ইকোপার্ক কি? বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত ইকোপার্কসমূহ সম্পর্কে লিখ

বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন ইকোপার্কসমূহ সম্পর্কে লিখ

ভূমিকা: বাংলাদেশের মোট আয়তনের ২.৫২ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি, যা দেশের মোট আয়তনের ১৭.০৩ ভাগ। ২.৫২ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমির মধ্যে বনবিভাগ নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ ১৫২ হেন্দ্রর যা দেশের মোট আয়তনের ১০.৬ ভাগ। জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণাধীন ৭৩ মিলিয়ন হেক্টর ইউএসএফ ল্যান্ড এবং অবশিষ্ট ২৭ মিলিয়ন হেক্টর গ্রামীণ বনাঞ্চল হিসেবে পরিগণিত। ইকোপার্ক এসব বনাঞ্চলের একটি।

ইকোপার্ক কি? বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত ইকোপার্কসমূহ সম্পর্কে লিখ

ইকোপার্ক:

ইকোপার্ক (Ecopark) হলো Ecological Pat এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশে জীববৈচিত্রোর উপর কোনো প্রকার প্রভাব বিস্তার না করে বিনোদন উদ্যান গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে বনাঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট এলাকাকে চিহ্নিত করে একটি নিবিড় ব্যবস্থাপনার আওতায় তাকে নিয়ে আসা হয়। এখানে জীববৈচিত্র্য রক্ষার উপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। জীববৈচিত্র্য রক্ষ্য করীর জন্য উদ্ভিদের বৈরিতা রপ বলা হয় Flora এবং প্রাণিবৈচিত্র্য রক্ষার অংশকে বলা হয় Fauna। এজন্য বলা হয় এখানে Flora Fauna এর সমন্বয় ঘটানো হয়। অর্থাৎ উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈচিত্র্য সংরক্ষণে সমন্বিতভাবে বায়ুসংস্থান গড়ে তোলার উপর জোর দেয়া হয়।

আন্তর্জাতিক Ecotourism Society ইকোপার্কের সংজ্ঞায়ন করতে বলেন, it is not a simple marginal activity to france protection of the environment, but it is a major of the national economy

বাংলাদেশের ইকোপার্কসমূহ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে বাংলাদেশের বন বিভাগ নিম্নোক্ত ৯টি ইকোপার্ক স্থাপন করেছে। দেশের অভ্যন্তরে এগুলো হলো-

১. সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক:

চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার ঐতিহাসিক চন্দ্রনাথ রিজার্ভফরেস্টের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত চিরসবুজ বনাঞ্চলে ১৯৯৯ সালে ৮০৬ হেক্টর জায়গা নিয়ে ইকোপার্কটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ইকোপার্ক। পার্কের প্রধান গৈট হতে ৫ কি মি. ভিতরে চন্দ্রনাথ শিবমন্দির অবস্থিত। মন্দিরের ভিতর থেকে ২৫২টি সিঁড়ি এবং পাহাড়ের পাদদেশে ১৬০০টি সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরে উঠতে হয়। ফাল্গুনে শিবসংক্রান্তিতে দেশ বিদেশের বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীদের কীর্তনে মুখর হয়ে পড়ে পুরো অরণ্য। পাহাড়ের উচ্চতা ৪১০ মি. সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সব ঝরনা এক হয়ে তৈরি হয়েছে সহস্রধারা ও সুপ্তধারার মতো প্রবহমান প্রাকৃতিক ঝরনা। পার্কের অভ্যন্তরে প্রায় ১৫৪ রকম চিরসবুজ উদ্ভিদ রয়েছে। এছাড়াও আছে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর সমাহার।

২. বাঁশখালী ইকোপার্ক:

চট্টগ্রাম শহর হতে ৫০ কি.মি দক্ষিণ-পশ্চিমে বাঁশখালী উপজেলার বামেরছড়া ও ভানেরছড়া এলাকার সমন্বয়ে ২০০৩ সালে ১০০০ হেক্টর বনভূমি নিয়ে বাঁশখালী ইকোপার্ক গঠিত হয়। এটি জলদি অভয়ারণ্যের রেঞ্জের জলদি ব্লকে অবস্থিত। ছোট ছোট পাহাড় ও টিলা নিয়ে গঠিত বামেরছড়া ও ভানেরছড়া বাঁধ তৈরির ফলে উক্ত এলাকায় অপরূপ কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়। এক সময় এই এলাকা প্রাকৃতিক বন ও জীবজন্ততে পরিপূর্ণ ছিল। বর্তমানে কালের বিবর্তনে তার আনকটিই মলিন হয়ে গেলেও পরবর্তীতে বর্তমানে পার্ক এলাকায় ৬৭৪ হেক্টর বনভূমিতে বাফার, ভেষজ বিভিন্ন মনোমুগ্ধকর বাগান করা হয়েছে।

৩. মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক:

পাথরিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্টের পশ্চিম পাদদেশে অবস্থিত জলপ্রপাতকে ঘিরে ২০০১ সালে ৫০০ একর জায়গাজুড়ে মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক তৈরি হয়েছে। মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে ৭০ কি.মি, উত্তরে এবং বড়লেখা উপজেলা কাঁঠালতলী বাজার থেকে ৮ কি.মি. পূর্বে অবস্থিত। পার্কের পাশ দিয়ে মাধবছড়া নামে একটি ঝরনা প্রবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশের বৃহত্তম পাহাড়ি ঝরনা মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত ও পরীবৃত্ত এখানেই অবস্থিত। এছাড়া আশেপাশে অনেক টিলা অবস্থিত। পার্কে নানারকম প্রাকৃতিক উদ্ভিদ ও বৃক্ষ রয়েছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য পরবর্তীতেও বিভিন্ন বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। এখানে বিচিত্র রকমের পাখি ও বন্যপ্রাণীও দেখতে পাওয়া যায়।

৪. মধুটিলা ইকোপার্ক:

শেরপুর জেলার নলিতাবাড়ি উপজেলার মধুটিলা রেঞ্জের সমশচূড়া ও পোড়াগাঁও মৌজার ৩৮০ একর জায়গা জুড়ে ১৯৯৯ সালে মধুটিলা ইকোপার্ক স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ-ভারত সীমানাসংলগ্ন গারো পাহাড়ের পাদদেশে দিগন্তজোড়া সবুজ বনরাজি বেষ্টিত এবং পাহাড়, ঝরনা, টিলা ও লেক সুশোভিত ইকোপার্কটি পর্যটকদের জন্য আকর্যণীয় করে তোলা হয়েছে। এখানে নানা ধরনের জানা-অজানা গাছের সাথে সাথে রয়েছে নানা ধরনের পশু ও প্রাণিবৈচিত্র্য।

৫. বঙ্গবন্ধু যমুনা ইকোপার্ক:

পরিবেশ ও প্রতিবেশগত উন্নয়ন এবং বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতুর গাইড বাঁধ এলাকা সংরক্ষণের নিমিত্তে ২০০৭ সালে ১২৪ একর জায়গা নিয়ে সেতুর পশ্চিমপাড়ে বঙ্গবন্ধু যমুনা ইকোপার্ক স্থাপন করা হয়। ১৯৯৮ সালে সেতু নির্মান কাজ শেষ হবার পর পরই সেতুবিভাগ পারিপার্শ্বিক এলাকায় বনায়ন শুরু করে। সামাজিক বনায়ন এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধিকারক, শোভাবৃদ্ধিকারী গাছ ও ফুলের চারা রোপণের মাধ্যমে এখানে বনায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

৬. কুয়াকাটা ইকোপার্ক:

পটুয়াখালী জেলার কলাপাড় উপজেলায় গঙ্গামতি লতাচাপলী, খাজুরা এবং বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলার টেংরাগিরি মৌজায় ১৩৯৮৪ একর জায়গা নিয়ে ২০০৫ সালে কুয়াকাটা ইকোপার্ক নির্মিত হয়। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, বঙ্গোপসাগর, রামনাবাদ নদী, আন্ধারমানিক নদী, পায়রা ও বিষখালী নদীর মোহনার সন্নিকটে এই ইকোপার্ক অবস্থিত। এখানে আগেই অনেক ধরনের বৃক্ষ ছিল। পরে আরও অনেক ধরনের বৃক্ষ রোপণ করে ইকোপার্ককে আরও সমৃদ্ধ করা হয়েছে।

৭. টিলাগড় ইকোপার্ক

সিলেট জেলার সদর থেকে পূর্ব দিকে ৮ কি.মি. দূরে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ সংলগ্ন টিলাগড় রিজার্ভ ফরেস্টের ১১২ একর জায়গা নিয়ে ২০০৬ সালে টিলাগড় ইকোপার্ক স্থাপন করা হয়েছে। ইকোপার্কের মধ্য দিয়ে একটি ছড়া প্রবাহিত হয়েছে। এছাড়াও টিলাগড় বিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে ছোট বড় কয়েকটি টিলা নিয়ে পার্কটি অবস্থিত। এখানে অনেক ধরনের প্রাণী ও বৈচিত্র্যময় বৃক্ষরাজি দেখা যায়।

৮. জাফলং গ্রিনপার্ক:

সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার চৈলাখেল সংরক্ষিত বনভূমিতে জ্যাফলং গ্রিনপার্ক অবস্থিত। এই পার্কটি ৫৩৭ একর জায়গা নিয়ে ২০০৮ সালে স্থাপিত হয়। গভীর সবুজ বন বনানী এবং সিলেট তামাবিল সড়কের দুই পাশের নয়নাভিরাম বাগান, ডাউকি নদীর স্বচ্ছ জলে বহমান পাহাড়ি ঝরনা-সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার জাফলং।

৯. বড়শীজোড়া ইকোপার্ক:

মৌলভীবাজার শহরের ১ কিমি দক্ষিন-পশ্চিমে ৮৮৭ একর সংরক্ষিত বনভূমির সমন্বয়ে ২০০৬ সালে বড়শীজোড়া ইকোপার্ক গঠিত হয়। এই বনভূমি ১৯১৬ সালে সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষিত হয়। এই ধনভূমিতে রয়েছে অনেক রকম গাছ এবং অনেক প্রাণিবৈচিত্র্য।

১০. রাজেশপুর ইকোপার্ক:

ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাত্র ২.২ কিলোমিটারের মধ্যে এই রাজেশপুর ইকোপার্ক অবস্থিত। এটা কুমিল্লা জেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কি.মি. দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত কুমিল্লা সদর জোড় কানন উপজেলায় অবস্থিত এই বনভূমি। এই ইকোপার্ক ত্রিপুরা রাজ্যের গহীন অরণ্যের সাথে সংযুক্ত। তাই মাঝে মাঝে বাঘ, সিংহ, হরিণের মতো পশুদের দেখা মেলে এই ইকোপার্কে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ইকোপার্ক শুধু বন ব্যবস্থাপনার অংশ নয়। বরং দেশ-বিদেশি ভ্রমণ ও প্রকৃতিপ্রেমী লোকজনের বিনোদনের পাশাপাশি ঐ বিশেষ প্রতিবেশ বেড়ে ওঠা উদ্ভিদ ও প্রাণী সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। সেই সাথে জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জনমনে সচেতনা সৃষ্টি হয়।

No comments:

Post a Comment