আধুনিক সমাজবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে প্রধান প্রধান মডেলসমূহ আলোচনা কর

আধুনিক সমাজবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের প্রধান মডেলসমূহ আলোচনা

ভূমিকা: বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী যুগে যুগে সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন মডেল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। আর এসব মডেল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সামাজিক গবেষণা ও বিচার-বিশ্লেষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। সাধারণভাবে বলা যায়, মডেল হচ্ছে একটি প্রপঞ্চ যার সাথে কোনো একটি অজ্ঞাত প্রপঞ্চকে বিশ্লেষণের জন্য তুলনা করা হয়। অর্থাৎ কোনো বিশেষ সমাজব্যবস্থায় কীভাবে কাজ করেছে বা ক্রিয়াশীল রয়েছে তার একটি সাধারণ বর্ণনাই মডেল। মূলত সমাজতাত্ত্বিক মডেল হচ্ছে মানুষের মানসপটেরই বিমূর্ত চিত্র।

আধুনিক সমাজবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে প্রধান প্রধান মডেলসমূহ আলোচনা

সমাজবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মডেলসমূহ

বিশ্লেষণের মডেল সমূহ চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-(ⅰ) বিবর্তনবাদ মডেল, (ii) কাঠামোগত ক্রিয়াবাদ মডেল, (iii) দ্বন্দ্বমূলক মডেল এবং (iv) প্রতীকী মিথস্ক্রিয়াবাদ।

বিবর্তনবাদ মডেল:

অগাস্ট কোঁৎ-এর ত্রয়স্তরের সূত্র: অগাস্ট কোঁৎ এর ত্রয়স্তরের সূত্রগুলো নিম্নরূপ:

ধর্মতাত্ত্বিক স্তর:

এটি হচ্ছে প্রকৃতিনির্ভর স্তর। এ স্তরে অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস ও আস্থা ছিল অপরিমেয়। ধর্মতাত্ত্বিক স্তরে মানবমন বিভিন্ন বর্তমান অস্তিত্বের প্রয়োজনীয় প্রকৃতি। সকল ফলাফলের প্রথম এবং-শেষ কারণগুলো জ্ঞানের কাজে নিয়োজিত থাকে। আদিবাসী এবং শিশুদের জড়জগৎ সম্বন্ধে মনোভাব এবং ধারণায় ধর্মতাত্ত্বিক স্তরটি লক্ষ করা যায়। এই স্তরে জ্ঞানের বিকাশ সাধিত হয়নি। এই স্তরটি তিনটি ধাপে বিভক্ত। যথা-

( i) অন্ধভক্তিবাদ: এই ধাপে অতি প্রাকৃত ধ্যানধারণার বিকাশ শুরু হয় ভক্তি ও অন্ধবিশ্বাস থেকে। এই ভক্তি ও অন্ধবিশ্বাস প্রাকৃতিক বস্তুগুলোকে জীববস্তু হিসেবে বিবেচনা করে।

(ii) বহু ঈশ্বরবাদ: এই ধাপটি বহু দেবতাবাদ নামে অখ্যায়িত। বহু দেবতাবাদ বিশ্বাস করে যে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বহুবিধ কাল্পনিক দেবতাসমূহের দ্বারা পরিচালিত।

(iii) একেশ্বরবাদ: এই ধাপটি একেশ্বরবাদ নামে অভিহিতা এই ধাপ বিশ্বাস করে যে, একটি অতিপ্রাকৃত মানুষের আবেগ ও ইচ্ছা দ্বারা বিভূষিত এবং এটি সকল প্রাকৃতিক প্রপঞ্চসমূহের কারণ।

অধিবিদ্যাসম্বন্ধীয় স্তর:

অগাস্ট কোঁৎ-এর মতানুযায়ী ১৩০০ সালের দিকে এই স্তরটির সূত্রপাত ঘটে। এই স্তরটি অপেক্ষাকৃত স্বল্পস্থায়ী। এক্ষেত্রে মানবমন অতিপ্রাকৃত বস্তুর অস্তিত্বের পরিবর্তে কাল্পনিক ও বস্তুনিরপেক্ষ শক্তিসমূহ এবং অস্তিত্বে বিশ্বাস করে যা নাকি বিভিন্ন প্রপঞ্চসমূহ সৃষ্টির ক্ষমতা রাখে। এক্ষেত্রে মানুষ বস্তুসমূহকে নয় কাল্পনিক সত্তাসমূহকে পূজা করে থাকে। এই স্তরে মানুষ বিশ্বাস করে যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দেবতা কর্তৃক নয়, একটি বিশেষ শক্তি অথবা অজ্ঞাত কোনো ক্ষমতা যারা পরিচালিত। এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের ভবিষ্যৎ এবং এর বিভিন্ন শক্তিসমূহ একত্রিত এবং সংঘবদ্ধ হয়ে একটি বিশেষ প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সূত্রের আওতায় চলে আসে।

দৃষ্টিবাদী স্তর:

দৃষ্টিবাদী বা বিজ্ঞানসম্মত স্তরে যুক্তি এবং পর্যবেক্ষণ সম্মিলিতভাবে জ্ঞানের উৎস হিসেবে কাজ করে। এটি দৃশ্যমান যৌক্তিক পর্যায় এখানে সবকিছুকে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়। যুক্তির ভিত্তিতে সবকিছুই যাচাই-বাছাই করাই হলো এর মৌল উদ্দেশ্য। এ স্তরেই জ্ঞানের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধিত হয়। অগাস্ট কোঁৎ বর্ণিত এই স্তরে Technocrates বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রাধান্য পাবে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবে পুঁজিপতি ও শিল্পপতিগণ, পরিবার হয়ে উঠবে সামাজিক ইউনিট।

কাঠামোগত ক্রিয়াবাদ মডেল:

জ্ঞানালোকের যুগ:

অনেক সমাজবিশ্লেষক মনে করেছেন, বুদ্ধিবৃত্তি বা Enlightenment সমাজবিজ্ঞানের বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। Ritzer বলেছেন, "The enlightenment was a period of remarkable intellectual development and change in philosophical thought." যুক্তি ও বিজ্ঞানের বিকাশের কালে গতানুগতিক ধ্যানধারণা এবং বিশ্বাসকে পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত করা হয়েছে। এ প্রজ্ঞাযুগের সমাজচিন্তাবিদ হচ্ছেন ফরাসি দার্শনিক Charles Montesquieu এবং Jean Jacques Rousseal সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে এ জ্ঞানালোকের ভূমিকা যতটা না প্রত্যক্ষ এবং ইতিবাচক ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল পরোক্ষ এবং নেতিবাচক। Zeitin-এর ভাষায়, "Early sociology developed as a reaction to the enlightenment."

যেসব চিন্তাবিদ জ্ঞানালোকের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন তারা দুটি বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা প্রভবিত হয়েছিলেন। যথা- (i) Philosopy ও (ii) Science.

সপ্তদশ শতাব্দীর দর্শনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন- Rene Descartes Hobbes and Jhon Locke. তাঁদের সমাজসম্পর্কিত ধারণা ছিলো সর্বজনীন বিমূর্ত যা Rational Sense সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে যারা জ্ঞানালোকের বিজ্ঞানের সাথে সংশ্লিষ্ট সর্বজনীন যৌক্তিক, যা বাস্তব সমাজ থেকে গৃহীত। অন্যকথায়, ছিলেন তারা মনে করেছেন, সমাজ সম্পর্কিত ধারণা হবে তারা Empirical research তথা মাঠপর্যায়ের গবেষণায় বিশ্বাসী ছিলেন। বস্তুত এদের Model ছিল Newtonian physics-এর মূলকথা হচ্ছে মাঠ পর্যায়ে গবেষণা হবে, যা দ্বারা জনগণ বাস্তব দুনিয়াকে বুঝতে পারে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তাঁদের চিন্তা ছিল এ রকম বস্তু জগৎ যেমন Natural Law দ্বারা পরিচালিত সমাজজীবনও তেমনি Natural Law দ্বারা পরিচালিত হবে। এভাবে জ্ঞানালোকের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের তত্ত্ব প্রদান করেন।

দ্বন্দ্বমূলক মডেল:

সাধারণত দ্বন্দ্বমূলক মডেলের উৎপত্তি মডেলের উৎপত্তি ঘটে ভারসাম্যমূলক মডেলের তীব্র সমালোচনার মাধ্যমে। বস্তুত দ্বন্দ্ববাদীরা মনে করেন যে, আধুনিক সমাজে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে, এমন চিন্তা করাই নিরর্থক বরং ব্যক্তি সমাজে দেখা যায় যে, সর্বদা দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগে থাকে। ব্যক্তি মোজে প্রতিষ্ঠান সবাই দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হয়। অর্থাৎ সর্বদাই সামাজিক ক্রিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব উপস্থিত থাকে। মূলত প্রত্যেকেই স্ব-স্ব কাজে সফলতা অর্জন করে  অন্যের ওপর প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা করে। আর এর কারণে দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়। আমাদের সমাজের দ্বন্দ্ব এর জ্বলন্ত উদাহরণ।

প্রতীকী মিথস্ক্রিয়াবাদ:

সাধারণত প্রতীকী মিথক্রিয়াবাদ মডেলটি ক্রিয়াবাদী মডেল বিশেষ করে ভারসাম্য মডেলের বিরোধিতা করে। প্রতীকী মিথস্ক্রিয়াবিদের মতে, সামাজিক সম্পর্ক সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে গড়ে ওঠে বিশেষ করে ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে। এদের মতে, সমাজ কোনো দেহ নয়, সমাজের কোনো ব্যবসায়ও নেই। এটি একটি বিমূর্ত প্রত্যয়। এরা সমাজের চেয়ে মানুষের সম্পর্কের গুরুত্ব দেয়। মূলত সমাজের মানুষ প্রতিনিয়ত নিজের প্রয়োজনে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে এবং সে অনুযায়ী আন্তঃব্যক্তি, আন্তঃগোষ্ঠী ইত্যাদি সম্পর্ক গড়ে তোলে। উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সমাজ বিশ্লেষণে সমাজবিজ্ঞান খুব বেশি পুরাতন নয়। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি সমাজবিশ্লেষণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের বিভিন্ন এককের ভিত্তিতে সামাজিক সম্পর্ক সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বিশ্লেষণে নানাভাবে ব্যবহৃত হয়েছে নানা মডেল। কারণ বিভিন্ন তাত্ত্বিক সমাজকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করেছেন। 

নবীনতর পূর্বতন