ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারী কারা? নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা কর

ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারী কারা? মাইনোরিটি গ্রুপ হিসেবে নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা

ভূমিকা: কোনো মানুষের ৪০% বা তার চেয়ে বেশিমাত্রায় শারীরিক অসমর্থতাই হলো অক্ষমতা। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার মতে, অক্ষমতা হচ্ছে শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, মানসিক, অনুভূতি, বেড়ে ওঠা বা এগুলোর সমন্বিত ফলসম্পন্ন আঘাত যা কোনো ব্যক্তির স্বাভাবিক কাজে অংশগ্রহণের সক্ষমতার ক্ষেত্রে শাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। এই অক্ষমতা জন্মের সময় থেকে বা জীবনের যেকোনো সময় হতে পারে। অক্ষমতা হচ্ছে দুর্বলতা, কর্মসম্পাদনের সীমাবদ্বতা বা অংশগ্রহণের প্রতিবন্ধকতা।

ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারী কারা? নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা

ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারী:

"We are not disabled, we are differently abled" বস্তুত disabled, handicapped প্রস্তুতি

নেতিবাচক শব্দ পরিহার করে অধিকতর ইতিবাচক হিসেবে ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়।

Differently abled প্রত্যয়টি সর্বপ্রথম disabled-এর বিকল্প শব্দ হিসেবে ১৯৮০ সাল থেকে ব্যবহৃত হতে থাকে। US Democratic National Committee ১৯৮০ দশকের শুরুতে এই শব্দটি ব্যবহার শুরু করে। ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম দ্বারা অধিক ইতিবাচকতা প্রকাশ পায়, যা ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্য দূর করতে সহায়ক হয়। ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম দ্বারা প্রকাশ করা হয় যে অনেক মানুষের অসমর্থতা থাকলেও, এই ব্যক্তিকে দিয়ে ব্যতিক্রমভাবে কোনো কাজ করা সম্ভব।

ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারীরা শুধু শারীরিক বা মানসিকভাবেই নয়, তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা সমাজ থেকে না পাওয়ার কারণেই তাদের অক্ষমতা প্রকাশ পায়। সমাজের দলিত, আদিবাসী যবা অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর তুলনায় ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম মানুষের অধিকারের বিষয়টি অতি সাম্প্রতিক আলোচিত হচ্ছে। যদিও ঐতিহাসিককাল থেকেই সমাজে এ ধরনের মানুষের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। আমাদের দেশে অসমর্থতা, অক্ষমতা, কানা, মুড়া ইত্যাদি শব্দ একই অর্থে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অনেকে ক্ষেত্রে এ ধরনের শব্দগুলো মানুষকে অপমানিত করে এবং কষ্ট দেয়।

ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারীর সংখ্যা কিন্তু কম নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৫ জন নারীর ১ জন কোনো না কোনোভাবে ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম এর কারণে সংখ্যালঘু হয়। বস্তুত নিজের যত্ন নিতে না পারা, কায়িক শ্রম দিতে না পারা, হাঁটতে না পারা, দেখতে না পাওয়া, শুনতে না পাওয়া, বলতে না পারা, শ্বাসকই, পড়তে না পাড়া এবং কাজ করতে না পারা জনিত ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারীর সংখ্যাই বেশি।

পরিশেষে বলা যায়, ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারী যে জাতি, বর্ণ, ধর্মের বা যেকোনো সামাজিক, অর্থনৈতিক গোষ্ঠীরই হোক না কেন, তাদের মূলত কোনো না কোনো অক্ষমতা বা দুর্বলতা রয়েছে। ফলে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে তাদের যেমন সমস্যা হয় তেমনি গৃহে, বিদ্যালয়ে, কর্মস্থলে এমনকি সমাজজীবনে বিভিন্ন বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়।

নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশ গ্রামপ্রধান একটি দেশ, অধিকাংশ জনগোষ্ঠী এখানে অর্থাৎ গ্রামে বাস করে। এদের অর্ধেকেই নারী। এই জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অত্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী, সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ। নারীরা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সবচেয়ে পশ্চাৎগদ, অবহেলিত নির্বাচিত।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি:

বাংলাদেশি সমাজে নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক নয়। নারীকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখা হয় না। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা নারীকে আদর্শ, কোমলমতি, ভদ্র, নম্র, গৃহলক্ষী হিসেবে দেখতে ভালোবাসে। সমাজে নারী সম্পর্কে অনেক ধারণা রয়েছে, সেগুলো হলো- নারী হবে ঘরের লক্ষী, নারী ঘরের শোভা, নারী হবে নরম কোমল সহনশীল ও পতিসেবক, নারীর ইচ্ছা তার স্বামী ও পরিবারের ইচ্ছার কাছে সমর্পিত হবে, নারী লজ্জাশীল হবে ইত্যাদি।

পারিবারিক কাঠামো:

নারীর অধস্তনতার অন্যতম কারণ হলো পরিবারের পদক্রমিক কাঠামো। কেননা পারিবারিক কাঠামোর মাধ্যমে তৈরি হয়েছে পুরুষের মর্যাদাবোধ এবং পারিবারিক পদক্রম। পদক্রমের উচ্চে থাকে পুরুষ কেবল পুরুষের অনুপস্থিতিতে নারীরা দায়িত্ব পান। সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীর অবস্থান সর্বনিম্ন।

পুরুষের প্রতিনিধিত্ব

এদেশের পরিবার প্রধান পুরুষ তাই পরিবারের মুখপাত্র হিসেবে পরিবার প্রধানই প্রতিনিধিত্ব করে। এক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা পালনের কোনো সুযোগ নেই। নারীর অবস্থান সারাজীবন পরিবারের মাঝে। পরিয়ারের মধ্যেই তাদের জীবন কাটে। কখনো কন্যা, কখনো স্ত্রী, কখনো মাতা, কখনো ভগিনী হয়ে।

লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন

পরিবারে লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন পরিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারীর অধস্তনতার অন্যতম একটি কারণ। পরিবার গড়িতে কাজ করে বলে যায়ী নগদ অর্থ আয় করতে পারে না এবং তার সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পুরুষের তুলনায় কম।

পুরুষ ও নারীর বৈষম্যতা

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় নারীর নিম্ন মর্যাদার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে পুরুষ কর্তৃক পরিবারের খানা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব বহন। যেহেতু পুরুষই পরিবারের সর্বেসর্বা সেহেতু তারাই প্রয়োজনীয় কেনাকাটায় অর্থ জোগান দেয়। ফলে নারীদের ভূমিকা কমে যায়। পুরুষতন্ত্র পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারীর ভূমিকাকে সর্বনিম্নে দাঁড় করায়। কারণ সমাজে বিদ্যমান রীতিনীতি, আইনকানুন, ধর্ম, প্রথা প্রতিষ্ঠান সবয়িত্ব পুরুষের স্বার্থের সহায়ক এবং নারী স্বার্থের পরিপন্থি। নারীর বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু হয় তার পরিবার থেকেই অতি নিকট আপনজন দ্বারা। মেয়ে শিশুর জন্মলগ্ন থেকে বৈষম্য শুরু হয়। ছেলেজন্ম নিলে আজান দেয় আর মেয়ে শিশু জন্ম নিলে আজান দেয় না। এটা একটা নেতিবাচক দিক। পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ নারীকে অধস্তনতায় নিপতিত করে। আর সে অধস্তনতাকে স্থায়ী করার জন্য পুনরায় অধস্তনতার প্রাতিষ্ঠানিক কারণ করে থাকে।

নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণযাত্রা কাছের লোকজনদের থেকে শুরু হয়। পিতৃভূমিকায় উত্তীর্ণ বাবা সবসময় মেয়েদের শিক্ষা, আচরণ, জীবনযাপনের ধরনাক নির্দিষ্ট এ নিয়ন্ত্রিত করে দেয়। অন্যদিকে, মাতা ও পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসী মেয়েকে সমাজের সনাতনী মেয়েলি আদর্শ এবং নারীসুলভ আচরণ শেখায়। তাছাড়াও বাংলাদেশের নারীর নিম্নমর্যাদার কারণ হিসেবে বিবাহ প্রথা, বৈবাহিক সম্পর্ক ও মাতৃত্বকেও দায়ী করা যায়। পুরুষতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী নারীকে বিয়ের পর ছাড়তে হয় তার বাবার বাড়ি। আত্মীয়স্বজন এটা নারীদের মানসিক দুর্বলতা ও ক্ষমতাহীনতাকে বাড়িয়ে দেয়।

রাষ্ট্রীয় আইন, সামাজিক রীতিনীতি ও পারিবারিক নিয়মকানুন দ্বারা বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় প্রচলিত বিবাহপ্রথা, বৈবাহিক সম্পর্ক, মাতৃত্ব ইত্যাদি পরিচালিত হয়। অধিকাংশ মেয়ের বিয়েতে তার মতামত গ্রহণ করা হয় না।

উপসংহার: বিভিন্ন কারণে সমাজে নারীরা সংখ্যালঘু অবস্থানে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিককালে নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে নারীরা শহর এলাকায় বিভিন্ন শিল্প কারখানায় কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে এতে নারীদের কিছুটা ক্ষমতায়ন হচ্ছে।

No comments:

Post a Comment