লেলিনের মতে সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদের সার্বাচ্চ পর্যায় উক্তিটি ব্যাখ্যা কর

সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদের সার্বাচ্চ পর্যায়- লেলিন এর বক্তব্য

অথবা, "সাম্রাজ্যবাদ হলো পুঁজিবাদের চূড়ান্ত স্তর এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা স্তর ব্যাখ্যা কর

LED ভূমিকা: বিশ্ব রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বহুল আলোচিত ও সমালোচিত একটি প্রত্যয় হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদের ব্যাপক আলোচনা সম্প্রসারিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে অন্য ভূখণ্ডে আক্রমণ করে সেই ভূখণ্ডের ওপর সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করাকে সাম্রাজ্যবাদ বলে। যেকোনো রাষ্ট্রকে নিজ রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতায় এনে তাঁর ওপর আধিপত্য বিস্তার করাকেই সাম্রাজ্যবাদ বলে।

লেলিনের মতে সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদের সার্বাচ্চ পর্যায় উক্তিটি ব্যাখ্যা

সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়:

"সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় উক্তিটি নিচে ব্যাখ্যা করা হলো-

১. সাম্রাজ্যবাদ বিস্তার ও শোষণ:

সাম্রাজ্য বিস্তারকে সাম্রাজ্যবাদ বলা হয়। পররাজ্য গ্রাস ও লুণ্ঠন করে পদানত রাখার ব্যবস্থা হলো সাম্রাজ্যবাদ। উন্নত একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও সেই রাষ্ট্রের পুঁজিপতি বা বুর্জোয়াদের দ্বারা অন্য একটি দেশ বা তার জনগণের ওপর শোষণ-শাসন কায়েম করাই হলো সাম্রাজ্যবাদ। আর এই শোষণ-শাসন করে মূলত পুঁজিপতি দেশগুলো তাদের ওপর নির্ভরশীল দেশ বা জাতির ওপর।

২. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আধিপত্য:

সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো তাদের আধিপত্য বিস্তার এর ফলাফলে প্রচুর অর্থবিত্ত ন্যায় পথে বা অন্যায় পথে নিজেদের করে নিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিকে সমৃদ্ধ করে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো। যেমন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন প্রত্যেকটি রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদী নীতি চালাতে গিয়ে নিজেদের অর্থনীতিকে পুঁজিপতি কর্তে অধীন রাষ্ট্রের মধ্যে ঋণ, সাম্রাজের নামে বশ্যতা আনয়নে বাধ্য করছে।

৩. নব্য উপনিবেশবাদ:

পুঁজিবাদের মাধ্যামে উন্নত রাষ্ট্রগুলো অনুন্নত ও প্রাক-পুঁজিবাদী বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক তথা সামরিক অভিযান চালিয়ে তাদের পদানত ও পরাধীন করে। সেসব দেশের তুমি প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করে নেয়। পুঁজিবাদের উদ্ভবের পরে কতিপয় উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের এই পররাজ্য দখলের এই চিত্র ইতিহাসে নব্য উপনিবেশ নামে পরিচিত। এই উপনিবেশিক কর্মনীতির দ্বারা বিভিন্ন অনুন্নত পশ্চাৎপদ দেশগুলো উপনিবেশে পরিণত হয় সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর। উন্নত পুঁদিবাদী দেশের পুঁজিবাদের বিকাশ এই ঔপনিবেশিক শোষণ, শাসন, পৃষ্ঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

৪. প্রাচীন সাম্রাজ্যবাদ বনাম নব্য সাম্রাজ্যবাদ:

প্রাচীন সাম্রাজ্যবাদ আর নব্য সাম্রাজ্যবাদ এক নয়। প্রাচীন সাম্রাজ্যবাদে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ শাসন-শোষণের মাধ্যমে তাদের নিজেদের অধীনস্থ করে রাখত, কিন্তু আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো ঋণ সহায়তা, সাহায্য দানের মাধ্যমে অনুন্নত দেশগুলোতে তাদের আধিপত্য বিস্তার করছে এবং তার মাধ্যমে সাহায্য বাজঋণ গ্রহণকারী রাষ্ট্রের সাময়িক খাত, অর্থনৈতিক খাতসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক সফল খাতে তাদের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। যার কারণে লেনিন বলেছিলেন, "সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়।"

৫. বণিক থেকে শোষক:

পুঁজিবাদের প্রাককালে উদীয়মান পুঁজিপতিরা তাদের রাষ্ট্রশক্তির দ্বারা অন্য দেশ দখল করে শোষণ চালাচ্ছে। পুঁজিপতিদের স্বার্থে অন্য দেশে বিদেশি বণিকরা বাণিজ্য করতে এসে যণিক থেকে শোষকে ও শাসকে পরিণত হচ্ছে। এভাবেই পুঁজিবাদী কর্তৃক এই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র সৃষ্টিকে বলা হয় নব্য সাম্রাজ্যবাদ। তাই বলা যায়, পুঁজিবাদ যখন চরম আকার ধারণ করে তখনই কোনো পুঁজিবাদী রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদের দিকে নজর রাখে এবং তার ফলে সাম্রাজ্যবাদ নবরূপে উদিত হচ্ছে।

৬. বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি ও পুঁজিবাদ:

বর্তমান পৃথিবীর যেসব পুঁজিবাদী রাষ্ট্র আছে তাদের পররাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্যনীতি, বৈদেশিক ঋণ বা সাহায্য নীতির দিকে লক্ষ করলেই সহজে প্রতীয়মান হয় যে, সাম্রাজ্যবাদ হাচ্ছে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়। যেমন- বর্তমান বৃহৎ পুঁজিবাদী রাষ্ট্র-যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, রাশিয়া। তাদের পুঁজির বিনিয়োগ করছে স্বল্পোন্নত বা পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রের উন্নয়ন কল্পে। লক্ষ্য উন্নয়ন কিন্তু উন্নয়নের আড়ালে তারা তাদের সাম্রাজ্যবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজের শক্তিমতা ও অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করছে। ভাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক চিন্তাচেতনা প্রতিস্থাপন করছে অনুন্নত দেশগুলোর ওপরে। এভাবে তারা তাদের পুঁজিকে ফাজে লাগিয়ে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রে নবভাবে উত্থাপিত হচ্ছে। তাই যথর্থাই লেনিন তাঁর বক্তব্যে বলেছেন সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সবোচ্চ পর্যায়।

লেনিনের মতে উক্তিটির ব্যাখ্যা:

ভ্রাদিমির ইলিচ লেনিন সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় নামের একটি গ্রন্থ রচনা করেন এবং তাতেই মূলত এই উক্তিটি ব্যক্ত করেন। তার এই উক্তিটির যোর্থতা নিচে ব্যাথা করা হলো-

তার এই উক্তিটি ব্যাখ্যা করে আমরা লেনিন বর্ণিত সাম্রাজ্যবাদের সংজ্ঞা উল্লেখের মাধ্যমে সহজেই প্রতীয়মান হতে পারি যে, সাম্রাজ্যবাদ হলো পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়। তিনি সাম্রাজ্যবাদের সংজ্ঞায় বলেছেন সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তর (সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর)

একচেটিয়া পুঁজি স্তর:

একচেটিয়া পুঁজি বলতে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে আসে উৎপাদনের কেন্দ্রীয়ভবনের ফলে আবির্ভূত হওয়া। বৃহৎ কর্পোরেশনগুলোর কথা, যা লেনিনের সময়ের তুলনায় আজকের যুগে অনেক বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও তার জাল ছড়িয়েছে।

সম্পদ ও বাজরের নিয়ন্ত্রণ:

লেনিন কয়লা ও পেট্রোলিয়ামের মত্যে প্রধান প্রধান কাঁচামালের উৎসগুলোর ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একচেটিয়াকরণ এবং, সেই সঙ্গে উপনিবেশ আধা/নব্য উপনিবেশ এলাকাগুলো দখলে রাখার ক্ষেত্রে একচেটিয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন।

অবশ্য, এসব ক্ষেত্রে একচেটিয়াকরণ মানেই প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে যাওয়া বোঝায় না। প্রতিযোগিতা থেকে একচেটিয়া পুঁজির জন্ম এবং পুনরায় তা আরও বেশি করে প্রতিযোগিতাকে বাড়িয়ে দেয়। কার্ল মার্কস ইতোমধ্যেই দেখিয়েছেন যে, এটা হচ্ছে বিপরীতের মধ্যকার 'ঐক্য' তথা 'সংশ্লেষণ' তথা 'গতিময়তা'। লেনিন নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে এটাকে আরও পরিপূর্ণতা দান করেছিলেন।

যুদ্ধের অনিবার্যতা:

লেলিন উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন যে, কোনো কোনো সাম্রাজ্যবাদের যুগে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ধনতন্ত্রের বিকাশ ছিল এবং এখনো আছে। খুবই অসম তাই কিছু পুঁজিবাদী বৃহৎ শক্তি অন্যদের তুলনায় অনেক দ্রুত বিকাশ লাভ করেছিল এবং স্বাভাবিকভাবেই গোটা পৃথিবীর সম্পদ, বাজার এবং এলাকার বৃহত্তর অংশের দখল নিতে চেয়েছিল। কিন্তু যেহেতু বিশ্বের ভৌগোলিক বিভাজন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল তাই পুনর্বিভাজন ছিল একমাত্র যুদ্ধের মাধ্যমেই। অর্থাৎ বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্য অথবা তাদের গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় একচেটিয়া পর্যায়ের পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতা থেকেই, কোনো রাষ্ট্রনেতার বদ উদ্দেশ্য থেকে নয়।

ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদ ও মুমুর্ষু পুঁজিবাদ:

লেনিন একচেটিয়া কারবার ছাড়াও সাম্রাজ্যবাদের আরও দুটি বৈশিষ্ট্যর কথা উল্লেখ করেছেন পরজীবী অথবা ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদ এবং মুমুর্ষু পুঁজিবাদ। লেনিনের মতে, একচেটিয়া তথা মোড়লতন্ত্র। স্বাধীনতা নয় আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রচেষ্টা। আরও বেশি ক্ষুদ্র ও দুর্বল আতিগুলোর ওপর অল্পসংখ্যক সবচেয়ে ধনী অথবা ক্ষমতাবান জাতিগুলোর শোষণ এসব বিষয় সাম্রাজ্যবাদের সেসব বৈশিষ্ট্যের জন্ম দিয়েছে, যার ফলে আমরা বাধ্য হয়েছি তাকে পরজীবী অথবা ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে সাম্রাজ্যবাদের যুগে শিল্পের কিছু শাখা, বুর্জোয়াশ্রেণির কিছু স্তর এবং কিছু বিশেষ দেশ এসব প্রবণতার এটি বা অন্যটি প্রকাশ করে। সামগ্রিক বিচারে, পুঁজিবাদ আগেকার তুলনায় আরও বেশি দ্রুত হারে যোড় উঠমে। একদিকে বিস্ময়কর কিন্তু অভান্ত অসম, আায়সাম্যহীন বৃদ্ধি। অন্যদিকে সুস্পষ্ট ক্ষয়িষ্ণুতা সুয়ে মিলে এভাবে এক বিপরীতের ঐক্য জন্ম দিচ্ছে, যেখানে শেষ বিচারে ক্ষয়িষ্ণুতা হচ্ছে যক্ষের প্রধান দিক।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, লেনিনের পুঁজিবাদের বিকাশ ও নব্য সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে যে বক্তব্য, সেখানে সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় তা বার্তমান পৃথিবীর সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর শাসন নীতি, বৈদেশিক নীতি পর্যালোচনা ফরলে সহজেই প্রতীয়মান হওয়া যায় এবং পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর যখন ব্যাগক পুঁজিতে সমৃদ্ধ হয় এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত খুঁজি অনুন্নত রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে লগ্নি করে তার মাধ্যমেই নব্য সাম্রাজ্যবাদ জন্য লাভ করে।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন