রবার্ট কে. মার্টনের রেফারেন্স গ্রুপ তত্ত্ব বিশ্লেষণ
ভূমিকা: "আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে. মার্টন আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি সমাজবিজ্ঞানকে নিছক কোনো কল্পনা নয়, বরং তথ্য ও তত্ত্বনির্ভর একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান হিসেবে গড়ে তুলতে নিরলস কাজ করেছেন। মার্টন প্রচলিত সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বগুলোর সীমাবদ্ধতা দূর করে এক বিশেষ ধরনের তত্ত্ব উদ্ভাবনে গুরুত্বারোপ করেন, যা আধুনিক গবেষণার পথ প্রশস্ত করে।
তাঁর এমন একটি যুগান্তকারী তত্ত্ব হলো 'রেফারেন্স গ্রুপ' (Reference Group) বা নির্দেশক দল তত্ত্ব। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ব্যক্তি নিজের বর্তমান দলের বাইরে অন্য কোনো দলের আদর্শ ও আচরণের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং নিজেকে সেই দলের আদলে গড়ে তোলার চেষ্টা করে। আজকের এই ব্লগে আমরা মার্টনের রেফারেন্স গ্রুপ তত্ত্বের মূল ভিত্তি এবং এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করব।"
রেফারেন্স গ্রুপ সম্পর্কে মার্টনের তত্ত্ব:
রেফারেন্স গ্রুপ তত্ত্ব সম্পর্কে মার্টন তাঁর 'Social Theory and Social Structure গ্রন্থে দুটি প্রবন্ধের মাধ্যমে আলোচনা করেছেন। প্রবন্ধ দুটি হলো-
(1) Contribution to the theory of reference group behaviour
(1) Continuities in the theory of reference groups and social structure
Alice S. Ressi-র সহযোগিতায় প্রথম গ্রন্থটি রচিত হয় এবং মূল বিষয়বস্তু হলো ১৯৪৯ সালের প্রকাশিত দুভিলিজস লিখিত গবেষণাকর্ম The American Soldier মার্টন এই গ্রন্থের মাধ্যমে বিমূর্ত তত্ত্বাবধানের দিকে অগ্রসর হন।
মার্টনের মতে, "রেফারেন্স গ্রুপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একটি গ্রুপের প্রভাবে অন্য গ্রুপ প্রভাবিত হয় এবং তাদের আচরণ অভিমুখী হওয়ার চেষ্টা করে, যদিও তারা সে গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত নয়।"
The American Soldier এর একটি বিষয় মার্টনকে খুব বেশি আন্দোলিত করে তা হলো- সেনাবাহিনীর নিয়মনীতির সাথে যে খাপ খাওয়াতে পেরেছে তার পদোন্নতি হয়েছে। মার্টন এখানে সমাজতাত্ত্বিক উপাদান খুঁজে পেয়েছেন। সেনাবাহিনীর আদর্শের প্রতি আনুগত্য ইতিবাচক হলেও তা নিজ গ্রুপের আদর্শের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের শামিল। অর্থাৎ, বহিগ্রুপের প্রতি আনুগত্য মূলত আন্তঃগ্রুপের সাথে বিরোধিতা করা। যেমন- তিনি নিজের গ্রুপের চেয়ে অপর গ্রুপের আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অগ্রসর হওয়াকে 'Anticipatory Socialization' বলেছেন। তাঁর মতে, Anticipatory Socialization' ব্যক্তির জন্য Functional হলেও গ্রুপের জন্য Disfunctional হতে পারে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দল এভাবেই, পরিবর্তন হয়। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রের সমাজবিজ্ঞানী হওয়ার অভিপ্রায় অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু মার্টন রেফারেন্স তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাপক ও বিচিত্র ধরনের দলীয় একাত্মবোধ ও বেফারেন্সের পরিবর্তনশীল রূপ আনতে চেয়েছেন। অর্থাৎ, রেফারেন্স গ্রুপের দুটি ধরন দেখা যায়।
(ক) Normative type: যা ব্যক্তির জন্য আদর্শ নির্ধারণ করে এবং ধারণ করে।
(খ) Comparison type: এখানে ব্যক্তি নিজের ও পরের সাথে তুলনামূলক মূল্যায়ন করে।
গ্রুপ ও গ্রুপের সদস্যপদ:
সমাজতাত্ত্বিকভাবে গ্রুপের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করত গিয়ে মার্টন তিনটি মাপকাঠির কথা বলেন, যথা-
(ক) স্থায়ী ও নৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক আন্তঃক্রিয়ার ধরন।
(খ) সদস্য হিসেবে নিজেকে ভাবা।
( গ) অন্যদের দ্বারাও অনুরূপ ভাবা বা সদস্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত হওয়া'।
গ্রুপের সদস্যতা ও অসদস্যতা ব্যাখ্যা ও 'প্রাপ্তিক' অথবা 'সম্ভাবনাময়' সদস্যের অনুপাত দ্বারা শৃঙ্খলিত। রেফারেন্স গ্রুপের মধ্যে অসদস্যরাও পড়তে পারে। অসদস্যরা যদিও সদস্য বিবেচিত হওয়ার জন্য আন্তঃক্রিয়া ও সংজ্ঞাগত মাপকাঠিতে পড়ে না তবুও তাদেরকে অবশিষ্ট ভেবে পরিত্যাগ করা যায় না। কারণ তাদের মধ্যে বিভাজন সম্ভব এবং তা তাৎপর্যপূর্ণ। দুটি গ্রুপ সমান হওয়া সত্ত্বের তাদের মধ্যে ক্ষমতার তারতম্য হয় সদস্যদের সম্ভাবনাময় বৈচিত্র্যের কারণে। যে গ্রুপটি যত স্বয়ংসম্পূর্ণ, তার ক্ষমতা তত বেশি। আর সদস্যরা একজাতীয় নয়; বরং বৈচিত্র্যপূর্ণ।
মার্টন আরো দু'ধরনের বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, যা দিয়ে সদস্য গ্রুপ ও অসদস্য গ্রুপের পারস্পরিক মনোভাব জানা সম্ভব। যেমন-
(ক) যোগ্য অসদস্যদের গ্রুপে আনার জন্য গ্রুপের সংজ্ঞা প্রদানের অভাব।
(খ) অসদস্যদের দুটি ধরন, যেমন- যারা গ্রুপে এক সময় ছিল এবং যারা গ্রুপে কোনো সময়ই ছিল না।
আগ্রহী সদস্যদেরকে অন্তর্ভুক্ত করে গ্রুপকে বড় করার প্রবণতা যেমন দেখা যায়, তেমনি এ ব্যাপারে রক্ষণশীলতাও দেখা যায়। অসদস্যরা যখন নতুন গ্রুপে যোগদান করে, তখন পুরাতন গ্রুপকে অত্যন্ত খারাপভাবে প্রত্যয় করতে পারে। এছাড়া নতুন গ্রুপে অন্য গ্রুপের প্রাক্তন সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি সন্দেহের চোখে দেখা হতে পারে। কারণ অনেক সময় প্রাক্তন সদস্যরা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয় বা হতে পারে।
ইতিবাচক ও নেতিবাচক রেফারেন্স গ্রুপ:
সদস্যভুক্ত গ্রুপও নেতিবাচক হতে পারে। গ্রুপের ইতিবাচকতা আদর্শ ও মূল্যবোধের আস্থাকরণের ও আত্মমূল্যায়নের উপর নির্ভর করে, যা উদ্বুদ্ধ মানসের পরিচায়ক। আর নেতিবাচকতা উদ্বুদ্ধ মানসের প্রত্যাখ্যানকে ইঙ্গিত করে। অনেক সময় ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে সক্রিয় মনোভাব, মূল্যবোধ ও জ্ঞানের প্রত্যাখ্যান করা হয়ে থাকে শুধু তা নেতিবাচক রেফারেন্স গ্রুপের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে। ব্যক্তি বা গ্রুপেই রেফারেন্সের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
ভূমিকার মডেল:
অনেকে রেফারেন্স ব্যক্তিকে ভূমিকার মডেল মনে করেন। অর্থাৎ আদর্শ অনুকরণ অথবা নিজেকে মূল্যায়নের জন্য কেউ কোনো ব্যক্তির ভূমিকাকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। মার্টন ভূমিকার মডেলকে রেফারেন্স ব্যক্তির চেয়ে সীমিত পরিধির মনে করেছেন। 'রেফারেন্স ব্যক্তি' তুলনামূলক রেফারেন্স হিসেবে অনেক ব্যাপকভাবে গৃহীত হতে পারে; কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি ভূমিকার মডেল হিসেবে গৃহীত হয় তখন হয়তো সামান্য কয়েকটি ভূমিকা বিবেচিত হয়ে থাকে। আদর্শ ও মূল্যবোধের পার্থক্যের কারণে রেফারেন্স গ্রুপের ভিন্নতা হয়। মার্টন গ্রুপ নির্ণয় করার জন্য ২৮টি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন।
রেফারেন্স গ্রুপের ক্রিয়াগত ও অক্রিয়াগত দিক:
মার্টন তাঁর রেফারেন্স গ্রুপ তত্ত্বে ক্রিয়াগত ও অক্রিয়াগত দিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করেন। তাঁর মতে, একটি ক্রিয়া হলো Anticipatory Socialization এর একটি প্রকাশ্য ও আনুষ্ঠানিক এ দিক। যেমন- শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ যা ছাত্রকে বিশেষ পদমর্যাদার জন্য তৈরি করে। তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি অদৃশ্য, অন্তর্গত ও অনানুষ্ঠানিক। মার্টন বলেছেন, Anticipatory Socialization ব্যক্তির জন্য Functional হলেও গ্রুপের জন্য Disfunctional হতে পারে। কারণ সদলবলে এ ধরনের 'আকাঙ্ক্ষিত সামাজিকতা' স্বপক্ষ ত্যাগ বা Defection এর শামিল, যা সামরিক বাহিনীতে দণ্ডনীয় অপরাধ।
রেফারেন্স তত্ত্বের সমালোচনা
মার্টনের রেফারেন্স তত্ত্বকে অনেকে সমালোচনার সম্মুখীন করেন। নিম্নে সংক্ষেপে তা আলোচনা করা হলো:
১। মার্টনের রেফারেন্স গ্রুপ পছন্দ করার ক্ষেত্রে সদস্যতা গ্রুপকে নির্বাচন করার ব্যাপারে সহজবোধ্য ও লক্ষণীয় হলেও সদস্যতাহীন গ্রুপ পছন্দ করার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিপ্রেক্ষিত যাচাই করা এখনো সম্ভব হয় নি।
২। সমাজতাত্ত্বিক গ্রুপের শ্রেণিবিন্যাস ও বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা প্রচেষ্টাকে মূলত অব্যাখ্যায়িত ও অসংজ্ঞায়িত পার্থক্য নির্দেশ বলে কেউ কেউ মনে করেন।
৩। অনেক সমাজবিজ্ঞানী তার রেফারেন্স শব্দটির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা মনে করেন এই শব্দটি মার্টন ব্যবহার না করলেও পারতেন।
৪। তিনি সংগঠিত ও অসংগঠিত গ্রুপের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেন নি কিন্তু এরাও গ্রুপের আওতায় আসতে পারে।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, যদিও রেফারেন্স গ্রুপ তত্ত্বটির সমালোচনা রয়েছে, তথাপি তাঁর এ তত্ত্বটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। মূলত সমাজবিজ্ঞানের বিকাশ ও বাস্তব প্রয়োজনেই তিনি এই তত্ত্বটি আবিষ্কার করেন। তার এই তিনি দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনেই তৈরি করেছেন। এ তত্ত্বের রেফারেন্স গ্রুপ তত্ত্বটি মূলত তার মধ্যম পরিসর তত্ত্বের ফসল, যা মাধ্যমে মার্টন সমাজের মানুষের ভূমিকা ও তাদের আচরণকে বিশ্লেষণ করেছেন।
