বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাব আলোচনা
ভূমিকা: বিশ্বায়ন বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া, যা বিভিন্ন দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করে। এর ফলে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ব্যবসা-বাণিজ্য, তথ্য, প্রযুক্তি, এবং মানুষের যোগাযোগ সহজ হয়েছে। তবে, বিশ্বায়নের প্রভাব শুধু ইতিবাচক নয়, এটি বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাবও তৈরি করেছে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য। বাংলাদেশ, যা একদিকে দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে, আবার অন্যদিকে কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। বিশ্বায়নের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং সংস্কৃতিতে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন হলেও, তার নেতিবাচক দিকও লক্ষ্যণীয়। এই প্রবন্ধে আমরা বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবগুলো বিশ্লেষণ করবো।
বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবসমূহ
বিশ্বায়নের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শুধু ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায় না কিছু ইতিবাচক প্রবাব ও লক্ষ্য করা যায়। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো-
১। দেশি শিল্প ধ্বংস
বিশ্বায়নের ফলে অবাধে বিদেশি তথা চীন, ভারত, মালেশিয়া, পাকিস্থানসহ বিভিন্ন প্রকার পণ্য প্রবেশ করেছে ফলে দেশীয় শিল্প বাজার হারিয়ে রুগ্ন শিল্পে পরিণত হচ্ছে।
২। সংস্কৃতির অগ্রাসন
বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বজুড়ে পশ্চিমা সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে মার্কিনীকরণ ঘটেছে তার দুটি বিশেষ লক্ষনীয় দিক হচ্ছে (ক) নিশংস সাংস্কৃতিক বিকাশ যা খুন বৃদ্ধি করে। (খ) যৌনতার বিষয় যা চলচিত্রে ও টেলিভিশনের প্রধান বিষয় বস্তু হয়ে দাড়িয়েছে। িএমন অবস্থায় দেশীয় সংস্কৃতি রক্ষা করা খুবই কঠিন।
৩। নারীর অবমাননা
বিশ্বায়নের ফলে নারীর কিছু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলেও ইহা নারীদের অবমাননা ঘটিয়েছে দারুণভাবে। নারী এখন পরিপূর্ণ পণ্য। উন্নয়নশীল ও অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশের নারীরাও আন্তর্জাতিক নারী পাচারকারী চক্রের শিকার হচ্ছে। মানবাধীকার সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে গড়ে প্রতিমাসে ২৫০-৪৫০ নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে।
৪। আয় বৈষম্য বৃদ্ধি
বিশ্বায়নের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ধনী দারিদ্রের আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধি। বিশ্বায়নের ফলে যে সুবিধা বাংলাদেশে তা কেবল ধনীরাই ভোগ করছে। ফলে ধনী দরিদ্রের আয় ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
৫। বিলাস দ্রব্যের উপস্থিতি
বিলাস দ্রব্য উৎপাদন ও বিপণনে মুনাফা বেশি।তাই বিশ্বায়নের প্রভাবে আজ বাংলাদেশের বাজারে আজ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের তুলনায় বিলাস দ্রব্যর উপস্থিতি বেশি। কারণ বেশি মুনাফার আশায় শিল্পপতিরা আজ বাজারে বেশি বেশি বিলাস দ্রব্যর যোগান দিচ্ছে।
৬. প্রাকৃতিক সম্পদের শোষণ
বিশ্বায়নের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশে প্রাকৃতিক সম্পদ অতিরিক্তভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন, বনাঞ্চল, খনিজ এবং জলসম্পদের অপব্যবহার করা হচ্ছে। বিদেশি কোম্পানিগুলোর ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ অতিরিক্তভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে।
৭. সামাজিক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা
বিশ্বায়ন দেশের সংস্কৃতিতে বিভিন্ন সামাজিক পরিবর্তন আনছে, যার ফলে অনেক সময় সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। মানুষের চাহিদা, জীবনযাত্রার মান এবং সামাজিক মূল্যবোধের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দলীয় কোন্দল সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে যখন রাজনৈতিক নেতারা এই পরিবর্তনগুলোর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না।
৮. স্বদেশী উৎপাদন ও কৃষির অবনতি
বিশ্বায়নের কারণে বাংলাদেশের কৃষি ও স্থানীয় উৎপাদন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিদেশি পণ্যদের কারণে অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় কৃষকরা তাঁদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায় না। বিদেশি ধান, চাল ও অন্যান্য পণ্য অধিক সস্তায় চলে আসায় স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, যা কৃষি খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
৯. শ্রমিক শোষণ
বিশ্বায়ন শিল্প খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেও অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা অত্যন্ত কম মজুরিতে কাজ করছেন। গার্মেন্টস শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের শ্রমিকরা কম পারিশ্রমিক ও খারাপ পরিবেশে কাজ করছেন। বিশ্বায়ন এই ধরনের শ্রমিক শোষণের প্রবণতা বাড়িয়েছে, বিশেষ করে যখন শ্রমিক অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তা বিধান সঠিকভাবে প্রয়োগ হয় না।
১০. আন্তর্জাতিক ঋণের চাপ বৃদ্ধি
বিশ্বায়নের ফলে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও বিদেশি ঋণ বাংলাদেশকে উন্নয়নমূলক প্রকল্পে সহায়তা দিচ্ছে, তবে এতে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
১১. বৈদেশিক মুদ্রার সংকট
বিশ্বায়ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকুচিত হতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার জন্য দেশ নির্ভরশীল হয়ে পড়লে মুদ্রাস্ফীতি ও বিনিময় হার বৃদ্ধি পেতে পারে।
১২. নির্ভরশীল অর্থনীতি
বিশ্বায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। এর ফলে দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক নীতি ও স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
১৩. স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্য
বিশ্বায়ন স্বাস্থ্য খাতে কিছু উন্নতি সাধন করলেও, এর সুফল শহরাঞ্চলের মধ্যবিত্ত ও ধনীদের কাছে সীমাবদ্ধ থাকে। গ্রামীণ ও দরিদ্র জনগণের জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা সুষমভাবে পৌঁছাচ্ছে না, যার ফলে সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১৪. পানি সংকট
বিশ্বায়ন এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে অতিরিক্ত পানির ব্যবহার বাড়ানোর ফলে বাংলাদেশে পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। বিশেষত শিল্প কারখানাগুলোর জন্য পানি বেশি ব্যবহার হচ্ছে, যার ফলে দেশের কিছু অংশে পানির অভাব দেখা দিয়েছে।
১৫. পরিবেশ দূষণ বৃদ্ধি
বিশ্বায়নের ফলে বিদেশি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে, যা পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনে অবদান রাখছে। দেশের জলবায়ু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
১৬. শ্রম বাজারের আধুনিকীকরণ এবং অপচয়
বিশ্বায়ন শ্রমবাজারের আধুনিকীকরণ ঘটালেও অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। বিদেশি প্রযুক্তির আগমন শ্রমবাজারে অপচয় এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি করেছে।
১৭. শিল্প খাতের অবনতি
বিশ্বায়ন শিল্প খাতে কিছু সুবিধা আনলেও, দেশীয় শিল্প খাতের আধুনিকীকরণ এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি না হওয়ার কারণে কিছু শিল্প খাতে আধুনিকতা না আসার কারণে প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।
১৮. সামাজিক অবক্ষয়
বিশ্বায়ন মানুষের ভোগবাদী মনোভাব তৈরি করছে, যার ফলে সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। মানুষের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নৈতিকতা কমে যাচ্ছে, যা সমাজের মেধা ও মননকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
১৯. প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতিকার ব্যবস্থা দুর্বল
বিশ্বায়নের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বেড়েছে, কিন্তু অনেক সময় দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, যা সংকটের সময় জনগণের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
২০. আর্থিক সংকটের ঝুঁকি
বিশ্বায়নের প্রভাবে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থা বৈদেশিক মুদ্রার বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যার ফলে অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ছে।কারণ, আন্তর্জাতিক ঋণ এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ বাংলাদেশকে দুর্বল করে তুলছে। ঋণের শর্তগুলি অনেক সময় রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে জনগণের দুর্দশা বাড়িয়ে দেয়।
উপসংহার: সর্বশেষ বলা যায় যে, বিশ্বায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং সমাজে বেশ কিছু ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও এর নেতিবাচক দিকও কম নয়। বিশ্বায়নের প্রভাব বাংলাদেশে সবদিক থেকেই গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। এর ইতিবাচক দিক যেমন উন্নত প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এই সব দেশের অর্থনীতিকে একটি নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছাতে সহায়তা করছে। অপরদিকে, নেতিবাচক দিক, যেমন দেশীয় শিল্পের অবনতি, শ্রমিক শোষণ, পরিবেশ দূষণ এবং সামাজিক অবক্ষয়, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে, বিশ্বায়নের সুফলগুলো গ্রহণ করা এবং এর নেতিবাচক প্রভাবগুলোর নিয়ন্ত্রণে কৌশল গ্রহণ করা। সরকারের পাশাপাশি জনগণ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও এর প্রভাব মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

No comments:
Post a Comment