বাংলাদেশে প্রবীণ নারীদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগসমূহ মুল্যায়ন কর

বাংলাদেশে প্রবীণ নারীদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগসমূহ 

ভূমিকা: মানবসভ্যতা ক্রমান্বয়ে যন্ত্রনির্ভর, কর্মমুখী, ব্যস্ত ও জটিল হয়ে পড়ছে। ফলে নির্ভরশীল প্রবীণ জনগোষ্ঠী অধিকমাত্রায় অসহায় হয়ে পড়ছে। বার্ধক্যে নারীদের অবস্থা আরও করুণ হচ্ছে। বার্ধক্য বর্তমানে একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। প্রবীণ নারীদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

প্রবীণ নারীদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ

প্রবীণ নারীদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ

বর্ষীয়ানদের জন্য বিবিধ সাহায্য-সহযোগিতার ক্ষেত্রে নানারকম কর্মসূচির গরিকল্পনা ও প্রয়োগ পরিচালিত হয়। এই সমস্ত কর্মসূচির মধ্যে কতকগুলো সরকারি ও বেসরকারি। এই পরিকল্পনার উদেশ্য হলো বয়স্ক জনগোষ্ঠীর শারীরিক ও জৈবিক, মানসিক, অর্থনীতিক এবং সামাজিক সমস্যাসমূহের সমাধান। এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত সাহায্য-পরিকল্পনাগুলো (১) দিবা পরিচর্যা কেন্দ্র (২) চিকিৎসা পরিষেবা (৩) বৃদ্ধাবাস (৪) অ-প্রাতিষ্ঠানিক পরিষেবা।

১. দিবা পরিচর্যা কেন্দ্র:

পরিবারের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে এই কেন্দ্রগুলো পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তিবর্গের দায়ভার বহন করে থাকে। এখানে বয়স্ক মানুষের পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হয়। শহর, আধা-শহর, গ্রাম এবং আদিবাসী এলাকায় এই সমস্ত কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে।

২. চিকিৎসা পরিষেবা:

চিকিৎসা পরিষেবার উদ্দেশ্য হলো শহর, গ্রাম ও বিস্তীর্ণ বস্তিবাসীদের এলাকার উন্নতমানের চিকিৎসা পরিষেবার সহায়তা সুলভে সহজলভ্য করা। যে সমস্ত স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ চিকিৎসা পরিষেবার সামর্থ্য আছে, তাদের মাধ্যমে বর্ষীয়ানদের জন্য এরকম প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

৩. বৃদ্ধাবাস:

বার্ধক্য সমস্যার মোকাবিলায় বৃদ্ধাবাস প্রকল্প হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। এই সমস্ত বৃদ্ধাবাসে সাধারণত নিম্ন আয়ের ও নিম্ন মধ্যম আয়ের বৃদ্ধদের আবাসিক হিসেবে নেওয়া হয়ে থাকে। ক্ষেত্রবিশেষ সম্পূর্ণ সরকারি সাহায্য বা সেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে পরিচলিত বৃদ্ধাবাসে নির্দিষ্ট চুক্তির মাধ্যমে বর্ষীয়ানরা আবাসিক হিসেবে বসবাস করেন। এই সমস্ত বৃদ্ধাবাসে বর্ষীয়ান ব্যক্তিদের শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থসামাজির পরিষেবার ব্যবস্থা করেন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, মনোবিদ ও সমাজকর্মী।

৪. অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিষেবা:

অপ্রাতিষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রতিষ্ঠান বহির্ভূত পরিষেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে সমাজকর্মী নিয়োগ করা হয়। সংশ্লিষ্ট সমাজকর্মীদের মাধ্যামে বর্ষীয়ান নানারকম অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিষেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। এ ধরনের পরিষেবা প্রদানের উদাহরণ হিসেবে বিভিন্ন আইনি পরামর্শ প্রদান, আয়কর বিষয়ক পরামর্শ প্রদান, অবসরকালীন ভাতা বিষয়ক পরামর্শ প্রদান ব্যবস্থা বলা হয়।

৫. অন্যান্য সরকারি পদক্ষেপ:

অন্যান্য প্রকল্পের মাধ্য নিম্নের বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য।

(ক) বর্ষীয়ান নাগরিকদের আয়কর ছাড়ের ব্যবস্থা।

(খ) বর্ষীয়ান নাগরিকদের রেলের যাতায়াত ব্যবস্থার উপর ছাড়ের ব্যবস্থা।

(গ) দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থিত ৬৫ বছরের উধ্বসীমার জন্য কেন্দ্রীয় প্রকল্পের মাধ্যমে মাসে চাল বা গম বিনামূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

(ঘ) বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা প্রাকৃতি প্রদানের ব্যবস্থা।

বার্ধক্যের সমস্যা সমাধানে বার্ধ্যবিদ সমাজবিজ্ঞানীদের পদক্ষেপ

বার্ধক্যবিদ সমাজবিজ্ঞানীরা বার্ধক্যের সমস্যাদির সম্যক ও সার্থক মোকাবিলার ব্যাপারে কতকগুলো বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে সুপারিশ করে থাকেন। সংশ্লিষ্ট সুপারিশসমূহের মধ্যে কতকগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই সমস্ত সুপারিশমূলক পদক্ষেপের কতকগুলো ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণের কথা বলা হয়।

১. বার্ধক্য সহায়তা প্রকল্পসমূহ প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই কম। এক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।

২. বার্ধক্যের সমস্যাদির মোকাবিলায় তাদের জীবনধারার মান, পরিস্থিতি, প্রয়োজনীয়তা প্রভৃতি গবেষণা ও উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা আছে।

৩. বার্ধক্য, সহায়তা প্রকল্পসমূহের সরকারকে অধিকতর ব্যয়ভার বহন করতে হবে। প্রকল্প প্রদানের আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থা সাম্পর্কে সবরকম খবরা-খবর নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।।

৪. সামাজিক গুরুত্ব প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে বয়স্ক ব্যক্তিদের অবসর, অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতাকে সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

৫. বয়স্ক ব্যক্তিদের কিছুটা আর্থিক স্বনির্ভর সৃষ্টির লক্ষ্যে আংশিক সময়ের জন্য অর্থকরী কাজে কর্মে নিয়োগের ব্যবস্থা বাঞ্ছনীয়।

৬. চিকিৎসাবিদ এবং অন্যান্য বৃত্তিমূলক পাঠ্যক্রমে বার্থক্যবিদ্যাকে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। বার্ধক্যবিদ্যার পঠন-পাঠন ও চর্চা গুরুত্বসহকারে হওয়া দরকার।

৭. বয়স্ক ব্যক্তিদের পরিষেবার কাজে নিযুক্ত কর্মীদের প্রয়োজনমতো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। তাছাড়া বার্ধক্যপীড়িত মানুষজনের সম্যক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবার জন্য সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও পৃথক পরিষেবার ব্যবস্থা থাকা দরকার।

৮. সচেতনতামূলক সকল কর্মসূচিকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে সংগঠিত ও পরিচালিত করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিসমূহের প্রয়োজনীয় বিকেন্দ্রীকরণ বাঞ্ছনীয়।

৯ সাবেকি যৌথ পরিবায়সমূহকে সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল এবং পারিবারিক দায়বদ্ধতা ছিল। সংশ্লিষ্ট মূল্যবোধসমূহকে পুনঃসামাজিকীকরণ এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে করা প্রয়োজন।

১০. বর্ষীয়ানদের সহায়তাদান কর্মসূচি আর্থসামাজিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পরিপেক্ষিতে ভারসাম্যভাবে প্রশস্ত করতে হবে।

১১. উন্নত দেশসমূহের বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বার্ধক্য পরিষেবার ক্ষেত্রে স্বোচ্ছাসেবী সংস্থাসমূহের সঙ্গে শিক্ষিত প্রগতিশীল ব্যক্তিবর্গকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোকে মুনাফালোভী মানসিকতা ছাড়তে হবে।

বার্ধক্যের সমস্যাদি সমাধানের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পর্যায়ে পদক্ষেপ

বার্ধক্যের সমস্যা সমাধনের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। এ সমস্ত পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

(ক) বার্ধক্যজনিত শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে যথাসম্ভব হ্রাস করার জন্য ব্যক্তিগতভাবে কতকগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা দরকার।

এই স্বাস্থ্যবিধিগুলো হলো নিয়মিত জীবনপ্রণালি, পরিমিত শরীর চর্চা, নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রভৃতি। বর্ষীয়ান মানুষদের মানসিকভাবে সুস্থ থাকার এবং মানসিক চাপ হ্রাসের উপায়/পদ্ধতিসমূহ আয়ত্ত করাতে হবে।

(খ) বয়স্ক মানুষদের অবসর সময়েই সঠিক ব্যবহারের ব্যাপারে অধিকতর মনোযোগী হতে হবে। বিশেষ অর্থকরী শখ অনুসরণ করা, শাক-সবজি বা ফুলের বাগানে কাজ করা, অন্যান্য হালকা কাজকর্মের শামিল হওয়া প্রভৃতি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

(গ) বিবিধ স্বোচ্ছামূলক সেবাপ্রদান প্রকল্পসমূহের সঙ্গে অবসরপ্রাপ্তদের সংযুক্ত হতে হবে।

(ঘ) বর্ষীয়ানদের প্রতি সেবাদানের মানসিকতা, মূল্যবোধ পরিবারের সকলের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে।

(ঙ) বার্ধক্য, পরনির্ভরতাকে যথার্থ ও সুনিশ্চিত করার অন্য কর্মজীবনে অর্থ সঞ্চয়ের অভ্যাস আয়্তে করতে হবে।

(চ) প্রতিকূল পরিস্থিতি ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করার মানসিকতা ও অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

(ছ) ভারসাম্যহীনতা ও একাকিত্ববোধ আটকানো দরকার। তার জন্য প্রয়োজন হলো সামাজিক কাজকর্মে শামিল হওয়া, সমষ্টির অন্তর্ভুক্ত প্রভৃতি।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে প্রবীণ নারীদের সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগসমূহ সত্যিই প্রশংসনীয়। বর্তমানে এর কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তবুও আধুনিকায়নের কল্যাণে প্রবীণ মারীদের ঘরে বসেই সেবাদান প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

No comments:

Post a Comment