জনগণ আইন মান্য করার কারণসমূহ আলোচনা কর

জনগণ আইন মান্য করার কারণসমূহ আলোচনা

ভূমিকা: রাষ্ট্রীয় জীবনে নাগরিকের বাহ্যিক আচার-আচরণ ও ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু বিধি-বিধান প্রয়োজন পড়ে। আর রাষ্ট্র কর্তৃক বলবৎযোগ্য এসব বিধি-বিধানই হলো আইন। সমাজ ও রাষ্ট্রের সুষ্ঠু বিকাশ ও কার্যকলাপকে কার্যকর করার জন্য আইনের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। আইন ব্যতীত সমাজের কথা কল্পনা করা যায় না। আইন নাগরিকের বাহ্যিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। আইন হলো সমাজ তথা রাষ্ট্র বিকাশের অন্যতম নিয়মনীতি, আর রাষ্ট্র হলো আইনের স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক।

জনগণ আইন মান্য করার কারণ

জনগণ আইন মান্য করার বিভিন্ন কারণসমূহ:

বিভিন্ন কারণে জনগণ আইন মান্য করে থাকে। আর এ আইন মান্য করার পেছনে বেশ কিছু যৌক্তিকতা আছে। নিম্নে আইন মান্য করার কারণগুলো আলোচনা করা হলো-

১. নির্লিপ্ততার কারণ:

নির্লিপ্ততার অর্থ হলো যে, সাধারণ জনগণ রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। সুতরাং, রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো আইন পাস হলে সেটা জনগণ চিন্তা না করেই মেনে চলে।

২. শাস্তির ভয়ে:

আইন মান্য করার অন্যতম প্রধান কারণ হলো শাস্তির ভয়। কেননা, আইন অমান্য করা অপরাধ। আইন ভঙ্গের কারণে জনগণকে শাস্তি পেতে হয়। তাই, মানুষ শাস্তির ভয়ে আইন মান্য করে।

৩. শ্রদ্ধা-ভক্তির কারণে:

মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিক জীব হিসেবে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি মানুষকে আইন মোন চলতে অনুপ্রাণিত করে।

৪. বিবেক-বুদ্ধির প্রেরণায়:

মানুষ বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন জীব। বিবেকবান ব্যক্তি ন্যায় ও কল্যাণের পথে চলতে চায়। আইন ব্যতীত এটা সম্ভব নয়। কাজেই, বিবেক-বুদ্ধির প্রেরণায় মানুষ আইন মেনে চলে।

৫. অধিকার সংরক্ষণের জন্য:

উন্নত জীবন গঠনের জন্য রাষ্ট্র মানুষকে কতকগুলো অধিকার ভোগের সুযোগ প্রদান করে থাকে। তাই মানুষ আইনকে মেনে চলে শ্রদ্ধা করে।

৫ ধর্মীয় কারণ:

জনগণ সাধারণত ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রাচীনকাল হতেই বিভিন্ন ধর্মীয় আইনের ভিত্তিতে মানবজীবন পরিচালিত হতো। আইন ভঙ্গ করলে পাপ হবে সেই ভয়ের কারনে মানুষ আইন মেনে চলত।

৭. সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য:

আইন মেনে চললে রাষ্ট্রে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে। মানুষ সুখে-শান্তিতে এবং নিরাপদে বসবাস করতে পারে। তাই রাষ্ট্রের জনগণ আইন মেনে চলে।

৮. অরাজকতা এড়াবার জন্য:

অনেকেই ধারণা করে আইন অমান্য করলে নৈরাজ্য বা অরাজকতা সৃষ্টি হয়। মানুষ এ অরাজকতা চায় না। তাই, মানুষ অরাজকতা পরিহার করে চলার জন্য আইন মান্য করে।

৯. ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার তাগিদে:

আইন দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন করে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে। আইন না থাকলে অন্যায়, অত্যাচারে, নিপীড়নে দেশ ছেয়ে যেত এবং মানবসভ্যতা বিলুপ্ত হতো।

১০. সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য:

পরস্পরের প্রতি সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য অবশ্যই আইন মেনে চলতে হয়। কারণ, একটা নির্দিষ্ট আইনের মাধ্যমেই পরস্পর পরস্পরের কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে।

১১. সুন্দর ভবিষ্যৎ রচনার জন্য:

সুন্দর ভবিষ্যৎ রচনা করা প্রতিটি মানুষের স্বপ্ন। আর এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য অবশ্যই একটা নিয়মনীতি মেনে চলা দরকার। আর এ নিয়ম নীতি হলো আইন তাই জনগণ আইন মেনে চলে।

১২. মার্কসবাদীদের অভিমত:

মার্কসবাদীরা এ অভিমত এরশদ করেন যে, আইন সমাজে একটি বিশেষ উৎপাদন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে। উৎপাদনের উপকরণগুলো যাদের হাতে থাকে তারাই সমাজে প্রভুত্ব করে এবং প্রয়োজনবোধে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আইন মানতে জনগণকে বাধ্য করে।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এ কথা নিশ্চিত বলা যায় যে, মানুষকে সুন্দরভাবে সমাজে তথা রাষ্ট্রে বসবাস করায় জন্য আইনের প্রয়োজন অপরিহার্য। তবে এ কথা স্মরণ রাখা অবশাক যে, জনমতবিরোধী আইন মানুষের কল্যাণসাধনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য আইনের পেছনে জনসম্মতির প্রয়োজন, নতুবা সেই আইন জনগণের ওপর একধরনের বলপ্রয়োগের সৃষ্টি করবে। ফলে, আইনের প্রতি মানুষ শ্রদ্ধাহীন হয়ে পড়বে। যে দেশ যত বেশি উন্নত ও শিক্ষিত সে দেশের জনগণ তত বেশি আইন মেনে চলে। আইন না থাকলে কোনো দেশের সরকার টিকে থাকতে পারে না। তাই, সার্বিক দিক বিবেচনা করেই জনগণ নিজেদের প্রয়োজনে আইন মান্য করে চলে।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন