ক্ষুদ্র সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী বা আদিবাসীদের বন-নির্ভরশীলতার কারণসমূহ বর্ণণা
ভূমিকা: বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩০০ বিলিয়ন বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগত সংস্কৃতির পরিচয় বহনকারী আদিবাসী মানুষ বসবাস করে। এরা সমগ্র পৃথিবীর জনসংখ্যার ক্ষুদ্র অংশ হলেও বিশ্বব্যাপী সংস্কৃতি বৈচিত্র্যের প্রায় ৯৫% এরাই বহন করে। বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন ক্ষুদ্র আদিবাসী গোষ্ঠী ঘনিষ্ঠভাবে পরিবেশের উপর নির্ভরশীল।
ক্ষুদ্র সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী বা আদিবাসীদের ঘনিষ্ঠ বন-নির্ভরশীলতার বিভিন্ন কারণ
যেসব কারণে বনের উপর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী বা lindigenous people এর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়, তা নিম্নের আলোচনায় তুলে ধরা হলো-
১. খাদ্যের জন্য নির্ভরশীলতা:
খাদ্যের জন্য বনের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ক্ষুদ্র সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শিকারি সংগ্রাহক সম্প্রদায়। বনে অধিষ্ঠানয়ত মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যের আমিষ এবং নিরামিষ বা উভয়বিধ চাহিদা বাদেয় বিভিন্ন প্রাণী এবং উদ্ভিদ খারা নিবৃত্ত এবং বিভিন্নভাবে মানুষ বন থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে। যেমন-
১। ফলমূল আহরণের মাধ্যমে,
২। শিকার করার মাধ্যমে,
৩। মৎস্য শিকার করার মাধ্যমে,
৪। বনে বিভিন্ন সবজি ও অন্যান্য উদ্ভিজ খাদ্যশস্য চাষের মাধ্যমে।
বর্তমান বিশ্বের অপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বেশিরভাগই বনে উৎপাদন করা সম্ভব। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, যত বেশি দরিদ্র মানুষ কোনো দেশে থাকে তত বেশি তাদের বননির্ভরতা বাড়তে থাকে। কারণ বনের খাদ্য বেশিরভাগ সময়ে কিনে খেতে হয় না। বনে বসবাস না করলেও পৃথিবীর বেশিরভাগ অতি দরিদ্র মানুষ তাদের খাদ্যের জন্য বনের উপর নির্ভর করে। যদি বন না থাকত তাহলে পৃথিবীজুড়ে খাদ্যের আকাল দেখা দিত এবং অধিকাংশ দরিদ্র মানুষ খাদ্যের অভাবে মৃত্যুবরণ করত। শিকারি সংগ্রাহক সম্প্রদায়গুলো সরাসরি তাদের খাদ্যের জন্য বনের উপর নির্ভরশীল।
২. আশ্রয়ের জন্য বন্য-নির্ভরশীলতা:
বনজীবী মানুষেরা তাদের বাসস্থানের জন্য সম্পূর্ণরূপে বনের উপর নির্ভরশীল। বনজীবী হতদরিদ্র সম্প্রদায়গুলো গৃহ নির্মাণের প্রতিটি উপদ্রব বন থেকে সংগ্রহ করে তাতে আবাসন গড়ে আবার অনেক সময় প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে যেসব গৃহ নির্মিত হয় না সেখানে স্থাপনা তৈরিতেও বন হতে গৃহীত কাঠের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। বর্তমানে কাঠের পচনশীলতার জন্য কাঠের পরিবর্তে ব্যাপক হারে অন্য নির্মাণ উপাদান, যেমন- অ্যালুমিনিয়ামের পাতের ব্যবহার বাড়ছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশের গ্রাম্য সম্প্রদায়ের বাসস্থান হিসেবে ব্যাপক পরিমাণে মাটির ঘরের ব্যবহার এ মাটিও অনেক সময়ে জঙ্গল থেকে আনা হয়। এভাবে দেখা যায় অশ্রয় সংস্থানের জন্য বনের উপর অনেক মানুষ পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল।
৩. ভোগ্য পণ্য নির্ভরতা:
প্রাযুক্তিক সরলতার জন্য বননির্ভর হতদরিদ্র বা অতিদরিদ্র মানুষের পক্ষে তাদের খাদ্য, আশ্রয় এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে বনের উৎপাদন বাড়িয়ে নেয়া সম্ভব হয় না। ফলে তারা বনের উপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়। বিশ্বজুড়ে ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির জন্য দেখা যায় অনেক সময় পৃথিবীর বেশিরভাগ দরিদ্র এবং হতদরিদ্র মানুষ একধরনের ভোগবিহীন ক্ষুন্নীবৃত্তির জীবন বা band to mouth জীবনযাপনে বাধ্য হয়। বনের বিভিন্ন উপাদানের দ্বারা তখন নিজস্ব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিলাস উপকরণ তৈরি করতে থাকে। যেমন- মেয়েদের বিভিন্ন প্রশ্নধন সামগ্রী, বিভিন্ন ভেষজ মাদক তৈরি বা সৌকর্যময় গৃহসজ্জার উপকরণ এরা বনজ বিভিন্ন উপকরণ দ্বারা তৈরি করে এবং এক ধরনের সৌকর্যময় জীবনযাপনের চেষ্টা করে। সহজ সরল জীবনের সাথে সৌকর্যের যোগাযোগ এদের জীবনীশক্তি বাড়িয়ে দেয়। বনজ উপকরণজাত বস্ত্র এদের অনেকের একমাত্র পরিধেয়। যদি যন না থাকে এদের বস্ত্রহীন থাকতে হবে।
৪. ঔষধি পণ্যের নির্ভরতা:
বেশিরভাগ সময়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে বা দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি বসবাস করার জন্য চিকিৎসাসেবার জন্য সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে এরা বনজ উপাদান নির্ভর বিভিন্ন চিকিৎসা উপাদান এবং ঔষধের উপর নির্ভরশীল। অনেক দিনের ব্যবহারের ফলে বা প্রজন্মান্তরে ব্যবহারের ফলে কোন গাছ বা কোন শিকড়ের অংশ কোন রোগের জন্য ফলপ্রসু চিকিৎসা তৈরি করতে পারে তার সুস্পষ্ট জ্ঞান এদের মধ্যে তৈরি হয়ে যায়। এজনা দেখা যায় যে, এসব বনজীবীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকে, যা বনের বৃক্ষের পাতা, শিকড়, রস ইত্যাদির সঠিক পরিমিত ব্যবহার এবং বিভিন্ন বিশ্বাসের সমাহার। এই চিকিৎসাব্যবস্থা অনেক সময় এত বেশি ফলপ্রসূ যে প্রতিষ্ঠিত মূলধারার চিকিৎসাব্যবস্থার পাশাপাশি এরা আরেকটা সমান্তরাল চিকিৎসাব্যবস্থা তৈরি করে। যেমন-ইউনানী চিকিৎসা, কবিরাজি চিকিৎসা, চীনা চিকিৎসা পদ্ধতি এবং কোরিয়ান চিকিৎসা পদ্ধতি ইত্যাদি।
৫. পেশাভিত্তিক নির্ভরশীলতা:
অনেক সময় বনজীবী মানুষদের মধ্যে সম্পূর্ণ বনভূমি নির্ভর পেশাবৃত্তিয় বিকাশ লাভ করে, বনভূমির বাইরে যে পেশার কোনো মূল্য নেই। যেমন- বননির্ভর শিকারি পেশা, বনের কাঠুরিয়া, বনের উপকরণজাত হস্তশিল্প ইত্যাদি। বনের বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে ক্ষুদ্র হস্তশিল্পের বিকাশ ঘটে। যে হস্তশিল্পের মূল্যায়ন মূলধারার সমাজে অন্যভাবে হয়। কিন্তু কোনো কারণে বন না থাকলে এসব হস্তশিল্প সম্পূর্ণ বেকারত্বে পতিত হতে পারেন। আবার বনের ফল সবজি সংগ্রহক এক ধরনের অর্থনৈতিক পেশায়ন এখানে হয়। এরা মূলত বনের গাছের সবজি, ফল সংগ্রহ করে মূলধারার বাজার ব্যবস্থায় বিক্রি করে।
৬. গবাদিপশুর চারণের জন্য নির্ভরশীলতা:
বনজীবী মানুষেরা তাদের বিভিন্ন গবাদিপশু চারণের জন্য মূলত বনের উপর নির্ভর করে। বনের বিভিন্ন ঘন বৃক্ষের মধ্যেই তারা তাদের গবাদিপশু চারণ করেন। এভাবে এসব পশুর থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন বর্জ্য আবার বনজসার হিসেবে বনেই থেকে যায়। বেশিরভাগ সময়ে বনে চারণকারী সম্প্রদায়গুলো স্থান পরিবর্তন করে গবাদিপশু চারণ করে, ফলে কোনো জমির উপর চাপ পড়ে না এবং ঘাস ও অন্যান্য ক্ষুদ্র গুল্ম লতা-পাতার খুব বেশি ক্ষতিসাধন হয় না। সাধারণত বন বহির্ভূত গবাদিপশু চারণকারী সম্প্রদায় একই ভূমিতেই চারণ করে বার বার। এভাবে একই ভূমির উপর বার বার চাপ পড়ায় তা সম্পূর্ণ অনুৎপাদনশীল এবং অনুর্বর হয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা যায়। পরবর্তীতে ঐ ভূমি অন্য কাজেও ভালোভাবে ব্যবহার করা যায় না। ফলে বনজ সম্প্রদায়ের গবাদিপশু চারণ আনেক বেশি পরিবেশ সাশ্রয়ী এবং প্রতিবেশবান্ধব অনেক গবেষণায় দেখা যায়।
৭. সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় নির্ভরশীলতা:
খাদ্য, বস্তু আশ্রয়, চিকিৎসার জন্য বনজীবী সম্প্রদায়গুলো বনের বৃক্ষ ও প্রাণীর উপর প্রজম্ম হতে প্রজন্মে অনেক সময়ে সহস্রধিক বছর ধরে নির্ভরশীল হওয়ার কারণে এরা বনের সাথে একধরনের আত্মিক সম্পর্ক তৈরী হয়। এই আত্মিক সম্পর্কের বিভিন্ন প্রকাশ এদের ধর্মীয় এবং বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক বিশ্বাসে পরিলক্ষিত হয়। প্রায় প্রতিটি বনজীবী সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাসে এক বা একাধিক ঋতুভিত্তিক দেব-দেবী বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব দেখা যায়। এই ধর্মীয় বন্ধন বনভূমি ও বনের বিভিন্ন উপাদানের সাথে এদের সাংস্কৃতিক বন্ধনও তৈরি করে। এদের ধর্মে বননির্ভর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আচার-আচরণ দেখা যায়।
৮. জ্বালানি নির্ভরশীলতা:
বনে বাসকারী বিভিন্ন বনজীবী সম্প্রদায় তাদের রান্না ও অন্যান্য কাজে যে জ্বালানি প্রয়োজন তার জন্য সম্পূর্ণরূপে বনের বিভিন্ন জ্বালানি বৃক্ষ, শুকনো পাতা ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, পৃথিবীর জ্বালানি ব্যবহারকারী বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মধ্যে সর্বনিম্ন পরিমাণ জ্বালানির ব্যবহার বনজীবী মানুষরা করে থাকে। এত সীমিত জ্বালানির ব্যবহার উন্নত সভ্যতায় করা হয় না। এর ফলে প্রতিনিয়ত পৃথিবীতে জ্বালানি সংকটের সম্ভাবনা আরও বাড়ছে। শুধু বনজীবী মানুষ নয় বরং বনের আশপাশে বসবাসকারী দরিদ্র বা অনেক সময়ে শহরে দরিদ্র বা হতদরিদ্র সম্প্রদায়র জ্বালানির জন্য অতি সুলভ, অভি সম্ভা অনেক সময়ে প্রায় বিনে পয়সায় কাষ্ঠ জ্বালানির উপর নির্ভর করেন, যা বৃক্ষ ছাড়া অন্য কোথা থেকে আসতে পারে না। এ জ্বালানির বেশিরভাগ বনে থাকে, ফলে বনের জ্বালানিই এদের একমাত্র ভরসা।
৯. গৃহস্থালি উপকরণ নির্ভরশীলতা:
একটি গৃহস্থালিতে খাদ্য, বস্ত্র ছাড়া আর যা যা উপকরণ প্রয়োজন হয় তার প্রায় সব বনজীবী সম্প্রদায়ের মানুষরা বন হতে সংগ্রহ করে। গৃহস্থালির বিভিন্ন আসবাব, চাটাই, কম্বল, মাদুর এবং অন্যান্য অনেক প্রয়োজনীয় সামগ্রী এরা বন হতে সংগৃহীত উপাদান ব্যবহার করে তৈরি করে। আবার এসব সামগ্রী তারা মূলধারায় সম্প্রদায়ের বাজারি সৌন্দর্যমন্বিত উপকরণ বা হস্তশিল্প হিসেবে বিক্রি করে দেয় এবং অর্থ উপার্জন করে। অনেক দিন পর্যন্ত মূলধারার জনগোষ্ঠীর গৃহস্থালির আসবাব উপকরণের একমাত্র উৎস ছিল বিভিন্ন বনজ কাঠ কিন্তু বর্তমানে সময়ের সাথে সাথে অন্যান্য উপাদান নির্ভর আসবাব শিল্প বিকশিত হচ্ছে এবং কাঠনির্ভরতা কমছে। কাঠ ছাড়াও বাঁশ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়েও বনজ মানুষ তাদের গৃহস্থালি উপকরণ নির্মাণ করে।
১০. মানবীয় সৌকর্যমূলক নির্ভরতা:
মূলধারা বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে মূলধারার সমাজের বিভিন্ন ধরনের মানবীয় বিনোদনমূলক সৌকর্যের উপাদানগুলো থেকে এরা বিচ্ছিন্ন থাকে। ফলে বনভূমিতে বসবাসকারী সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত লোকসাহিত্যের বিকাশ ঘটে। লোকসাহিত্য, লোককবিতা, লোকগানের আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত বিকাশ এখানে ঘটে, যা কোনোভাবেই মূলধারার সংস্কৃতির অন্যান্য উপাদানের মতো নয়। অনেক সময় তারা তাদের আবাস বিচ্ছিন্ন এবং উৎপাটিত হলেও তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে এসব লোকজ বিনোদন সংস্কৃতি থেকে যায় অনেক দিন পর্যন্ত।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, পৃথিবীয় যেসব অংশ এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা কম সেখানে পরিবেশ বৈচিত্র্য এবং আবহাওয়া দূষণ প্রায় ফাংসোনুম্মুখ বাস্তবতার সম্মুখীন হচ্ছে প্রতিনিয়ত পৃথিবীর ১৭৫টি দেশের ৬৪টিতে স্বনিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আবাস রয়েছে। এরা প্রকৃতিনির্ভর নিজস্ব ক্ষুদ্র সংস্কৃতির মানুষ। প্রকৃতির সাথে এদের আত্মিক সম্পর্ক তাই প্রকৃতি রক্ষা হলে তারা নিজেরা বাঁচবে এ ধরনের সমাজ সাংস্কৃতিক মানস হতে এরা পরিবেশ রক্ষায় আগ্রহী হয় এবং অনেক সময়ে পরিবেশকে নিজেদের আত্মার অংশ মনে করে।

No comments:
Post a Comment