জাতীয়তাবাদ কী? এথনিক গ্রুপের সাথে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক আলোচনা কর
ভূমিকা: স্বায়ত্তশাসিত রাজনৈতিক মর্যাদা ছিল কিংবা উদ্ধার করতে চায় তাদেরকে বলা হয় জাতীয়তা। আর জাতীয়তা যাদের মধ্যে বিরাজ করে তখন একটি আদর্শ বিরাজ করে আর এই আদর্শই মূলত জাতীয়তাবাদ।
জাতীয়তাবাদ: জাতীয়তাবাদ হচ্ছে একটি আধুনিক ধারণা। এটি একটি আদর্শ (ideology) বা একাত্মবোধের নাম। আধুনিক বিশ্বের প্রায় সকল জাতিরাষ্ট্র জাতীয়তাবাদী চেতনা দ্বারা পরিচিত যয়ে থাকে। একটি রাষ্ট্রে এমন কিছু সাধারণ কৃষ্টি, সংস্কৃতি বা অনুসরণীয় বিষয় থাকে যাকে আশ্রয় করে রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ, দেশপ্রেম ইত্যাদি সুদৃঢ় হয়।
Prof. Zimmern-এর মতে, "কোনো নির্দিষ্ট আবাস ভূমির সাথে সংশ্লিষ্ট সংঘবদ্ধভাবে বিশেষ অজরই গুরুত্বপূর্ণ এক মর্যাদাযুক্ত অনুভূতির প্রকাশই হলো জাতীয়তাবাদ।"
হ্যাশ কোন-এর মতে, জাতীয়তা হলো প্রথম এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের এক মানসিক অবস্থা ও এক ধরনের সচেতনতা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হায়েস এর মতে, 'একটি জাতীয় জনসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সার্বভৌম স্বাধীনতা অর্জন করে জাতীয়তা সৃষ্টি করে। এটা চিরকাল স্থায়ী থাকে না। সময়ের বিষর্তনের হারিয়ে যায়।।
বর্তমানে মানুষ রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণভা আইনগত অধিকার ইত্যাদি লাভের লক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বা ভূখণ্ডে সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই যে তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করে তা দ্বারা জাতীয়তা পুরোপুরি সার্থকতা অর্জন করে। আর এই জাতীয়তায় আদর্শ হলো জাতীয়তাবাদ।
এথনিক গ্রুপের সাথে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক
ভূমিকা: আমরা বিভিন্ন দেশে এথনিক কিংবা উপজাতিদের বসবাস দেখতে পাই। এথনিক গ্রুপ হচ্ছে এমন কিছু জনসংখ্যার সমষ্টি, যার সদস্যরা একে অপরের সাথে অভিন্ন কোনো সৃষ্টি ঐতিহ্যের কারণে পরিচিত।
এথনিক গ্রুপের সাথে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা নানা জাতিগোষ্ঠী ও এথনিক বা নৃগোষ্ঠীর উপস্থিতি দেখতে পাই। এথনিক গ্রুপ বলতে বোঝায় এমন একটি জনসংখ্যার সমষ্টিকে, যারা অভিন্ন ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম কিংবা বংশগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নিজেদের আলাদা পরিচয়ে চিহ্নিত করে। তারা সাধারণত একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুসরণ করে, যা তাদের একত্রিত করে।
একসময় "জাতি" শব্দটি মূলত গোষ্ঠী, গোত্র বা এথনিক গ্রুপ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। তবে আধুনিক কালে জাতির ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে। এখন জাতি বলতে বোঝানো হয় এমন একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক একককে, যার রয়েছে নিজস্ব ভূখণ্ড, কেন্দ্রীয় সরকার এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রীয় কাঠামো। বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্র এবং জাতি প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। যখন একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সত্তা একীভূত হয়, তখনই তা একটি জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হয়। যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স বা জাপান।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, অধিকাংশ রাষ্ট্রে একটি একক এথনিক গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য নেই। যুদ্ধ, উপনিবেশবাদ ও অভিবাসনের ফলে অধিকাংশ দেশেই বহু জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। ১৯৭২ সালে কনর (Connor) দেখিয়েছেন, ১৩২টি জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ১২টিতে (প্রায় ৯%) সাংগঠনিক নৃগোষ্ঠীগত ঐক্য ছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে নেলসন (Nelsson) গবেষণা করে দেখান, ১৬৪টি রাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ৪৫টি রাষ্ট্রে একটি একক এথনিক গোষ্ঠী ৯৫% জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে।
এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে জনগণকে একত্রিত করা সম্ভব। অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভিত্তি হতে পারে বংশগত পরিচয়, ইতিহাস, ভাষা, ধর্ম, আত্মীয়তার বন্ধন কিংবা শারীরিক বৈশিষ্ট্য। এথনিক গোষ্ঠীগুলোকে উন্নয়ন ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় মূলধারায় সম্পৃক্ত করলে একটি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী জাতি গঠন করা সম্ভব।
উপসংহার: পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূলভিত্তি হতে পারে পূর্বপুরুষ পরিচয়ভিত্তিক বংশগত পরিচয়, ইতিহাস, আত্মীয়তার বন্ধন, ধর্ম, ভাষা, অভিন্ন সীমানা, জাতীয়তা অথবা অভিন্ন কোনো শারীরিক গঠন। আতীয় বৈশিষ্ট। উন্নত ও সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে এথনিক গোষ্ঠীগুলোকে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করা সম্ভব।

No comments:
Post a Comment