সমাজবিজ্ঞানকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মর্যাদায় উন্নীত করা যার জন্য প্রয়োজন সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্বের সাধারণীকরণের প্রতিষ্ঠা কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের পক্ষে সামান্যীকরণ প্রতিষ্ঠা করা সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। বস্তুত সমাজবিজ্ঞানের in তাত্ত্বিক সাধারণীকরণ নির্মাণে সীমাবদ্ধতা স্বীকৃত। কিন্তু তারপরেও সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক সাধারণীকরণের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকায় কিছু সাধারণীকরণ সূত্র দেখা যায়। Classical একটি মৌল সামাজিক নিয়ম আবিষ্কার করেছেন। বিশেষ করে বা ধ্রুপদি সমাজবিজ্ঞানীগণ নিঃসন্দেহে ভেবেছিলেন যে, তারা সমাজ বিবর্তন প্রক্রিয়ায় সেগুলো চিন্তা ও কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হয়। কিন্তু অনেক সমাজবিজ্ঞানী এ দাবির পক্ষে একমত পোষণ করেননি। যেহেতু সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্বসমূহের ফক্কাফল, স্থান, কাল, পাত্রভেদে অভিন্ন থাকে না তাই প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো সমাজবিজ্ঞানের একটি মৌল সামাজিক নিয়ম আবিষ্কার করা দুরূহ ব্যাপার। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তুলনায় সামাজিক বিজ্ঞানের কয়েকটি দিকে সীমাবদ্ধতার কারণে সমাজবিজ্ঞানে কোনো বস্তুনিষ্ঠ সর্বজনীন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সীমাবদ্ধতাগুলো নিম্নরূপ-
i. পরিবর্তনশীল বিষয়বস্তু:
প্রাকৃতিক বিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয়বস্তু অপরিবর্তনীয়, কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয়বস্তু পরিবর্তনশীল। ফলে বিভিন্ন গৃহীত সিদ্ধান্তের পরিবর্তন ঘটে থাকে।
ii. গবেষণার উপাদানের ভিন্নতা:
গবেষণার উপাদান হলো জড় পদার্থ, যা সকল স্থানেই প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অভিন্ন বৈশিষ্ট্যসংবলিত। ফলে তাদের গুণাগুণ সম্পর্কিত সামান্যীকরণ সূত্র সর্বদাই সঠিক। অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়বস্তু হচ্ছে মানব প্রকৃতি ও সমাজ, যা বৈচিত্র্যময় ও পরিবর্তনশীল। ফলে সামান্যীকরণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেও তা সবসময় নির্ভুল হয় না।
iii. নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা:
প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের গবেষণাকার্য বিজ্ঞানীর নিয়ন্ত্রণে থাকে। অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানীর গবেষণাক্ষেত্র বাহ্যিক হওয়ায় তা অধিকাংশ সময় সমাজবিজ্ঞানীর নিয়ন্ত্রণে থাকে না। ফলে সিদ্ধান্তে ভুল থাকার সম্ভাবনা থাকে।
iv. সিদ্ধান্তের যথার্থতা:
প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও পরীক্ষিত সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সামান্যীকরণ সূত্র সর্বদাই সঠিক। অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানীর গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো অনেকাংশে আনুমানিক ও শর্তসাপেক্ষ হওয়ায় সর্বজনীন সাধারণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
v . মূল্যবোধ নিরপেক্ষতা:
সমাজতাত্ত্বিক বিচার-বিশ্লেষণকে 'নৈতিকতা নিরপেক্ষ' (Ethically neutral) এবং 'মূল্যবোধ মুক্ত' যে সমাজবিজ্ঞানী তিনি হলেন জার্মানির ম্যাক্স ওয়েবার (Max (Value-free) রাখতে সবচেয়ে জোরালো আবেদন রেখেছিলেন Weber)। তাঁর মতে, কেবল মূল্যবোধমুক্ত দৃষ্টিভঙ্গিই পারে সমাজবিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের পর্যায়ে উন্নীত করতে। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গবেষণার বিষয় হচ্ছে সমাজ এবং তার সদস্যবৃন্দ। আর যিনি গবেষক তিনি ঐ সমাজের অন্তর্ভুক্ত, যার ফলে তার পবেষণাকর্ম সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষ হয় না। আর এ ধরনের গবেষণা করে কোনো সাধারণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলেও তা অনেক কষ্টসাধ্য কাজ।
vi. সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি:
সমাজবিজ্ঞানে বিষয়বস্তুর গবেষণায় কোনো সর্বসম্মতি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি সৃষ্টি হয়নি। ফলে বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকেন। অন্যদিকে, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানীদের সর্বসম্মত পদ্ধতি হলো পরীক্ষা (Experiment), ফলে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তুলনায় সমাজবিজ্ঞানের সামান্যীকরণ কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ।
vii. মতপার্থক্য:
সমাজবিজ্ঞানে কোনো বিশেষ সামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নীতি ও তত্ত্বসমূহের ব্যাখ্যাও গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা যায়। যেমন- বর্তমান সমাজে মার্কসবাদ না ক্যালভিনবাদ কোনটি বেশি কার্যকরী, এ নিয়ে ব্যাপক মতপার্থক্য আছে। কিন্তু ভৌতবিজ্ঞানে এ জাতীয় মতবিরোধ নেই।
উপর্যুক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, সমাজবিজ্ঞানের সর্বজনীন তাত্ত্বিক নির্মাণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু তারপরেও সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক সাধারণীকরণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী M. Ginsberg তাঁর "Reason and Unreason in Society" গ্রন্থে সামাজিক বিজ্ঞানসমূহের যেসব সাধারণ কথা কর। সম্ভব সেগুলোকে ছয় ভাগে ভাগ করেছেন। যা নিম্নরূপ-
১. যে সামান্য সূত্রের সাহায্যে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সামাজিক ঘটনাবলির মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করা সম্ভব, যেমন- শহরের জীবন ও বিবাহবিচ্ছেদের হারের মধ্যে সম্পর্ক।
২. যে সাধারণ সূত্রের সাহায্যে কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তনের ফলে অন্য প্রতিষ্ঠানের অনিবার্য পরিবর্তনের হার তুলে ধরে। যেমন: মার্কসীয় তত্ত্ব অনুযায়ী শ্রেণি কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে সমাজজীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের পরিবর্তন।
৩. যেসব সাধারণ সূত্র সামাজিক প্রতিষ্ঠান বা শার বর শর্তগুলোকে সূত্রায়িত করে, যেমন- পুঁজিবাদের উদ্ভব সম্পর্কে বিভিন্ন বিবৃতি।
৪. যেসব সাধারণ সূত্র সমাজজীবনের নানাধরনের পৌনঃপুনিকতা অথবা পূর্ব পরস্পরকে স্পষ্ট করে দৃষ্টিগোচর করে। যেমন-সমাজবিজ্ঞানীরা অর্থনৈতিক বিকাশের ধারায় বিভিন্ন পথকে যেভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন।
৫. যেসব সামান্য সূত্র সমগ্র মানবজীবনের অভিব্যক্তির মূল প্রবণতাগুলোকে ব্যাখ্যা করে। যেমন- ইতিহাসের ধারা সম্পর্কে মার্কসীয় তত্ত্ব, হব হাইজের সমাজবিকাশের তত্ত্ব ইত্যাদি।
৬. যেসব সাধারণ সূত্র মানুষের আচরণসম্পর্কিত স্বীকৃত অঙ্গীকারগুলোর প্রকৃত অর্থ প্রকাশ করে। যেমন- অর্থনীতি তত্ত্বের কিছু সূত্র।
সর্বোপরি, এসব সাধারণ বা সামান্য সূত্রের বিস্তৃতি এক রকম নয় এবং এগুলো একই স্তরের নয়। প্রমাণ যোগ্যতার দিক থেকেও এদের মধ্যে সামঞ্জস্য নেই।
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, সমাজবিজ্ঞানে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের সামান্য বা সাধারণ সূত্রের রীতিবদ্ধ উপস্থাপনা ও মূল্যায়নের চেষ্টা খুব কমই হয়েছে। তথাপি সমাজবিজ্ঞানীদের অনুসন্ধিৎসা, অনুশীলন পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণরূপে বিজ্ঞানসম্মত। তবে সামগ্রিক বিচারে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সাথে এর কিছু পার্থক্য থাকার কারণে বলা যায়, সমাজবিজ্ঞান বিজ্ঞানসমূহের সমগোত্রীয় কিন্তু বিজ্ঞান পদবাচ্য নয়। যার ফলে সমাজতাত্ত্বিক সামান্যীকরণের স্বরূপ প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো অতটা শক্তিশালী নয়। তবে প্রত্যক্ষভাবে অভিজ্ঞতালব্ধ পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত ব্যাপক সামান্য সূত্র গঠনের দিকে মনোনিবেশ করলে সমাজবিজ্ঞানে সামান্যীকরণ সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হবে।
