জুম চাষ কী? জুম চাষের বৈশিষ্ট্য, সুবিধা, অসুবিধা লিখ
ভূমিকা: ইংরেজি Shifting Cultivation এর বাংলা অনুবাদ হলো “জুম চাষ” বা “পালাক্রম চাষ”। এটি একটি প্রাচীন ও স্বতন্ত্র কৃষি ব্যবস্থা। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চল রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার পাহাড়ি উপজাতি যেমন চাকমা, মারমা, ম্রো, খুমি, বম, লুসাই প্রভৃতি জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে জুম পদ্ধতি চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। লাঙল চাষের প্রচলন হওয়ার আগে প্রায় ১২/১৩ প্রধান উপজাতিদের এই জুম চাষই ছিল প্রধান অর্থনৈতিক উৎপাদনব্যবস্থা।
জুম চাষ মূলত এমন এক ধরনের কৃষি পদ্ধতি যেখানে জমি কিছু বছর ব্যবহারের পর তা পরিত্যাগ করে নতুন জমিতে চাষ শুরু করা হয়। পাহাড়ি ঢালে জঙ্গল পুড়িয়ে এই চাষের প্রস্তুতি নেওয়া হয়, তাই একে Slash and Burn চাষও বলা হয়। প্রাচীনকাল থেকেই পার্বত্যবাসীদের জীবনের সঙ্গে জুম চাষ জড়িয়ে আছে, যা কেবল একটি কৃষি ব্যবস্থা নয়, বরং তাদের সংস্কৃতি, উৎসব ও ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জুম চাষের সংজ্ঞা:
জুম চাষ বলতে বোঝায় এমন একটি কৃষি ব্যবস্থা, জুম চাষ সাধারণত পাহাড়ের ঢালে ঘন জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে করা হয়। চাষিরা প্রথমে সমস্ত বৃক্ষের মাথা কেটে ফেলে যাতে পর্যান্ত পরিমাণে সূর্যালোক জমিতে প্রবেশ করতে পারে।তারপর সেখানে জঙ্গলে ঘেরা ভূমি আগুন দিয়ে পরিষ্কার করে তাতে ধান, ভুট্টা, মরিচ, আদা, হলুদ, কুমড়া, শাকসবজি প্রভৃতি ফসল উৎপাদন করা হয়। কয়েক বছর পর মাটি অনুর্বর হয়ে গেলে সেই ভূমি পরিত্যাগ করে নতুন ভূমিতে একই পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করা হয়।
সাধারণভাবে বলা যায়, বনাঞ্চল এলাকায় পরিচালিত স্থানান্তরমূলক কৃষিকাজই হলো জুম চাষ।
জুম চাষের বৈশিষ্ট্যসমূহ
জুম চাষের বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো
১. স্থানান্তরভিত্তিক কৃষি পদ্ধতি:
জুম চাষে কোনো একটিমাত্র জমিতে দীর্ঘদিন ধরে চাষ করা হয় না। নির্দিষ্ট সময়ের পর কৃষক সেই জমি ত্যাগ করে নতুন জায়গায় চাষ শুরু করেন। পরিত্যক্ত জমি প্রাকৃতিকভাবে পুনরায় বনাঞ্চলে পরিণত হয়, যা পরে আবার জুমের উপযোগী হয়।
২. Slash and Burn পদ্ধতি:
জুম চাষের ক্ষেত্রে প্রথমে জঙ্গলাকীর্ণ জমিতে গাছপালা কেটে ফেলা হয় (Slash), এরপর শুকনো ডালপালা ও গাছ পোড়ানো হয় (Burn)। এতে আগুনের ছাই জমির সঙ্গে মিশে প্রাকৃতিক জৈবসার হিসেবে কাজ করে এবং ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশ সরবরাহ করে।
৩. চক্রাকার ভূমি ব্যবহার:
একটি ভূমিতে জুম ফসল চাষের পর কয়েক বছর বিরতি দিয়ে পুনরায় সেই ভূমিতে চাষ করা হয়। এই বিরতির সময়টিতে জমিতে নতুন গাছপালা গজিয়ে মাটির উর্বরতা পুনরুদ্ধার করে। সাধারণত ৬–১০ বছর পর পুরোনো জমি আবার ব্যবহৃত হয়।
৪. বহুবিধ ফসল উৎপাদন:
জুম চাষে একসঙ্গে বিভিন্ন প্রকার ফসল চাষ করা হয়। যেমন ধান, ভুট্টা, কুমড়া, মরিচ, তিল, তিলের সাথে বিভিন্ন শাকসবজি। এতে ফসলের বৈচিত্র্য থাকে এবং একই জমি থেকে একাধিক ফসল পাওয়া সম্ভব হয়।
৫. প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার:
জুম চাষে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত বৃষ্টি, সূর্যালোক, মাটির উর্বরতা ও ছাইভস্মকে কাজে লাগানো হয়। কোনো কৃত্রিম সার বা রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহৃত হয় না। ফলে এটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক।
৬. উপজাতীয় জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োগ:
জুম চাষ কেবল কৃষিকাজ নয়; এটি উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের অংশ। তারা নক্ষত্রের অবস্থান, ঋতুচক্র, বৃষ্টিপাতের সময়, মাটির প্রকৃতি ইত্যাদি দেখে নির্ধারণ করে কখন জমি প্রস্তুত করতে হবে এবং কখন ফসল তোলা উপযুক্ত হবে।
৭. কম যান্ত্রিকতা:
জুম চাষে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় না। কৃষকরা দা, কোদাল, কুঠার ইত্যাদি সরল উপকরণ ব্যবহার করে জমি পরিষ্কার ও চাষাবাদ সম্পন্ন করেন।
৮. পরিবারভিত্তিক শ্রমনির্ভর কৃষি:
প্রতিটি পরিবারের সদস্যরা একত্রে কাজ করে পুরুষরা জমি পরিষ্কার ও পোড়ানোর কাজ করে, নারীরা বীজ বপন ও ফসল সংগ্রহে সাহায্য করে।
৯. স্বল্প উৎপাদন ও স্বনির্ভরতা:
জুম চাষ মূলত আত্মনির্ভরশীল কৃষি। উৎপাদিত ফসল পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহৃত হয়; বাজারে বিক্রির জন্য নয়।
১০. পরিত্যক্ত ভূমির পুনঃব্যবহার:
জুমের পর যে জমি ফেলে রাখা হয়, তাকে “ফ্যালো ল্যান্ড” বলা হয়। কিছু সময় পর প্রাকৃতিকভাবে গাছ জন্মে এই ভূমি আবার উর্বর হয়ে ওঠে, যা ভবিষ্যতে নতুন জুম চাষের উপযোগী হয়।
জুম চাষের সুবিধাসমূহ
জুম চাষের বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হলো-
১. প্রাকৃতিক পদ্ধতির কৃষি:
জুম চাষে রাসায়নিক সার, কীটনাশক বা মেশিন ব্যবহার করা হয় না। ফলে মাটির প্রাকৃতিক গঠন নষ্ট হয় না এবং পরিবেশ দূষণ ঘটে না।
২. মাটির জৈব উপাদান বৃদ্ধি:
গাছপালা পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন ছাই মাটির সঙ্গে মিশে প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে। এতে মাটিতে নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম ও ফসফরাসের পরিমাণ বেড়ে যায়।
৩. বহুবিধ ফসল উৎপাদন:
একই জমিতে একসঙ্গে বিভিন্ন ফসল চাষের মাধ্যমে খাদ্য বৈচিত্র্য নিশ্চিত হয়, যা পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৪. অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী:
এই চাষে কোনো জমি ক্রয়, সেচব্যবস্থা বা যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না। ফলে খরচ কম এবং দারিদ্র্যপীড়িত উপজাতিদের জন্য এটি সহজলভ্য কৃষিপদ্ধতি।
৫. সমাজে সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি:
জুম চাষে একত্রে কাজ করার ফলে উপজাতি সমাজে পারস্পরিক সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও সামাজিক ঐক্য বৃদ্ধি পায়। জুমের পর জুমের চাষিদের মধ্যে ফসলের সমবণ্টন করা হয়। ফলে এদের মধ্যে কোনো বৈষমা থাকে না।
৬. পরিবেশের স্বাভাবিক পুনর্জন্ম:
জুমের চক্র ৬–১০ বছরের ব্যবধানে সম্পন্ন হয় বলে এই সময়ের মধ্যে জঙ্গল ও গাছপালা প্রাকৃতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ পায়।
৭. স্থানীয় সংস্কৃতির সংরক্ষণ:
জুম চাষ উপজাতিদের ধর্মীয় উৎসব, গান, নৃত্য ও আচার-অনুষ্ঠানের অংশ। এটি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় অটুট রাখে।
জুম চাষের অসুবিধাসমূহ
জুম চাষের যেমন সুবিধা আছে পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও রয়েছে সেগুলো নিম্নরূপ-
১. মাটির উর্বরতা হ্রাস:
দুটি জুমের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান কমপক্ষে ১০ বছর না রাখা হলে জঙ্গলের বিকাশ ঠিকমতো হয় না। কিন্তু বর্তমানে অধিক চাপের ফলে সময়ের ব্যবধান ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে জমির উপর চাপ বাড়ছে উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
২. বন উজাড় ও পরিবেশ ধ্বংস:
জুম চাষের জন্য জঙ্গল পোড়ানো হয়, যা বননিধন ঘটায়। এতে বনজ সম্পদ ধ্বংস হয়, বন্যপ্রাণীর আবাস নষ্ট হয় এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে।
৩. ভূমিক্ষয় ও পাহাড়ধস:
বৃক্ষনিধনের ফলে পাহাড়ের মাটি বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যায়, ঢালে মাটিক্ষয় ও পাহাড়ধসের আশঙ্কা বাড়ে।
৪. বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন:
গাছ পোড়ানোর সময় প্রচুর পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়, যা বায়ুমণ্ডল দূষিত করে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বৃদ্ধি করে।
৫. ফসলের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা:
জুম ফসল প্রাকৃতিক বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত হলে ফসল নষ্ট হয়, ফলে কৃষকের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
৬. জমির অভাব:
অধিক জনসংখ্যা ও সীমিত পাহাড়ি ভূমির কারণে জুম চক্রের জন্য যথেষ্ট সময় (৬–১০ বছর) দেওয়া সম্ভব হয় না। এতে জমির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
৭. দারিদ্র্য ও বেকারত্ব:
জুম মৌসুমভিত্তিক কৃষিকাজ। ফসল তোলার পর বছরের বাকি সময় উপজাতি পরিবারগুলো কাজের অভাবে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।
৮. উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা:
এই পদ্ধতিতে ফসলের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হয় এবং বাজারে বিক্রির মতো উদ্বৃত্ত উৎপাদন হয় না। ফলে কৃষকদের আয় সীমিত থাকে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, জুম চাষ বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতি সমাজের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর, স্বল্প ব্যয়বহুল এবং ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি। তবে আধুনিক যুগে এর কিছু মারাত্মক সীমাবদ্ধতা যেমন বন ধ্বংস, মাটিক্ষয়, পরিবেশ দূষণ ও অল্প উৎপাদন একে টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা তৈরি করছে।

No comments:
Post a Comment