রবার্ট কে. মার্টনের মধ্যম পরিসর তত্ত্ব পর্যালোচনা
উত্তর:- "সমাজবিজ্ঞানকে একটি আধুনিক ও স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে যে কজন তাত্ত্বিকের অবদান অনস্বীকার্য, আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে. মার্টন (Robert K. Merton) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি সমাজবিজ্ঞানের প্রচলিত তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করার জন্য জীবনভর কাজ করেছেন। বিশেষ করে সামাজিক আচরণের উপায় ও উদ্দেশ্য বিন্যাসের মাধ্যমে তিনি সমাজকাঠামোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
মার্টনের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী অবদান হলো তাঁর 'মধ্যম পরিসর তত্ত্ব' (Middle Range Theory)। তিনি এমন এক তত্ত্বের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন যা অতি-বিমূর্ত বৃহৎ তত্ত্ব (Grand Theory) এবং অতি-সাধারণ ক্ষুদ্র গবেষণার (Raw Data) মধ্যবর্তী অবস্থানে থেকে সমাজকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে। আজকের পোস্টে মার্টনের মধ্যম পরিসর তত্ত্বের গুরুত্ব ও এর বৈশিষ্ট্যসমূহ বিস্তারিতভাবে জানার চেষ্টা করব।"
মার্টনের বিচ্যুতি তত্ত্ব, নৈরাজ্যতত্ত্ব, ক্রিয়াবাদ তত্ত্ব ও মধ্যম পরিসর তত্ত্বের মধ্যে তাঁর মধ্যম পরিসর তত্ত্বটি অন্যতম।
মার্টিনের মধ্যম পরিসর তত্ত্ব
১৯৪৭ সালে আমেরিকান সমাজবিজ্ঞান সমিতিতে Talcon Parsons এর The possition of Sociological Theory নামক প্রবন্ধটি উপস্থাপিত হলে এর সমালোচনা ও সম্প্রসারণমূলক আচরণ হিসেবে Merton তাঁর Middle Range তত্ত্বটি উপস্থাপন করেন। Merton মনে করেন, সমাজের বৃহৎ কল্যাণের জন্য Micro level এ তত্ত্ব প্রদান সমীচীন নয় এবং সমাজবিজ্ঞান যে পর্যায়ে আছে, তাতে করে Macro level এ তত্ত্ব প্রদানও যৌক্তিক নয়। তাই তিনি Middle Range Theory তে গমনের কোনো রাস্তা আজো তৈরি হয় নি। এই সমস্যা সমাধান করার জন্য Merton যে বিশেষ ধরনের তত্ত্ব নির্মাণ করার চেষ্টা চালিয়েছেন তার নাম Middie Range Theory বা মধ্যম পরিসর তত্ত্ব। মার্টন তাঁর মধ্যম পরিসর তত্ত্ব এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, দৈনন্দিন গবেষণা করতে গিয়ে যে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কল্পনাসমূহ আবির্ভূত হয় এবং একক তত্ত্ব বা সামাজিক আচরণ, সামাজিক সংস্থা ও সামাজিক পরিবর্তনকে বিশ্লেষণ করবে বলে চেষ্টা করা হয়, তার মাঝামাঝি যেসব তত্ত্ব অবস্থান করে তাদেরকে মধ্যম পরিসর তত্ত্ব বলা হয়। মার্টনের মতে, মধ্যম পরিসর তত্ত্ব সরেজমিনে গবেষণাসমূহকে দিক নির্দেশনা প্রদান করার জন্য ব্যবহৃত হয়। সমাজ সম্পর্কিত চিন্তাধারার দিকে তাকালে সুস্পষ্টভাবে দু'টো ধারা লক্ষ করা যায়। মার্টন নিম্নলিখিত দু'ধরনের তত্ত্বায়ন লক্ষ করেছেন-
(1) ক্ষুদ্র পরিসর তত্ত্ব (ii) বৃহৎ পরিসর তত্ত্ব
১. ক্ষুদ্র পরিসর তত্ত্ব
এই ধারার অনুসারীরা বলেন, সমাজবিজ্ঞানে সার্বজনীন সূত্র আবিষ্কার একটা অসম্ভব ব্যাপার। বর্তমান সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান যে পর্যায়ে আছে তা দিয়ে সমাজবিজ্ঞানকে সার্বজনীন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই সমাজবিজ্ঞানীদের উচিৎ একটি নির্দিষ্ট স্থানে, নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট বিষয়ে দৃষ্টি নিবন্ধ রাখা। কারণ সমাজবিজ্ঞানে পদ্ধতির সংখ্যাও সীমিত। এছাড়া সমাজ সংগঠনের উপর ভৌগোলিক পরিবেশের জিন্নাতর প্রভাবের কারণে মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য তথ্য সমাজের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা লক্ষণীয়। তাই এটা ব্যর্থ প্রচেষ্টা হবে যদি সমাজবিজ্ঞানকে পদার্থবিজ্ঞানের মতো পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাওয়া হয়। তবে এই তত্ত্বের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে, সমাজবিজ্ঞানে লক্ষ্য হওয়া উচিৎ সার্বজনীন পর্যায়ে যাওয়া। তবে এর আগে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে দৃষ্টি নিবন্ধ রাখা উচিৎ। উদাহরণ হিসাবে ডুরখেইম ও ম্যাক্স ওয়েবারের কথা বলা যেতে পারে। এই দুজন সমাজবিজ্ঞানী বেশি সুনির্দিষ্ট বিন ক্ষুদ্র পরিসরে নিয়ে তাদের গবেষণা সীমাবদ্ধ রেখেছেন।
মার্টনের মতে, যারা ক্ষুদ্র পরিসরের তত্ত্বের কথা বলেন এবং যারা বৃহৎ পরিসরের তত্ত্বের কথা বলেন উভয়ের যুক্তিগুলোই তার কাছে মূল্যবান কিন্তু উভয় ধরনের তত্ত্বের বিরুদ্ধে তার কিছু সমালোচনা আছে। ক্ষুদ্র পরিসর ধারায় সমালোচনা করে মার্টন বলেন, সমাজবিজ্ঞান হিসাবে জ্ঞানের সার্বজনীন পর্যায়ে উপনীত হয় নি তার অর্থ এই নয় যে, তা খুব ক্ষুদ্র পর্যায়ে আছে। কারণ বাদে হিসাবে সমাজবিজ্ঞান ইতিমধ্যে তার দেড়'শ বছর অতিক্রম করেছে। এ সময় মোটেও কম নয়। অর্থাৎ সমাজবিজ্ঞান সার্বজনীন ও ক্ষুদ্র পর্যায়ের মাঝামাঝি অবস্থানে আছে। আবার বৃহৎ পরিসর ধারার তত্ত্বের সমালোচনা করে নার্টন বলেন, সমাজবিজ্ঞানের লক্ষ্য হলো সার্বজনীন পর্যায়ে যাওয়া। তবে বিষয় হিসাবে সমাজবিজ্ঞান এখনো এতটা পরিপক্কতা লাভ করে নি। ক্ষুদ্র পরিসর থেকে এর যাত্রা শুরু করেছে। এখনো সার্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছে নি।
মার্টন ক্ষুদ্র ও বৃহৎ পরিসরের তত্ত্বের মাঝামাঝি একটি নতুন ধরনের তত্ত্বের কথা বলেন, যা মধ্যম পরিসর তত্ত্ব নামে পরিচিত।
মধ্যম পরিসর তত্ত্বের পরিমাণ পরিচিত
মার্টনের মধ্যম পরিসর তত্ত্ব চিহ্নিত করার কতকগুলো উপায় আছে। এগুলো হলো:
১. মাঝামাঝি অবস্থান:
মধ্যম প্রকৃতির তত্ত্ব, ক্ষুদ্র ও বৃহৎ প্রকৃতির তত্ত্বের মাঝামাঝি অবস্থান করে। তাই একে মধ্যম পরিসর তত্ত্ব বলা হয়।
২. ক্ষুদ্র প্রকৃতি:
ক্ষুদ্র প্রকৃতির তত্ত্ব বলতে এখানে সচরাচর কার্মিক কর্ম দ্বারা প্রাপ্ত অনুকল্প বুঝায়, যা দৈনন্দিন গবেষণার দ্বারা। প্রচুর পরিমাণে আবির্ভূত হয়।
৩. বৃহৎ প্রকৃতি:
বৃহৎ তত্ত্ব বা বৃহৎ প্রকৃতির তত্ত্ব বলয়ে এখানে বুঝানো হয়েছে সেসব সর্ববিষয়ব্যাপী প্রচেষ্টা, যা সামাজিক আচরণ, সামাজিক সংগঠন ও সামাজিক পরিবর্তনের সব ধরনের Observed Uniformines এর ওপর ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত ও একীভবনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেমন-Parsons এর ক্রিয়াতত্ত্ব, Weber এর সামাজিক ইতিহাসের বস্তুবাদী তত্ত্ব, Comte এর বুদ্ধিবৃত্তিক সামাজিক বিকাশে তত্ত্ব প্রভৃতি।
৪. প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানের সহায়ক
মধ্যম পরিসর তত্ত্ব প্রধানত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাভিত্তিক অনুসন্ধানে সহায়তা করে। যেমন-Theory of Reference Group, Theory of Relative Deprivation, Theory of Role Set প্রভৃতি।
৫. উপযোগিতাহীন:
সর্ব সামাজিক বৃহৎ তত্ত্বগুলো দার্শনিক ব্যাখ্যার মতোই উপযোগিতাহীন ও সে জন্য পরিত্যাজ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়।
৬. বৃহৎ প্রকৃতি পরস্পরবিরোধী:
বৃহৎ প্রকৃতির তত্ত্বগুলো ব্যক্তি মনের সৃষ্টি এবং পরস্পরবিরোধী। কারণ প্রত্যেক ব্যক্তির মনের চিন্তাভাবনা কখনো এক নাও হতে পারে। যার কারণে বিরোধ দেখা দেয়।
৭. মধ্যম পরিসর তত্ত্ব প্রতিশ্রুতিশীল
বৃহৎ প্রকৃতির তত্ত্বগুলো প্রতিশ্রুতিহীন হয় কিন্তু Middle Range Theory গুলো অনেক বেশি প্রতিশ্রুতিশীল। এতে এমন সময় আসতে পারে যখন এসব তত্ত্বকে আশ্রয় মানব আচরণের উচ্চমাত্রার সাধারণীকরণ সম্ভব হতে পারে।
মধ্যম পরিসর তত্ত্বের বৈশিষ্ট্য:
এ সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো:
১ মধ্যম পরিসর তত্ত্বের মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা নেই বরং। সুনির্দিষ্টতা বিরাজ করে এবং তা সরেজমিনে গবেষণা বা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়।
২. এই তত্ত্বগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন তত্ত্ব নয়, বরং তা অন্যান্য তত্ত্বের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারে।
৩. বিভিন্ন প্রকারের সামাজিক আচরণ ও সামাজিক কাঠামোর পার্থক্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এই তত্ত্বগুলো যথেষ্ট বিমূর্তরূপ ধারণ করে।
৪. এই তত্ত্বগুলো বৃহৎ ও ক্ষুদ্র পরিসরের সামাজিক সমস্যার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করে এবং সংযোগ স্থাপনকারী হিসাবে ভূমিকা পালন করে।
৫. সামগ্রিক তত্ত্বগুলো এতটাই বিমূর্ত যে এগুলোর মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট বুনন নাই কিন্তু মধ্যম পরিসর তত্ত্বগুলো সীমিত এবং সুনির্দিষ্টভাবে গঠিত।
৬. এই তত্ত্বগুলো সমাজতাত্ত্বিক সফল মতবাদকে পূরণ করে।
৭. এই তত্ত্বগুলোর ধ্রুপদী সমাজতাত্ত্বিকদের (ডুরখেইম, ওয়েবার) কাজের চলমান বিষয়।
৮. এই তত্ত্ব সর্বদা অজ্ঞতা স্বীকার করে নেয়। মূল ঘটনার জ্ঞানের ভান করে না। সাধারণভাবে এটি প্রশ্ন উঠতে পারে, সমাজবিজ্ঞান কেন আজকাল অতীতের তুলনায় মধ্য পরিসর তত্ত্ব নিয়ে বেশি আলোচনা করা হয়। এর উত্তরে মার্টন বলেন-
(ক) সামাজিক পরিবর্তনের ফলে সমাজবিজ্ঞানের রীতিনীতি, ধ্যান ধারণা, আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিবর্তন হচ্ছে।
(খ) বর্তমানে মানুষ অনুসন্ধানলব্ধ বা অভিজ্ঞতালব্ধ গবেষণার প্রতি অতীতের তুলনায় বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে।
(গ) উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এই তত্ত্বের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভূত হয়। ফলে সমাজবিজ্ঞানে অতীতের তুলনায় মধ্যম পরিসর তত্ত্ব বেশি আলোচনা করা হয়।
মার্টন তাঁর তত্ত্বে কতগুলো বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন যেগুলো Avoid করতে পারলে সমাজ গবেষণা এবং সামাজিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। যেমন-
১. মধ্যম সারির তত্ত্বগুলো হঠাৎ বা অন্তর্দৃষ্টির দ্বারা অর্জিত নয় বরং ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দ্বারা প্রত্যয়গুলোর উন্নয়ন করতে পারে।
২. Hypothesis বা প্রকল্পগুলো যাতে স্ববিরোধী না হয় সেদিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করতে হবে।
৩. কোনো একটি বিশেষ দিককে প্রাধান্য দিতে গিয়ে যাতে অন্যান্য দিক উপেক্ষিত না হয়ে পড়ে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
সমালোচনা:
কোনো তত্ত্বই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। তত্ত্বটি নিম্নোক্তভাবে সমালোচিত হয়েছে-
১. সমাজবিজ্ঞানী CW Mills বলেন, মার্টন ক্ষুদ্র পরিসর ও বৃহৎ পরিসর তত্ত্বের মধ্যে সমন্বয় সাধনে ব্যর্থ হয়েছে।
২. সমাজবিজ্ঞানী মিলার মার্টনের মধ্যম পরিসর তত্ত্ব নির্মাণের প্রচেষ্টাকে Romantic বলে আখ্যায়িত করেছে।"
৩. সমাজবিজ্ঞানী জি.এম. আন্দ্রিভা বলেন-'The rotorius theory of the middle range as a positive conception
৪. ট্যালকট পারসন্স এর মতে, মার্টন যে মধ্যবর্তী অবস্থার কথা বলেছেন তা কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়। এটাকে কল্পনাপ্রসূত তত্ত্ব ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। এ তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব নয়।
উপসংহার: সমালোচনা সত্ত্বেও রবার্ট মার্টন বর্তমানকালের সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচিত। তাঁর এ তত্ত্বের আলোকে বর্তমানে বহু সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। বস্তুত তার তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ শুধু উন্নত দেশে নয়, অনুন্নত দেশের সমস্যা বিশ্লেষণেও প্রয়োগ হচ্ছে।
