এথনিক অভিযোজন কী? নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক প্রকৃতি আলোচনা কর

এথনিক অভিযোজন সংজ্ঞা। নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক

ভূমিকা:- এথনিক গ্রুপ হচ্ছে এমন একটি সামাজিক গোষ্ঠী যাদের নিজস্ব একটি বিশেষ ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে, যা অন্যদের থেকে ভিন্ন। এরা কোনো রাষ্ট্রীয় পরিসীমায় নিজস্ব গোত্রীয় স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা নিয়ে বসবাস করে। সংখ্যাগরিষ্ঠদের সাথে তাদের যে সামাজিক দূরূত্ব রয়েছে তা কমানোর জন্য অভিযোজন প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়।

এথনিক অভিযোজন কী? নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক

এথনিক অভিযোজন:

সমগ্র বিশ্বে নৃগোষ্ঠীগত, ধর্মীয়, ভাষা ও সংস্কৃতিগত কারণে মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্য দেখা যায়। আর এ বৈচিত্র্যই সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠের সৃষ্টি করে। সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ, মতাদর্শপূর্ণ বিয়োগ থাকলেও তাদের মধ্যে ইতিবাচক মিথস্ক্রিয়ার পথ সুগম করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। শুধু তাই নয়, একটি শান্তিপূর্ণ ঐক্য বন্ধুত্বপূর্ণ সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ সৃষ্টি করতে সর্বদা চেষ্টা করছে। সংখ্যালঘুদের এই নিরন্তর প্রচেষ্টা অভিযোজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অব্যাহত থাকে। নিম্নে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অভিযোজন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হলো।

১. ভাষাগত সমন্বয় সাধন:

প্রতিটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। তারা নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে কথোপকথনকালে তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করলেও বাংলাদেশের অন্যান্য মানুষ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সাথে কথা বলার সময় বাংলা ভাষা ব্যবহার করে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করে অভিযোজন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।

২. সামাজিক ঐক্য সাধন:

সংখ্যালঘু গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক সমন্বয় সাধনের জন্য নিজেদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রচলিত সংস্কৃতিকে সাদরে গ্রহণ করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে স্বকীয় অংশগ্রহণ করে।

৩. চেতনা সৃষ্টি:

সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সাধারণ জনগণের সাথে একত্রে পাশাপাশি বসবাস, চলাফেরা করার ফলে খুব সহজেই একে অন্যকে জানতে পারে। একে অন্যের সাথে নানাভাবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ফলে অভিযোজন প্রক্রিয়া দ্রুত বাড়ছে।

৪. ধর্মীয় অবস্থান:

প্রতিটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্ম রয়েছে, যা তারা অতি আগ্রহ, নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যে পালন করে থাকে। অভিযোজন প্রক্রিয়ার ফলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের পাশাপাশি তারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে থাকে।

৫. শিক্ষা:

সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দিন দিন আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে তাদের অভিযোজন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। শিক্ষা অর্জনের ফলে চরম ও বিশৃঙ্খল পরিবেশে অভিযোজন প্রক্রিয়ায় নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।

৬. রাজনৈতিক অবস্থান:

অভিযোজনের ফলে সংখ্যালঘুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন সাধিত হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। বর্তমানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক ধারায় স্বকীয় অংশগ্রহণ করে থাকে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি জাতিরাষ্ট্রের অংশ হয়েই এথনিক গোষ্ঠী বেঁচে থাকে। মূলধারার গোষ্ঠীর কাছ থেকে তারা সবসময় অসম অবস্থার স্বীকার হয়। তবুও তাদের কোনো অভিযোগ নেই। তারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।

নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের প্রকৃতি

নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক প্রকৃতি: দু' একটি কথায় নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্য সম্পর্কের প্রকৃতি ও ধরন বর্ণনা করা খুবই কঠিন। এ সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১. সংখ্যালঘুদের জন্য আইনি প্রতিরক্ষা প্রদান:

সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের মনোভাব নিষেধমূলক ও শত্রুতামূলক। এসব সমাজে সংখ্যালঘুরা নানারূপ বঞ্চনা, এমনকি দৈহিক নির্যাতনেরও শিকার হয়।

২. আত্তীকরণ:

একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কার্যপ্রক্রিয়া হলো আত্তীকরণ। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্য কোনো বাক্তি বা গোষ্ঠীর মনোভাব, মূল্যবোধ, আচার আচরণ প্রভৃতি গ্রহণ করার মাধ্যমে তাদের জীবনধারার অংশীদার হয়ে পড়ে বা একই সাংস্কৃতিক জীবনের শরিক হয়ে যায়।

৩. সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ:

সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সকল গোষ্ঠীর মানুষ সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন বা সংস্কৃতির সহাবস্থানাকে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ বলে। যে সমাজে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের নীতি অনুসৃত হয়, সেখানে প্রভাবশালী গোষ্ঠী সংখ্যালঘুদের নিজস্ব সংস্কৃতি অক্ষুণ্ন রাখার ক্ষেত্রে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে থাকে।

৪. নির্মূলকরণ:

সংখ্যাগুরু প্রভাবশালী ধরনের জনগোষ্ঠী কর্তৃক সংখ্যালঘু দুর্বল জনগোষ্ঠীকে গণহত্যার মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন বা নির্মূল করার প্রক্রিয়াকে বোঝায়।

৫. অবিরাম পরাভূতকরণ:

এ প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘুদের ন্যায্য দাবিদাওয়া, অধিকার এমনকি মানবিক আবেদন পর্যন্ত প্রত্যাখ্যাত হয় এবং তাদের উপরে চিরকালব্যাপী শাসন-শোষণ নির্যাতিত করে রাখার উদ্দেশ্যে নানা ধরনের নেতিবাচক পন্থা পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ করা হয়।

৬. বিতাড়িতকরণ বা নির্বাসনে পাঠানো:

প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সাথে বা সংখ্যালঘু কোনো গোষ্ঠীর সম্পর্কে মারাত্মক অবনতি ঘটলে বা শত্রুতা সৃষ্টি হলে কিংবা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে প্রভাবশালী জনগোষ্ঠীর জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করলে একমাত্র সমাধান হিসেবে সংখ্যালঘুদের একাধিক স্থানে অথবা দেশের বাইরে জোরপূর্বক নির্বাসিত করা হয়।

উপরিউক্ত বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে বলা যায় যে, প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও বিভিন্ন ধরনের সংখ্যালঘু, যা এথনিক অপ্রভাবশালী গোষ্ঠীর মধ্যকার সম্পর্কের একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন