সাম্রাজ্যবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা কর

সাম্রাজ্যবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা

ভূমিকা: আধুনিক পুঁজিবাদের বিকাশ ও উন্নয়ন এবং ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের সাথে গভীরভাবে জড়িত একটি বিষয় হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ। একবিংশ শতাব্দীর মানুষ সাম্রাজ্যবাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং প্রভাব সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে পরিচিত। সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বারবার বিপর্যন্ত হয়েছে। একসময় সাম্রাজ্যবাদ হায়া ভূখণ্ডের সম্প্রসারণের মাধ্যমে বৃহত্তর ব্রিটেন গঠনের নীতিবে বোঝানো হতো। আবার সাম্রাজ্যবাদ বলতে অ-ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহের উপর ইউরোপীয় জাতিদের প্রভুত্ব কায়েম করার কৌশলকেও বোঝায়। মূলত সাম্রাজ্যবাদ হলো সেই নীতি, যার লক্ষ্য হলো সাম্রাজ্য স্থাপন।

সাম্রাজ্যবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা

সাম্রাজ্যবাদের বৈশিষ্ট্য:

নিম্নে সাম্রাজ্যবাদের বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হলো-

১. সাম্রাজ্য বিস্তার:

সাম্রাজ্য বিস্তার বা প্রসার ঘটানো সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। সাম্রাজ্যবাদ জোর করে অন্য রাজ্যে প্রবেশ করে নিজের পশুত্ব কায়েম করতে সচেষ্ট হয়। সাম্রাজ্য বিস্তারই সাম্রাজ্যবাদের আনন্দ ও তৃপ্তি। সাম্রাজ্যবাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা ছোট হতে পারে, বড়ও হতে পারে। সাম্রাজ্য বৃদ্ধিই এর লক্ষ্য। এ কারণেই বলা হয়, "Imperializm means the policy of extending the rule of a counry over other countries or territories."

২. পুঁজিবাদের প্রাধান্য:

সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের পুজারি ও দোসর। সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদ বা ধনতন্ত্রের একচেটিয়া পর্যায়। মূলত ধনতন্ত্রের শেষ পর্যায় হলো সাম্রাজ্যবাদ। অন্যকথায়, সাম্রাজ্যবাদ হলো একচেটিয়া পুঁজিতন্ত্র। সাম্রাজ্যবাদে সমগ্র অর্থনীতি একচেটিয়া পুঁজির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সাম্রাজ্যবাদ পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রসমূহ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।

৩. নিজেদের প্রাধান্য বিস্তার:

সাম্রাজ্যবাদ সাম্রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথে নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়। সাম্রাজ্যবাদ অন্য জাতির উপর প্রাধান্য বিস্তার করে শাসন ও শোষণের বোঝা চাপিয়ে দেয়। প্রয়োজনে সাম্রাজ্যবাদ অধিকৃত এলাকার যেকোনো ধরনের স্টিম রোলার চালাতে দ্বিধাবোধ করে না।

৪. সাংস্কৃতিক নিপীড়ন:

সাম্রাজ্যবাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি অধিকৃত এলাকার জনগণের উপর সাংস্কৃতিক নিপীড়ন চালায়। তারা বিভিন্ন কৌশলে সাংস্কৃতিক জীবনকে নিয়োদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ তাদের হীন উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করার জন্য প্রচেষ্টা চালায়।

৫. মৌলিক অধিকার হরণ:

সাম্রাজ্যবাদ তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে অধিকৃত এলাকার জনগণের রাজনৈতিক মৌলিক অধিকার হরণ করতে উদ্ধত হয়। এ কারণে তারা বিভিন্ন নির্যাতন, নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে কুণ্ঠা বোধ করে না। রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে এনে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখা হয়।

৬. সামরিক শক্তি প্রদর্শন:

সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে সামরিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ। সামরিক শক্তি বলেই সাম্রাজ্য দখল করা হয় ও তা প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হয়। জনসমর্থনের অভাবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে সামরিক শক্তির উপরই নির্ভর করে চলতে হয়।

৭. অর্থনৈতিক প্রাধান্য:

সাম্রাজ্যবাদ শুধু রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে পরিচালিত হয় না। এর অন্যতম লক্ষ্য অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিল করা। সাম্রাজ্যবাদ আর্থিক মুনাফার পর প্রশস্ত করে। তাই সাম্রাজ্যবাদকে অনেকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করে।

৮. উৎপাদনব্যবস্থার কেন্দ্রীয়করণ:

সাম্রাজ্যবাদে সমগ্র উৎপাদন ও বণ্টনব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকে অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদে উৎপাদনব্যবস্থার কেন্দ্রীয়করণ করা হয়। রাষ্ট্রের পুঁজি কতিপয় শিল্প মালিকদের হাতে পুঞ্জীভূত থাকে। পুঁজির কেন্দ্রীকরণ বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণের পথ খুঁজে পায়।

৯. পুঁজির সমন্বয়:

সাম্রাজ্যবাদ পুঁজির আধিপত্য ও সমন্বয় সাধন হয়। ব্যাংক ও শিল্পপতিদের মিলন ঘটে। ফলে মহাজনী কারবার বৃদ্ধি পায়। অনেক ক্ষেত্রে মালিকানা দেশের বাইরে থাকে।

১০. বৈষম্য সৃষ্টি:

সাম্রাজ্যবাদের অধিগ্রহণ অধিকৃত জনগণের মধ্যে বিভেদ-বৈষম্য তৈরি করে তাদের স্বার্থ হাসিল করার চেষ্টা করে। এর মাধ্যমে তারা একশ্রেণির সুবিধাভোগী তল্পিবাহককে তাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

১১. পুঁজি রপ্তানিকরণ:

সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পুঁজি রপ্তানিকরণ। অধিকৃত এলাকায় তাদের পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বাজার সৃষ্টি হয় এবং মূলধন গঠিত হয়। মূলধন বৃদ্ধি পেলে তা আবার পাচার করা হয় নিজ দেশে।

১২. পুঁজি বিনিয়োগে সমঝোতা:

সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহ পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সমঝোতার পথ অবলম্বন করে থাকে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই তাদের মধ্যে একপ্রকার ভাগ-বাঁটোয়ারা চলে।

১৩. ভূখণ্ডের ভাগাভাগি:

সাম্রাজ্যবাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, সমগ্র বিশ্বের ভূখণ্ডকে তাদের নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে বণ্টন করে নেওয়া। প্রত্যেকে তার অধীনস্থ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেষ্ট হয়।

১৪. সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য:

সাম্রাজ্যবাদ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে চলে। সাম্রাজ্যবাদ অত্যন্ত চতুর ও অভিসন্ধিমুলক। উদ্দেশ্যগত দিক থেকে সাম্রাজ্যবাদ অত্যন্ত স্থির ও সুস্পষ্ট। এর পেছনে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সাময়িক লক্ষ্য বিদ্যমান থাকে। অনেক সময় সাম্রাজ্য বিস্তারের নেশাই মুখ্য হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিই মূল বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, সাম্রাজ্যবাদ বলতে এমন এক রাষ্ট্রীয় নীতিকে বোঝায় যার উদ্দেশ্য হচ্ছে কোনো সাম্রাজ্য সৃষ্টি, সংকোচন ও সংরক্ষণ করা। মূলত সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে সাম্রাজ্যের নীতি বা চেতনা, যা সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের অনুকূলে শক্তি জোগায়। আর সাম্রাজ্যবাদকে পরিপূর্ণভাবে বিশ্লেষণ করলে এর উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ পরিলক্ষিত হয়, যা তাকে উপনিবেশবাদ, দন্য উপনিবেশবাদ এসব ধারণা থেকে পৃথক করেছে। তাই সাম্রাজ্যবাদকে পরিপূর্ণভাবে জানতে হলে সকল বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও সম্যক ধারণা থাকা আবশ্যক।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন