-->

পরিবেশের উপর বিশ্বায়নের প্রভাব আলোচনা কর

পরিবেশের উপর বিশ্বায়নের প্রভাব আলোচনা

ভূমিকা:- বিশ্বায়ন বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম আলোচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। এটি বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি এবং বাণিজ্যের মধ্যে আন্তঃসংযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে এই প্রক্রিয়ার যেমন ইতিবাচক দিক রয়েছে, তেমনি নেতিবাচক প্রভাবও স্পষ্ট, বিশেষ করে পরিবেশের ক্ষেত্রে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার, দূষণ এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাস এসবই বিশ্বায়নের সরাসরি বা পরোক্ষ ফলাফল।

পরিবেশের উপর বিশ্বায়নের প্রভাব

পরিবেশের উপর বিশ্বায়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব

পরিবেশের উপর বিশ্বায়নের ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব নিম্নোক্ত আলোচনা করা হলো

১। গ্রীনহাউজ প্রক্রিয়া:

বহুজাতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও পরিবহনব্যবস্থার সম্প্রসারণে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের মতো গ্যাস নির্গমনের হার বেড়েছে। এই গ্যাসগুলো গ্রীনহাউজ প্রভাব সৃষ্টি করে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

২। শিল্পায়ন:

বিশ্বায়নের ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিল্পায়ন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ শিল্প-কারখানা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার না করায় বায়ু, পানি এবং মাটির দূষণ বেড়েছে।

৩। নগরায়ন:

শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির ফলে গ্রাম থেকে শহরে মানুষের প্রবাহ বেড়েছে। এর ফলে নগরায়নের চাপ পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে—যেমন শব্দদূষণ, বর্জ্য বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক সমস্যা।

৪। বিপজ্জনক বর্জ্য:

আধুনিক শিল্প ব্যবস্থায় বিপজ্জনক রাসায়নিক ও বর্জ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বর্জ্য প্রাকৃতিক জলাধার ও মাটিকে বিষাক্ত করে তোলে, যা মানুষের স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি।

৫। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস:

বনভূমি উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস এবং অতিরিক্ত শিকার পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। অনেক প্রজাতি এখন বিলুপ্তির মুখে, যা একটি গভীর সংকেত।

৬। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন:

বিশ্বব্যাপী গড় তাপমাত্রা বাড়ছে, যা গ্লেশিয়ার গলন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধিতে সহায়ক। এই পরিবর্তনের পেছনে বিশ্বায়নের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।

৭। কৃষির আধুনিকীকরণ:

বিশ্বায়নের ফলে হাইব্রিড বীজ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে। এতে উৎপাদন বাড়লেও মাটি ও পানির গুণমান কমে গেছে।

৮। পারমাণবিক বিস্ফোরণ:

অস্ত্র প্রতিযোগিতার ফলে পারমাণবিক পরীক্ষা এবং বিস্ফোরণ পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এটি শুধু স্থানীয়ভাবে নয়, বৈশ্বিক পরিবেশেও প্রভাব ফেলে।

৯। বৃক্ষ নিধন:

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি, নগরায়ন ও শিল্পায়নের প্রয়োজনে বনভূমি কেটে ফেলা হচ্ছে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ।

১০। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার:

তেল, কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসের অতিরিক্ত ব্যবহার পরিবেশে কার্বন নিঃসরণ বাড়ায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিবর্তে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারে জলবায়ু সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

১১। মেগাসিটির প্রভাব:

বিশ্বের বড় শহরগুলোতে অত্যাধিক জনসংখ্যা, যানজট ও আবর্জনার পরিমাণ পরিবেশের উপর চাপ বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি বায়ুদূষণ, পানিদূষণ ও শব্দদূষণও বেড়েছে।

১২। পরিবেশীয় চাপ বৃদ্ধি:

বিশ্বায়ন প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটালেও তা পরিবেশের উপর অস্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী চাপ তৈরি করছে। ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত আহরণ, এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যে ক্ষতি এর উদাহরণ।

১৩। অতিরিক্ত খনিজ সম্পদ আহরণ

বিশ্বায়নের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে অনেক উন্নয়নশীল দেশ তাদের খনিজ সম্পদ অতিরিক্ত পরিমাণে আহরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে পরিবেশের উপর চাপ বাড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। খনিজ উত্তোলনের জন্য বনভূমি ধ্বংস, নদী ও জলাশয়ের দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।

১৪। নদী ও জলাশয়ের দূষণ

বিশ্বায়নের ফলে বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও নগরায়নের বৃদ্ধি নদী এবং জলাশয়গুলির অব্যাহত দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা বিশ্বে বহু নদী ও সমুদ্রের পানি এখন দূষিত, যা জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।

১৫। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের উচ্চতা

বিশ্বায়নের ফলে পৃথিবীজুড়ে গ্রীনহাউস গ্যাসের নির্গমন বেড়েছে, যার ফলস্বরূপ টাইফুন, সুনামি, বজ্রপাত, বন্যা ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে মানুষের বসবাসের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

১৬। খাদ্য উৎপাদন খাতে অনিয়ম

বিশ্বায়ন এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি খাদ্য উৎপাদনে উচ্চ ফলন নিশ্চিত করলেও, এর জন্য অতিরিক্ত জল ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য হুমকি। এর ফলে মাটি ও জলাভূমির ধ্বংস এবং সেখানকার জীববৈচিত্র্য সংকটের মুখে পড়ছে।

১৭। প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারহীন ব্যবহার

বিশ্বায়নের ফলে উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ করছে। এই শোষণের কারণে দেশীয় সম্পদ নিঃশেষিত হচ্ছে, এবং স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার মান হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত শোষণ তাদের পরিবেশ এবং অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

১৮। বায়ুদূষণ

বিশ্বায়নের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য, শিল্পায়ন এবং যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। এর ফলে বায়ুতে দূষিত পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা মানুষের শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার পাশাপাশি প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্যও ক্ষতিকর। বিশেষ করে, উন্নয়নশীল দেশে বায়ুদূষণের কারণে উচ্চমাত্রার স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে, যার প্রভাব তীব্র হয়ে উঠছে।

১৯। জলসম্পদ সংকট

বিশ্বায়নের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জলসম্পদের অত্যধিক ব্যবহার হচ্ছে। শিল্পায়ন এবং কৃষির আধুনিকীকরণের ফলে পানির চাহিদা বেড়েছে। বাংলাদেশসহ অনেক দেশ যেহেতু কৃষিনির্ভর, সুতরাং অতিরিক্ত সেচ ব্যবস্থার কারণে দেশীয় জলসম্পদের সংকট তৈরি হচ্ছে। এই সংকট বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও জটিল হচ্ছে।

২০। সারের অতিরিক্ত ব্যবহার ও মাটির অবক্ষয়

বিশ্বায়ন এবং কৃষির আধুনিকীকরণের ফলে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার অনেক বেড়েছে, যার কারণে মাটির গুণমান দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে মাটি হারিয়ে যাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে কৃষির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সারের অতিরিক্ত ব্যবহার শুধুমাত্র পরিবেশে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে না, বরং পরিবেশে বিষাক্ত পদার্থের প্রবাহও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা মাটির জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের স্বাস্থ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

উপসংহার: বিশ্বায়ন একদিকে আমাদের উন্নয়ন ও সংযোগের নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে, অন্যদিকে পরিবেশের উপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে। এই প্রভাব মোকাবিলায় প্রয়োজন টেকসই উন্নয়ন কৌশল, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। সঠিক নীতিমালা ও সচেতনতার মাধ্যমে আমরা পরিবেশ রক্ষা ও বিশ্বায়নের ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করতে পারি।

নবীনতর পূর্বতন