উৎপাদনের একচেটিয়াকরণ কী? সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের মধ্যে পার্থক্য
ভূমিকা: লেনিন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Imperialism: The Highest Stage of Capitalism গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে যে ধারণা প্রদান করেছেন তা বিশ্লেষণ করলে সাম্রাজ্যবাদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উৎপাদনের একচেটিয়াকরণ সম্পর্কেও ধারণা লাভ করা যায়।
উৎপাদনের একচেটিয়াকরণ:
সাম্রাজ্যবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উৎপাদন ও পুঁজির কেন্দ্রীকরণ। আর এ থেকে উদ্ভব হয় একচেটিয়া কারবারের। মূলত শিল্পের বিস্তার এবং বৃহৎ উদ্যোগগুলোর অধীনে উৎপাদনের একচেটিয়াকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। উৎপাদনে আধুনিক গবেষণাগুলো সম্পূর্ণ ও সঠিক উপাত্ত পরিবেশন করে। ফলে উপনিবেশবাদী নীতির প্রভাবে অবাধ প্রতিযোগিতা থেকে জন্ম নেয় উৎপাদনের কেন্দ্রীভবন। আর তার বিকাশের একটি নির্দিষ্ট স্তরে এ কেন্দ্রীভবন পৌছায় একচেটিয়া হিসেবে। লেনিনের মতে, বিংশ শতকের প্রথম দিকেই জার্মানি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে উৎপাদনের কেন্দ্রীভবন ও একচেটিয়াত্বের উদ্ভব ঘটেছিল।
পরিশেষে বলা যায়, সাধারণত পুঁজিকে কেন্দ্র করেই একচেটিয়াকরণ ধারণার উদ্ভব হয়েছে। লেনিনের উপরিউক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা এ বিষয়ে যথাযথ ধারণা লাভ করতে পারি।
সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের মধ্যে পার্থক্য:
নিম্নে সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের মধ্যে পার্থক্যসমূহ তুলে ধরা হলো:
১. সংজ্ঞাগত পার্থক্য:
সাম্রাজ্যবাদ বলতে এমন এক রাষ্ট্রীয় নীতিকে বোঝায়, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে কোনো সাম্রাজ্য সৃষ্টি, সংগঠন এবং সংরক্ষণ করা। পক্ষান্তরে, উপনিবেশবাদ বলতে কোনো বিদেশি জনসাধারণের উপর দীর্ঘ সময় ধরে শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং তা বজায় রাখার প্রচেষ্টাকে বুঝায়।
২. উদ্দেশ্যগত পার্থক্য:
সাম্রাজ্যবাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে অপর রাজ্য জয় করে বা গ্রাস করে সেই অঞ্চলের মানুষকে নিজস্ব শাসনাধীনে এনে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করা। আর উপনিবেশবাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে কোনো অঞ্চলের মানুষের উপর সাম্রাজ্যবাদী নীতি প্রয়োগ করে সার্বভৌম রাষ্ট্রের শাসন।
৩. উৎপত্তির কারণ:
সাম্রাজ্যবাদের উৎপত্তির কারণ হিসেবে জাতীয়তাবাদ, জাতীয় নিরাপত্তা, জনসংখ্যার আধিক্য, য ধর্ম প্রচার প্রভৃতির কথা বলা যায়। আর উপনিবেশবাদের উৎপত্তি লাভ করেছে উন্নত দেশগুলোর বিশ্বে প্রাধান্য বজায় রাখার একটা কৌশল হিসেবে।
৪. পরিধির বিস্তার:
সাম্রাজ্য কোনো বিরাট আয়তন বিশিষ্ট এলাকা নিয়ে গঠিত হয় যেখানে কতগুলো কম বেশি বিভিন্ন ধরনের জনসমষ্টি থাকে। আর উপনিবেশ বিস্তারের ক্ষেত্রে এলাকা বা ভূখণ্ড তেমন বিরাট আয়তন না হলেও চলে।
৫. বলপ্রয়োগের ধারণা:
সাম্রাজ্যবাদে বলপ্রয়োগ ব্যাপক আকারে পরিলক্ষিত হয়। এ কারণে বলা হয়, বলপ্রয়োগ ও সামরিক শক্তির সাহায্যে কোনো দেশের উপর বৈদেশিক শাসন প্র চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াই হলো সাম্রাজ্যবাদ আর উপনিবেশবাদে অ সামরিক শক্তি বা বলপ্রয়োগের মাত্রা অপেক্ষাকৃত কম।
৬. জনবসতি ও জনমিতিক পরিবর্তন
সাম্রাজ্যবাদে সাধারণত বিজয়ী শক্তি বিজিত অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে যায় না; তারা কেবল শাসন ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। কিন্তু উপনিবেশবাদে অনেক সময় সাম্রাজ্যবাদী দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ এসে ওই নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন করে (যাকে 'Settler Colonialism' বলা হয়), যার ফলে স্থানীয় জনমিতিতে বড় পরিবর্তন আসে।
৭. শাসনের স্থায়িত্ব ও প্রকৃতি
সাম্রাজ্যবাদ একটি রাজনৈতিক ও সামরিক ধারণা যা মূলত রাষ্ট্রের সীমানা বৃদ্ধির সাথে জড়িত। এটি তুলনামূলকভাবে দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। অন্যদিকে, উপনিবেশবাদ হলো একটি দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা যা স্থানীয় সমাজ, সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে পুরোপুরি নিজেদের ছাঁচে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করে।
৮. মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
সাম্রাজ্যবাদ মূলত রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়। কিন্তু উপনিবেশবাদ মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং সংস্কৃতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। উপনিবেশিক শক্তি শাসিত অঞ্চলের মানুষের ভাষা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং জীবনযাত্রাকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরেও সেই প্রভাব থেকে যায় (যাকে আমরা উত্তর-উপনিবেশবাদ বা Post-colonialism বলি)।
৯. অর্থনৈতিক কাঠামোর পার্থক্য
সাম্রাজ্যবাদের ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য থাকে কর আদায় বা প্রাকৃতিক সম্পদ সরাসরি নিজের দেশে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু উপনিবেশবাদে শাসিত অঞ্চলটিকে মূল দেশের পণ্যের একটি 'বাজার' হিসেবে গড়ে তোলা হয় এবং স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়ে তাকে সম্পূর্ণভাবে মূল দেশের অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়।
১০. জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববোধ
সাম্রাজ্যবাদে বিজয়ী ও বিজিতের মধ্যে পার্থক্য মূলত 'শাসক ও শাসিত' হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু উপনিবেশবাদে একটি কৃত্রিম 'জাতিগত বা বর্ণগত শ্রেষ্ঠত্ব' (যেমন: হোয়াইট ম্যানস বার্ডেন) প্রচার করা হয়, যেখানে দাবি করা হয় যে উপনিবেশ স্থাপন করা হয়েছে স্থানীয় অনুন্নত মানুষকে 'সভ্য' করার জন্য।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার পশ্চাতে উপনিবেশবাদের ধারণা বলিষ্ঠভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। আর তাই এদের মধ্যে উপরিউক্ত ক্ষেত্রসমূহে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
