বাংলাদেশে এথনিক গোষ্ঠীর উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা কর।

বাংলাদেশে এথনিক গোষ্ঠীর উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা কর।

অথবা, এথনিক গোষ্ঠীর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।

অথবা, আদিবাসী সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ পর্যালোচনা কর।

ভূমিকা: বাংলাদেশে নানারকম উপজাতি বা আদিবাসী সম্প্রদায় বসবাস করে। আর এসব উপজাতি সম্প্রদায়ের এদেশে আবির্ভাব ঘটেছে একেক সময়ে। এরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের দেশে আগমন করেছে। এদেশে ৩০ টির মতো উপজাতি বসবাস করছে।

বাংলাদেশে এথনিক গোষ্ঠীর উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা কর।

বাংলাদেশে এথনিক গোষ্ঠীর উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ 

নিম্নে বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উদ্ভব সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১. চাকমা: বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে চাকমা উপজাতিরা বসবাস করে। এদের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ২০,০০০ হাজার। চাকমা সম্প্রদায়ের উৎপত্তি সম্পর্কে কর্নেল ফায়ার ভাঁর History of Barma গ্রন্থে বলেন, চাকমারা ব্রহ্মদেশ থেকে ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে আগমন করেছে। নৃবিজ্ঞানী স্যার রিজলি এ ব্যাপারে বলেছেন, ব্রহ্ম ভাষায় 'সার্ক' বা 'সেক' জাতি থেতে চাকমাদের উদ্ভব। আরাকানের প্রাচীন রাজধানী রামাবতী শহরের নিকটবর্তী এলাকায় 'সার্ক' বা 'সেফ' জাতি এক সময় খুব শক্তিশালী ছিল। মগদের মতে, চাকমারা মুঘল বংশধর। চাকমাদের উৎপত্তি সম্পর্কে তারা বলেন, তারা শাক্য বংশোদ্ভূত মধ্যমুদি বুদ্ধের বংশধর।

২. মণিপুরি: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সিলেট এবং মৌলভীবাজার অঞ্চলে মণিপুরি উপজাতিরা বসবাস করে। এদের সংখ্যা প্রায় ৪০,০০০। এদের আদিনিবাস ভারতের পূর্বাঞ্চল মণিপুরে। ব্রহ্মবাসীদের চাপে পড়ে উনবিংশ শতাব্দীর ক্যোনা এক সময়ে মণিপুরি এক রাজপুত্র সিলেট পালিয়ে আসে এবং ঐ রাজপুত্রই মণিপুরিদের পূর্বপুরুষ হিসেনে বিবেচিত।

৩. মগ: আরাকানে মাগদের আদিনিবাস। এরা বাংলাদেশের বান্দরবান জেলায় বসবাস করে। প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, এরা বর্মীদের দ্বারা আক্রান্ত হলে আরাকান থেকে পালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করে।

৪. খাসিয়া: বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে খাসিয়ারা বসবাস করে। নৃবিজ্ঞানী বেভারেজ এইচ রবার্টন ও মি. স্যাড ওয়েল-এর মতে, খাসিয়াদের আদিনিবাস ব্রহ্মদেশ এবং পরবর্তীতে তারা আসামে এসে বসতি স্থাপন করে। অন্যদিকে, নৃবিজ্ঞানী ড. গিয়ারসন খাসিয়াদের ভাষা বিশ্লেষণ করে জানতে পারেন যে, তারা চীনের পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন।

৫. রাখাইন: প্রায় দুইশত বছর পূর্বে রাখাইনরা আরাকান থেকে এসে এদেশে বসবাস শুরু করে। ঐতিহাসিক পক্ষোপটে জানা যায় যে, অষ্টাদশ শতকের শেষার্থে পটুয়াখালী অঞ্চলে এবা বসতি স্থাপন করে। বর্তমানে চট্টগ্রাম, রামু, টেকনাফ ও পটুয়াখালীতে রাখাইন উপজাতি বসবাস করে।

৬. সাঁওতাল: সাঁওতাল হাচ্ছে ভারত মহাদেশের প্রাচীনতম আদিবাসী। সাঁওতালদের উৎপত্তি সম্পর্কে উইলিয়াম হান্টার বলেছেন, সাঁওতালরা পূর্বদিক থেকে বাংলাদেশে এসেছে এবং পরে পশ্চিমদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

৭. হাজং: বাংলাদেশের ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ের সমতল এলাকা ও সুনামগঞ্জে হাজংরা বসবাস করে। এয়া ভারতের মেঘালয়সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপন করেছে।

৮. মুরং: বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামেরই আদিবাসী হিসেবে মুররো দাবি করে। অন্যদের মতে, কুকিল্লীম জামা চট্টগ্রামে চালু হওয়ার আগেই মুরংরা এ অঞ্চলে বাস করতো।

৯. গারো: বাংলাদেশের ময়াজনসিংহ জেলায় গারোরা বসবাস করে। নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন গারোরা এ অঞ্চলের নায়। স্যার বিজলির মতে, গায়োদের আধিনিবাস ছিল আসাম প্রদেশে। অন্যদের মতে, দুর্ভিক্ষের কারণে চীন দেশ থেকে ভারতে আসায় এদেশে যেখানে গারো পাহাড় অবস্থিত, সেখানে এরা এসে বসবাস শুরু করে। ১০. রাজবংশী: রাজবংশীরা নিজেদের রাজবংশী হলে পরিচয় দেয়। এয়া বর্তমানে ডাদের সংস্কৃতি ও ভাষা হারিয়ে মুসলমান ও হিন্দুদের সাথে মিশে গেছে।

১১. বাম: আরাকানে বাম উপজাতিদের আদিনিবাস। পেশাগত দিক থেকে এরা সবাই যাবসায়ী।

১২. কুকি: বাংলাদেশের বান্দরবান জেলায় কুকিরা বসবাস করে। কুকিদের আদিনিবাস রাঙামাটি জেলায়।

১৩. তঞ্চ্যঙ্গা: তঞ্চ্যঙ্গা হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের আরেক উপজাতির নাম। এরা সংখ্যায় প্রায় ১২,০০০ জন। ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে এরা চাকমার উপজাতিদের একটি শাখা। এরা নিজেদের ভাষাকে আজও জীবিত রাখতে পেরেছে।

১৪. কুমি: এদেশে আরাকানের কুমি উপজাতিরা আগমন করেছে। এরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে।।

১৫. মিজো: ভারতের মিজোরাম ও ব্রহ্মদ্যেশ মিজো আদিবাসীদের আদিনিবাস। এরা অতীতে এক সময় কর্ণফুলী নদীর তীরে রাজত্ব করতো।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উপজাতিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন সময় বংলাদেশে এসেছে এবং বসবাস করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের লোকসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো এথনিক গোষ্ঠী।

No comments:

Post a Comment