মার্টনের সমাজবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে নৈরাজ্য বা এনোমি তত্ত্বটি পর্যালোচনা
ভূমিকা: রবার্ট কে মার্টন যে কয়টি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব প্রদান করেছেন তার মধ্যে তাঁর অপরাধমূলক আচরণের নৈরাজ্য এবং সমাজ কাঠামো অন্যতম। বস্তুত এ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশে বহু পিএইচডি থিসিসও হয়েছে। এই তত্ত্বকে অনেকে Theory of Anomic বা Stuctural Anomic বলে থাকেন।
মার্টিনের নৈরাজ্য এবং সমাজ কাঠামো
মার্টন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Social Theory and Social Stucture এ অপরাধমূলক আচরণের নৈরাজ্য এবং সমাজ কাঠামো তত্ত্বটি বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করেন। অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপিত এ তত্ত্বে তিনি অপরাধমূলক আচরণের গতানুগতিক বিশ্লেষণার প্রত্যাখান করে একটি সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রদানের চেষ্টা করেন। তিনি ডুরখেইমের নৈরাজ্যের তত্ত্বটি কেবল আত্মহত্যা নয় বরং অপরাধমূলক আচরণের ক্ষেত্রে এবং বিপ্লবের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রযোজ্য হবে সে সম্পর্কেও আলোচনা করেন। মার্টন তাঁর উক্ত আলোচনা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ফ্রয়েডীয় ধারণাটি সহজার পাপের মতবাদ হয়, তাহলে বর্তমান প্রবন্ধে প্রদ্তি আলোচ্য মতবাদটি হবে "সমাজ থেকে উত্থিত পাপ" এর মতবাদ। অন্য কথায় বলা যায় যে, মার্টন যাকে বলেছেন, James S. Plant "normal reaction of normal people to abonnmal condition. বস্তুত মার্টন শুরুতেই একটি প্রশ্ন তুলেছেন, জৈবিক কারণ যাই হোক, তবুও প্রশ্ন থেকে যায় যে, কোনো বিভিন্ন সমাজ কাঠামোতে অপরাধমূলক আচরণের হার বিভিন্ন হয়। তাই মার্টন অত্যন্ত চমৎকারভাবে শুরুতেই বর্ণনা করেন যে, যদি এ ধরনের দলকে চিহ্নিত করা যায় অনুরূপ কোনো সামাজিক চাপের মধ্যে রয়েছে, তাহলে বলা যায় যে, তাদের মধ্যে অপরাধমূলক আচরণ অধিক দেখা দেবে এবং তার কারণ এই নয় যে, তাদের বিশেষ জৈবিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং তারা ঐ বিশেষ সামাজিক অবস্থায় পড়ে স্বাভাবিক আচরণই করে। যে কারণে অধ্যাপক মার্টন সমাজ কাঠামো এবং সাংস্কৃতিক কাঠামোর বিভিন্ন উপাদান থেকে দুটো উপাদান বিশ্লেষণের জন্য বেছে নিয়েছেন। সাংস্কৃতিক লক্ষ্য (Cultural goals) এবং প্রাতিষ্ঠানিক উপায় (institutionalized means)। সমাজে মানুষের এ লক্ষ্য মোটামুটি "প্রত্যাশার লক্ষ্য" দ্বারাই পরিচালিত হয়। তাই প্রত্যেক সমাজে কতগুলো স্বীকৃত প্রত্যাশা থাকে, বিশেষ করে সফলতা অর্থ, ক্ষমতা, মর্যাদা ইত্যাদি এবং প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম হচ্ছে স্বীকৃত মাধ্যম, যা দিয়ে উল্লিখিত লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে।
অনেক সময় সাংস্কৃতিক লক্ষ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক উপায় একের চেয়ে অন্যটি স্বাধীনও হতে পারে। এ ব্যাপারে তিনি দু'ধরনের সংস্কৃতির কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, এমন ধরনের সাংস্কৃতিক লক্ষ্য থাকতে পারে যার সাথে সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ের সম্পর্ক থাকবে না। এ ধরনের সাংস্কৃতিক অবস্থা, যাকে মার্টন বলেছেন, Malintegrated culture লক্ষ্যটির প্রতি এতই গুরুত্ব দেয়া হয় যে, ব্যক্তি তখন যে কোনো উপায় অবলম্বন করে, এমনকি সবচেয়ে নিষিদ্ধ উপায়ও। অন্যদিকে দ্বিতীয় ধরনের সাংস্কৃতিক অবস্থাটি হচ্ছে এমন যে, ব্যক্তি প্রধানত প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ের মাধ্যমে তার লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে লক্ষ্যের কথা ভুলে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক আচরণটি তাঁর কাছে মূল্যবান হয়ে দেখা দেয়। মার্টন মনে করেন যতোই সমাজ পরিবর্তন হোক না কেন, এ দুটো অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টাটি মুখ্য। কিন্তু দেখা যায় যে, যখনই সাংস্কৃতিক তথা সামাজিক লক্ষ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ের মধ্যে বিস্তার ব্যবধান দেখা দেয় তখনই সেখানে নৈরাজ্য দেখা দেয়। তিনি বর্তমান আমেরিকান সমাজের উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, এ সমাজে অর্থকে অস্বাভাবিক মূল্য দেয়া হয়েছে। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, আমেরিকানদের স্বপ্ন হচ্ছে আকাশচুম্বী কিন্তু তা বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উপায় রয়েছে কিনা এবং তাতে সমাজের সকল সদস্যের সম-সুযোগ রয়েছে কিনা সেটি হচ্ছে বড় প্রশ্ন। মার্টন তাই ব্যক্তি কীভাবে উক্ত অবস্থায় নিজেকে খাপ খাওয়ায় তাঁর একটি সুন্দর উদাহরণ দেন:
১. সংগতিপূর্ণ:
যখন সাংস্কৃতিক নির্ধারিত লক্ষ্য এবং সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতি ব্যক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়, তখন ব্যক্তি নির্ধারিত লক্ষ্য ও পন্থা মেনে চলে। এটাই হলো সমাজের সঙ্গতিপূর্ণ ব্যাপার। অর্থাৎ নৈরাজা ও বিচ্যুতিমূলক অবস্থা সৃষ্টির বিপরীতে এর অবস্থান। মার্টন বলেন, সমাজের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তি এটা মেনে চলে বলে সমাজে বিচ্যুত আচরণকারীর সংখ্যা কম।
২. উদ্ভাবন:
মার্টন বলেন- Innovaton refers to the rejection of institutional practices but the retention of cultural goals, ব্যক্তির নিকট সাংস্কৃতিক লক্ষ্যটা গ্রহণযোগ্য। তবে সমাজ বা প্রতিষ্ঠান যে পন্থার মাধ্যমে চলতে বলে তা মানা হয় না। তখন বিকল্প পন্থা বেছে নেয়া হয় এবং সমাজ এর নির্ধারিত পন্থা ছাড়াও আরো নতুন নতুন পন্থা তৈরি করে নেয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্যক্তি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে চায় পড়াশুনা না করে, নকল করে। তবে সমাজের কিছু সংখ্যক মানুষ সমাজের এ পন্থা মেনে নেয় না। ফলে বিকল্প পন্থা উদ্ভাবন করা হয়।
৩. প্রথানিষ্ঠতা:
প্রথানিষ্ঠতা এমন একটি অভিযোজন অবস্থা, যখন ব্যক্তি সাংস্কৃতিকভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো সম্পর্কে অসচেতন, ভীত হয়ে ওঠে এবং বর্জন করে। এক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ব্যক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য নয় কিন্তু যে পন্থায় লক্ষ্য অর্জিত হবে সে পন্থা মেনে চলে। এটা হলো সংস্কৃতির অসম অগ্রগতি। যেমন- বর্তমান প্রজন্মের যুবকদের সাথে প্রৌঢ়দের তফাৎটা হলো দৃষ্টিভঙ্গিগত ও মুল্যাবোধের পার্থক্যের কারণে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষিত সমাজের অনেকেই বর্ণপ্রথাকে মুখে মুখে মানে না কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটা ঘটেG
৪. পশ্চাৎপসার:
পশ্চাৎপসার আসলে লক্ষ্য ও উপায় উভয়কে অবজ্ঞার মাধ্যমে ব্যক্তির নিরূপদ্রব সামাজিক বসবাসকে বুঝায়। এ প্রাসঙ্গে বলা যায়, Retrealesta pattern consists of the substantial abandoning both the once-esteemed cultural goals and of institutionsized practices directed towards those goals. সাংস্কৃতিক লক্ষ্য এবং পন্থা কোনোটিই ব্যক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে ব্যক্তি সমাজ থেকে নিজেকে আড়াল বা গুটিয়ে নেয়। কোনো প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ করে না। ব্যক্তি খুব সহজ পন্থা অবলম্বন করে। যেমন- কোনো বিষয় থেকে পশ্চাৎপসারণ করে।
৫. বিদ্রোহ:
সর্বশেষ অভিযোজন অবস্থাটি হলো বিদ্রোহ। এখানে পন্থা এবং লক্ষ্য দু'টোই ব্যক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য নয় কিন্তু এতেই তারা থেমে থাকে না। তারা আরেকটা বিকল্প পন্থা নির্দেশ করে। এ প্রসঙ্গে মার্টন বলেন, Rebellious behaviour is most likely...where frustation and perceived deprivations over the failure to realize through ligimate channels dramatically increase and where groups codifying and ideológy capable of mobilizing deprivations exist (Turner, 1982:89) তাই বলা হয় সত্যিকার অর্থেই ব্যক্তিদেরকে ধ্বংসাত্মক ধারায় গেলে চলবে না, একটা বিকল্প উপায়ও বের করতে হবে। যেমন তারা বর্তমান সমাজকে বর্জন করে তা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করবে, এটাই শেষ কথা নয়, সাথে সাথে আরেকটি নতুন সমাজ কাঠামোর ধারণা দিতে হবে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, শাস্ত্রী হলো একটা ডিগ্রির নাম। বৃটিশদের অধীনে শিক্ষা গ্রহণ না করে তারা দেশের মধ্যে বিকল্প পন্থা হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। ঐ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তারা যে শিক্ষা গ্রহণ করতো তাদেরকে বলা হতো শাস্ত্রী। যেমন- ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। উল্লেখিত পাঁচ ধরনের আচরণের মধ্যে ব্যক্তি যে কোনো একটিতে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে।
সমালোচনা:
কোনো তত্ত্বই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে মার্টনের তত্ত্বও ব্যতিক্রমী নয়। মার্টনের অ্যানোমি সংক্রান্ত আলোচনা অস্পষ্ট। এটার আরো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। তিনি আমেরিকান সমাজের প্রেক্ষাপটে অর্থকে লক্ষ্য হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। এ ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, অর্থের মাধ্যমে যখন কোনো লক্ষ্য অর্জন করা হয় তখন লক্ষ্য না হয়ে উপায় হয়ে যায়। যাই হোক, মার্টনের তত্ত্বের সমালোচনা করা হলেও একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যক্তির বিচ্যুত আচরণ প্রণালি ব্যাখ্যা করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। সে দিক থেকে বস্তুবাদী সমাজতত্ত্ববিদদের কাছে না হলেও ভাববাদীদের উপর মার্টিনের বেশ প্রভাব রয়েছে।
