পরিবেশ শরণার্থী কি, প্রকারভেদ লিখ। শরণার্থী ও উন্নয়ন তাড়নায় বিতাড়িত জনগোষ্ঠীর সাদৃশ্য

পরিবেশ শরণার্থী কারা? শরণার্থী প্রকারভেদ ও উন্নয়ন তাড়নায় বিতাড়িত জনগোষ্ঠীর সাদৃশ্য

ভূমিকা: বর্তমান বিশ্বে “পরিবেশ শরণার্থী” একটি বহুল আলোচিত বৈশ্বিক সমস্যা। মানুষের জীবনধারা, শিল্পায়ন, বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে প্রতিনিয়ত পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ তাদের আবাস হারাচ্ছে। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী বা দরিদ্র শ্রেণি যদি পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজিত হতে না পারে, কিংবা প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগে তাদের বসতি ধ্বংস হয়ে যায়, তখন তারা বাধ্য হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয়। এ ধরনের মানুষকেই বলা হয় পরিবেশ শরণার্থী।

পরিবেশ শরণার্থী কি, প্রকারভেদ লিখ

পরিবেশ শরণার্থীর সংজ্ঞা

পরিবেশ শরণার্থী হলো সেই ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী, যারা পরিবেশগত বিপর্যয় বা পরিবর্তনের কারণে তাদের স্থায়ী আবাসভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, ভূমিকম্প, সুনামি, নদীভাঙন কিংবা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে যখন মানুষ বসবাসের উপযোগী পরিবেশ হারায়, তখন তারা আশ্রয় খুঁজতে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়।

সুতরাং বলা যায়,  “বিভিন্ন পরিবেশগত পরিবর্তন বা দুর্যোগের ফলে যারা তাদের নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়, তাদেরই পরিবেশ শরণার্থী বলা হয়।”

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপকূলীয় অঞ্চলের নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়জনিত বাস্তুচ্যুতি এই সমস্যার প্রকট উদাহরণ।

পরিবেশ শরণার্থীর প্রকারভেদ

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) পরিবেশ শরণার্থীকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করেছে-

১️. বাধ্যগত পরিবেশ শরণার্থী (Forced Environmental Refugees):

যখন আকস্মিক ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, সুনামি, ভূমিধস বা ভূমিকম্পের কারণে মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেন এবং কোনো উপায় না দেখে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, তখন তাদের বলা হয় বাধ্যগত পরিবেশ শরণার্থী।

উদাহরণ: বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় সিডর, আইলা বা আম্পান পরবর্তী সময়ে বাস্তুচ্যুত মানুষ।

২️. চাপের মুখে পরিবেশ শরণার্থী (Pressured Environmental Refugees):

এই শ্রেণির শরণার্থীরা তাত্ক্ষণিকভাবে নয়, বরং ধীরগতির পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়। যেমন- জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মরুকরণ, নদীভাঙন বা কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাসের কারণে যখন জীবিকা সংকটে পড়ে মানুষ অন্যত্র চলে যায়।

উদাহরণ: চরাঞ্চল বা নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষ যারা জীবিকার খোঁজে শহরে চলে আসে।

৩️. ঐচ্ছিক পরিবেশ শরণার্থী (Voluntary Environmental Refugees):

যখন কোনো জনগোষ্ঠী সম্ভাব্য বিপর্যয়ের আশঙ্কায় আগেই তাদের আবাস ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যায়, তখন তাদের বলা হয় ঐচ্ছিক পরিবেশ শরণার্থী।

উদাহরণ: উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ যারা ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কায় আগেই শহরে বা উঁচু এলাকায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে।

শরণার্থী ও উন্নয়ন তাড়নায় বিতাড়িত জনগোষ্ঠীর সাদৃশ্য

পরিবেশ শরণার্থী এবং উন্নয়ন তাড়নায় বিতাড়িত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই মানুষ তার নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ বা বাস্তুচ্যুত হয় এবং জীবিকার সন্ধানে নতুন পরিবেশে অভ্যস্ত হতে বাধ্য হয়।

সাদৃশ্যসমূহ-

১. উভয় গোষ্ঠীই স্বেচ্ছায় নয়, বরং বাধ্য হয়ে নিজের আবাসভূমি ত্যাগ করে।

২. উভয় ক্ষেত্রেই জীবিকার উৎস, সামাজিক পরিচয় ও সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৩. পুনর্বাসনের অভাবে তারা অর্থনৈতিকভাবে অসহায় হয়ে পড়ে।

৪. উভয় গোষ্ঠীরই নতুন পরিবেশে অভিযোজন সমস্যা দেখা দেয়।

৫. জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উভয়ই মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।

অর্থাৎ, যেমন যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষ শরণার্থী হয়, তেমনি উন্নয়ন প্রকল্প, বাঁধ নির্মাণ বা শিল্প স্থাপনের কারণে ভূমি হারানো মানুষও বাস্তুচ্যুত হয়। উভয়ের মধ্যেই স্থানচ্যুতির বেদনা ও বঞ্চনা একই রকম।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, পরিবেশ শরণার্থী সমস্যা বর্তমান পৃথিবীর এক গভীর মানবিক সংকট। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট পরিবেশদূষণের কারণে কোটি কোটি মানুষ তাদের জন্মভূমি হারাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে এই সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে।

এ সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন টেকসই পরিবেশনীতি, দুর্যোগপ্রতিরোধী অবকাঠামো, বিকল্প জীবিকাব্যবস্থা এবং বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন কর্মসূচি। মনে রাখতে হবে। পরিবেশ শরণার্থী শুধু এক দেশের নয়, পুরো মানবজাতির সংকট। তাই এর সমাধানও হতে হবে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও মানবিক চেতনার ভিত্তিতে।

No comments:

Post a Comment