বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে নারীর ক্ষমতায়নে এনজিও-র ভূমিকা
ভূমিকা: বাংলাদেশ একটি গ্রামপ্রধান দেশ। এদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি খুবই অনুন্নত। এই গ্রামীণ সমাজের নারীরা খুবই অনুন্নত। এই গ্রামীণ সমাজে নারীরা খুবই অসহায়। তারা সম্পূর্ণরূপে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল। এর মূল কারণ নারীর অর্থনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করতে না পারা। তবে আশার কথা এটুকু যে, গ্রামীণ নারীদের উন্নয়নে এদেশের এনজিও গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
নারীর ক্ষমতায়নে এনজিও-র ভূমিকা:
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। নারীকে বাদ দিয়ে ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব নয়। উপরন্ত নারীরা বঞ্চিত হলে উন্নয়নের ধাপকে পেছন দিকে নিয়ে যায়। এনজিও-গুলোর নারী উন্নয়নের কাজের ফলে বাংলাদেশের বঞ্চিত-অবহেলিত নারী সমাজ সংগঠিত হতে শিখেছে। এনজিওদের নারী উন্নয়নের কাজের ফলে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা সহায়কশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। নিম্নে নারীর উন্নয়নে এনজিও ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
১. নারী শিক্ষা:
শিক্ষা এনজিও কার্যক্রমের একটি বিশেষ দিক। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ দুঃখের বিষয় হলো গ্রামীণ সমাজের নারীরা এই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ এই শিক্ষার সুযোগ যনি দরিদ্র নারীদের কাছে পৌছে দেওয়া যেত তাহলে তারা পুরুষের পাশাপাশি সমাজে ভূমিকা পালন করতে পারতে। এই নারীশিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন এনজিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। তারা গ্রামীণ নারীদের শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে বিভিন্ন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছে।
২. নারীদের ঋণ ও সঞ্চয় প্রদান:
এনজিওসমূহ গ্রামীণ এলাকায় লোকজনের মধ্যে ঋণ প্রদান করে এবং সঞ্চয়ে উৎসাহিত করে। বিশেষ করে এনজিওসমূহ নারীদের ঋণ প্রদান করে থাকে। প্রথম এরা গ্রামীণ নারীদের নিয়ে সমিতি গঠন করে। সমিতির সদস্যরা নিজেরা মাসিক ও সাপ্তাহিক সত্য করে সিদ্ধান্ত নেয়। সমিতির নায়ী সদস্য সমিতির মাধ্যমে এনজিওগুলোর কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে এবং এই ঋণের টাকা দিয়ে তারা ধান কেনে, গরু কেনে এবং নিজেরা স্বাবলম্বী হতে চেষ্টা করে।
৩. দারিদ্র্য বিমোচন:
গ্রামীণ নারীদের দারিদ্র্য বিমোচনে এনজিওসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারা সহজ শর্তে নারীদের ঋণ প্রদান করছে। অথচ গ্রামীণ নারীর ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ পায় না। কারণ তারা জামানতের নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে না। এনজিওসমূহের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে এরা বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন করছে। বাড়িতে সবজির বাগান করছে। এর ফলে তাদের মধ্যে সচ্ছলতা আসছে। তারা বিভিন্ন ধরনের ছোটখাটো দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করতে পারছে।
৪. প্রশিক্ষণ প্রদান:
এনজিওসমূহ নারীদের বিভিন্ন কাজকর্মের ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে নারীরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজেরা স্বাবলম্বী হতে চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের ওপর প্রশিক্ষণ হাঁস-স্বরণি ও মৎস্য চাষের ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। নারীরা এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বিভিন্ন কুঠিরশিল্পজাত দ্রব্য তৈরি করে পরিবারের আর্থিক সাহলভা বৃদ্ধিতে পুরুষের পাশাপাশি কাজ করছে। একসময় ঘরের বাইরে বের হওয়া ছিল নারীদের জন্য অপরাধ। বর্তমানে এনজিও ও নারী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে নারীরা এখন বাড়ির বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছে।
৫. নারীস্বাস্থ্য উন্নয়ন:
'সবার জন্য স্বাস্থ্য' এই ঘোষণা থাকলেও গ্রামীণ অধিকাংশ নারীরা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাছাড়া গ্রামীণ নারীদের আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় কারণে তারা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পারছে না। তারা নানবিধ অসুখ নিয়েই জীবনযাপন করছে। নারীদের এই অবস্থার উন্নয়নকল্পে এনজিওসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। এনজিওগুলো স্বাস্থ্যসেবা প্রদানসহ স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি ও জনমত তৈরিতে সহায়তা করছে। প্রসূতি মৃত্যুরোধ, টিকাদান কর্মসূচি, পরিবার পরিকল্পনা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ হ্রাসে এনজিও-গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
৬. নারী নির্যাতন রোধ এবং নারী অধিকার আদায়:
নারীদের অধিকার আদায় ও স্বার্থ সংরক্ষণে এনজিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এনজিও বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ ছাড়াও দরিদ্র নারীদের অধিকার রক্ষায় তারা আইনগত সহায়তা প্রদান করে চলছে। এজন্য এনজিওসমূহ তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
৭. নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি:
এনজিওগুলো গ্রাম এলাকায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সেখানে গ্রামীণ নারীদের চাকরির সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করছে। গ্রামীণ নারীরা প্রকল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া এনজিওগুলোতে চাকরির ক্ষেত্রে নারীদের অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে। এতে তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে।
৮. নারীদের সচেতনতা সৃষ্টি:
গ্রামীণ নারীদের সচেনতা সৃষ্টিতে এনজিওগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। সচেতনতার অভাবে তারা তাদের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা, স্বাস্থ্যবিধি, আইনি সহায়তা, আর্থিক সুবিধা এবং সামাজিক নিরাপত্তা সম্পর্কে অবগত থাকে না। এনজিওসমূহ নিয়মিত উঠান বৈঠক, আলোচনা সভা, প্রচারপত্র বিতরণ, নাটিকা, ভিডিও প্রদর্শনী এবং নারী সমাবেশের মাধ্যমে তাদের সচেতন করে তুলছে। ফলে নারীরা নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে, আত্মবিশ্বাস অর্জন করছে এবং পরিবার ও সমাজে নিজের অবস্থানকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারছে। নারীদের অধিকার ও সচেনতা সৃষ্টিতে এনজিওগুলো বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তাবায়ন করছে।
৯. নারী স্বাধীনতা সৃষ্টি:
নারী স্বাধীনতা সৃষ্টিতে এনজিওগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।গ্রামীণ নারীরা একসময় পরিবারের কাজে সীমাবদ্ধ ছিল; অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সামাজিক কুসংস্কার ও পুুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারত না। এনজিওগুলো নারীদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ঋণ, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড, সঞ্চয় এবং আইনি সহায়তার মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তুলছে। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নারীদের স্বাধীনতার প্রধান ভিত্তি। নারীরা যখন নিজে আয় করতে পারছে, তখন তারা সংসারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারছে, নিজের ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারছে। এনজিওর কর্মকাণ্ডে নারীরা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছে। এতে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বেড়েছে এবং স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
১০. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ:
অনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এনজিচসমূহের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এক সময় নারীরা স্বামীর ইচ্ছার বাইরে ফোনো কাজ করতে পারত না। এই এনজিওগুলো জনসংখ্যা সমস্যার সমাধানে ব্যাপকভাবে পরিবার-পরিকল্পনা কর্মসূচিকে জনপ্রিয় করে তোলার প্রয়াস চালিয়ে আসছে। তারা বিনামূল্যে এবং স্বল্পমূল্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সরবরাহ করছে।
১১. তথ্যপ্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ:
ডিজিটাল যুগে নারীদের পিছিয়ে পড়া ঠেকাতে এনজিওগুলো গ্রামীণ নারীদের তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল সেবা, স্মার্টফোন ব্যবহার এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ নারীদের অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি করছে। ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা, সেলাই-পণ্য বিক্রি ইত্যাদির মাধ্যমে নারীরা ঘরে বসেই আয় করতে পারছে।
১২. আইনি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান:
নারী নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা ইত্যাদি সমস্যায় এনজিওগুলো সরাসরি আইনি সহায়তা প্রদান করছে। তারা আইনজ্ঞ নিয়োগ, হটলাইন পরিচালনা, পুলিশ-প্রশাসনের সাথে সমন্বয়, আইনি সচেতনতা ক্যাম্পেইন, নারী অধিকার বিষয়ক আলোচনা ইত্যাদি পরিচালনা করে থাকে। এতে নারীরা ন্যায্য অধিকার পেতে সক্ষম হয় এবং সমাজে আইনি নিরাপত্তাবোধ বাড়ে।
১৩. পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে নারীদের সম্পৃক্তকরণ:
এনজিওগুলো গ্রামীণ নারীদের পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, জ্বালানি সাশ্রয়, নিরাপদ পানির ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু অভিযোজন বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করছে। বিশেষ করে উপকূলীয় নারীদের সাইক্লোন শেল্টার ব্যবহারে প্রশিক্ষণ, দুর্যোগ প্রস্তুতি, লবণাক্ততা মোকাবিলা, বিকল্প জীবিকা ইত্যাদি বিষয়ে সহায়তা দিচ্ছে। ফলে নারীরা জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও সক্ষম হচ্ছে।
১৪. সামাজিক কুসংস্কার ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ:
গ্রামীণ সমাজে বাল্যবিবাহ, কুসংস্কার, ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যা ও সামাজিক নিষেধাজ্ঞা নারীর উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। এনজিওগুলো এসব বিষয় মোকাবিলায় সচেতনতা কর্মসূচি, নাটক, ক্যাম্পেইন, যুব ক্লাব গঠন, কমিউনিটি ডায়ালগ এবং ধর্মীয় নেতাদের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছে। ফলে কুসংস্কার কমছে, নারীরা দ্রুত বিয়ে থেকে রক্ষা পাচ্ছে এবং শিক্ষালাভের সুযোগ বাড়ছে।
১৫. নারী নেতৃত্ব বিকাশ:
গ্রামীণ নারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে এনজিওগুলো বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। তারা গ্রাম পর্যায়ে নারী নেত্রী তৈরি করার জন্য কমিটি গঠন, নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ, দলনেত্রী নিয়োগ, গ্রুপ ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদির মাধ্যমে নারীদের নেতৃত্বের অভ্যাস তৈরি করছে। ফলে নারীরা সামাজিক উন্নয়ন, স্থানীয় সমস্যা সমাধান এবং দল পরিচালনায় দক্ষতা অর্জন করছে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, এনজিওগুলো গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়নে বিভিন্নমুখী কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এই কার্যক্রম নারীদের ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। তাই নারীর ক্ষমতায়নে এনজিও-র ভূমিকা অপরিসীম।

No comments:
Post a Comment