সামাজিক গতিশীলতার সংজ্ঞা? বাংলাদেশের সামাজিক গতিশীলতার প্রকৃতি ও স্বরূপ আলোচনা
ভূমিকা:- মানুষ সামাজিক জীব এবং সমাজে বসবাস করাই মানুষের সহজাত ধর্ম। সমাজ ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব যেমন কল্পনা করা যায় না, তেমনি পরিবর্তন ছাড়া সমাজের অস্তিত্ব অসম্ভব। সমাজের এই বিবর্তন ও পরিবর্তনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো সামাজিক গতিশীলতা (Social Mobility)। প্রাচীনকাল থেকেই সামাজিক স্তরবিন্যাসের মধ্যে মানুষের এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে গমনের এই প্রক্রিয়া চিরন্তন গতিতে চলে আসছে। সমাজ মানুষের আশ্রয়ের প্রধান স্থল, যেখানে সামাজিক রীতিনীতি বজায় রেখে মানুষ তার লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট থাকে। ফলে সমাজের প্রতিটি স্তরেই নাগরিকদের মাঝে পদমর্যাদা ও জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আজকের পোস্টে আমরা সামাজিক গতিশীলতার সংজ্ঞা এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর প্রকৃতি ও স্বরূপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
সামাজিক গতিশীলতা (Social Mobility) সংজ্ঞা:
সামাজিক গতিশীলতার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Social Mobility আর Social Mobility means movemnet of status.সামাজিক গতিশীলতার মধ্যে দিয়ে প্রতিটি মানুষ তার সক্ষমতা অনুসারে Status পরিবর্তনের জন্য কাজ করে। আমাদের দেশে গ্রাম থেকে শহরে সকল জায়গায় মানুষ সামাজিক গতিশীলতার জন্য কাজ করছে। যা সামাজিক পরিবর্তনকে আরো গতিশীল করতে সাহায্য করছে। মূলত সামাজিক গতিশীলতা হলো মানুষের মর্যাদা পরিবর্তনের একটি পদ্ধতি যা সাজের সকল মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করে। সামাজিক গতিশীলতা হলো ব্যক্তির স্বার্থে, সমাজের মধ্যে ব্যক্তির মর্যাদা পরিবর্তনের একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া। কারণ, মানুষ একই পেশায় বা একই মর্যাদা নিয়ে বাস করতে চাই না তাই সে সামাজিক গতিশীলতা চায়।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা:
সমাজবিজ্ঞানী অর্গবান ও নিমকফ বলেন- 'সামাজিক গতিশীলতা হলো সামাজিক মর্যাদা পরিবর্তন যা ঊর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী হতে পারে।'
সমাজবিজ্ঞানী সরোকিন এর মতে-'সামাজিক গতিশীলতা এমন এক ধরনের পরিবর্তনশীলতা যা ব্যক্তি তার নিজের চেষ্টায় করে এবং তার পরিবর্তনের এই স্তরকে সামাজিক গতিশীলতা বলে।'
সমাজবিজ্ঞানী Authony Giddence বলেন 'সামাজিক গতিশীলতা হলো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিভিন্ন আর্থসামাজিক অবস্থানে স্থানান্তরিত হওয়া।'
মোটকথা বলা যায় সামাজিক গতিশীলতা এমন এক ধরনের পরিবর্তন যা সামাজিক মর্যাদার পরিবর্তনে সহায়তা করে। মানব সভ্যতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মানুষ সর্বদা তার মর্যাদা পরিবর্তনের কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের সামাজিক গতিশীলতার প্রকৃতি ও স্বরূপ
বাংলাদেশের সামাজিক গতিশীলতার প্রকৃতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় সবার মাঝেই সামাজিক মর্যাদা পরিবর্তনের একটা প্রবণতা রয়েছে। নিম্নে বাংলাদেশের সামাজিক গতিশীলতার প্রকৃতি আলোচনা করা হলো।
১। শিক্ষা:
শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। একটি দেশের সকল ধরনের পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ ইচ্ছামতো তার মর্যাদা পরিবর্তন করতে পারে। যেমন শিক্ষা গ্রহণ করে একজন কৃষকের সন্তান সচিব হয় এবং অন্যান্য কাজও করে। এখানেই দেখা যায় শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক গতিশীলতার প্রকৃতি ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
২। কৃষি:
আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষের পেশা হলো কৃষি। কারণ আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। গ্রামের মানুষ অশিক্ষিত হওয়ায় তারা কৃষিকে জীবিকার প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। তাই সামাজিক গতিশীলতার ক্ষেত্রে কৃষি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩। জনসংখ্যা:
একটি দেশের সকল ধরনের কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য জনসংখ্যা বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। জনসংখ্যা সবসময় পরিবর্তনের জন্য কাজ করে।
৪। ধর্ম:
ধর্মের মাধ্যমে মানুষের নানা পরিবর্তন হয়। ধর্ম হলো সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম নিয়ামক। সামাজিক গতিশীলতার জন্য ধর্মের গুরুত্ব অনেক কারণ, মানুষ ধর্মের কথা মেনে অনেক অন্যায় কাজ হতে নিজেকে বিরত রাখে। যা ব্যক্তির মর্যাদা প্রকাশে সাহায্য করে।
৫। রাজনীতি:
বর্তমান সমাজব্যবস্থায় রাজনীতি এক প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান। কারণ, রাজনীতিতে এসে অনেক মানুষ তাদের ব্যক্তিগত জীবন দর্শন পরিবর্তন করে থাকে। মানবসভ্যতায় বর্তমান অবস্থায় যেকোন ধরনের পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি অপরিহার্য। তাই রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমাদের দেশের সামাজিক পরিবর্তন হয়।
৬। সংস্কৃতি:
সংস্কৃতি হলো দেশের যাবতীয় দিকসমূহ। কারণ একটি দেশ কিভাবে চলে একটি সমাজ কিভাবে চলে তার উপলব্ধি করা হয় সে দেশের সংষ্কৃতির মাধ্যমে। কারণ সংস্কৃতি হলো মানুষের আচরণের সমষ্টি। তাই সংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সামাজিক গতিশীলতা বৃদ্ধি পায়।
৭। পরিবার:
যেকোন ধরনের কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য পরিবার সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। পরিবারের কাছ থেকেই মানুষ সর্বপ্রথম সকল ধরনের কার্যক্রম সম্পাদন করে। পরিবার হলো মানুষ গঠনের হাতিয়ার। পরিবারকে কেন্দ্র করেই সকল ধরনের কার্যক্রম সম্পাদিত হয়। তাই সামাজিক গতিশীলতায় পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম।
৮। অর্থনীতি:
যেকোনো দেশের পরিবর্তনে অর্থনীতি বেশ সুদূরপ্রসারী প্রসার ফেলতে পারে। কারণ অর্থনৈতিক সমস্যা হলো সকল সমস্যার মূল। তাই অর্থনীতি সামাজিক গতিশীলতাকে প্রভাবিত করে।
সর্বশেষ বলা যায়, সামাজিক গতিশীলতা হলো এমন এক ধরনের পরিবর্তন যা সমাজের পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। সামাজিক গতিশীলতা হলো মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন।
