সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে লেনিন ও হিলফারডিং-এর মতামত ও চিন্তাধারা তুলে ধর

সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে লেনিন ও হিলফারডিং-এর মতামত ও চিন্তাধারা

ভূমিকা: মার্কস ও এঙ্গেলসের তৈরি মন্তব্য দিয়েই উনিশ শতকের শেষে এবং লেনিন পুঁজিবাদের কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচিত করেন। তিনি পুঁজিবাদী একাগ্রতা, ব্যাংকিং এবং অধিকতর ভারী শেয়ার কোম্পানির উদ্যোগেই ব্যাংকের অভিনব চরিত্র তুলে ধরেন। লেনিন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'Imperialism the Highest Stage of Capitalism' (1916)-এ সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের সাথে সাথে বিষয়বস্তু থেকে একচেটিয়া পুঁজিবাদ এবং একচেটিয়া পুঁজিবাদের মৌলিক ধরন যা মূলত সাম্রাজ্যবাদের পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে লেনিন ও হিলফারডিং-এর মতামত

সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে লেনিন ও হিলফারডিং-এর মতবাদ:

Hilferding এবং Lenin-এর মতে উচ্চ উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণ থেকেই একচেটিয়া পুঁজিবাদের উত্থান, যেটা মূলত একটি বিশেষ দল, সিন্ডিকেট ট্রাস্টসমূহ দ্বারা বোঝানো হয়। উনিশ শতকের শেষার্থে। বিশেষত বিশ শতকের প্রারম্ভে উন্নত দেশগুলোতে একচেটিয়া কারবার বিশেষভাবে আধিপত্য বিস্তার করে। বিশেষত জার্মানি, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, ইতালি এই উন্নত রাষ্ট্রগুলো দ্বারাই পুঁজিবাদের আক্রমণাত্মিক উত্থান ঘটে। 

পুঁজিবাদী অর্থনীতি মৌলিক ও শিল্প ও উন্নয়নের সুবিধার্থে গুরুত্বপূর্ণ উৎসসমূহকে একচেটিয়া কারবারগুলো কুক্ষিগত করে ফেলে, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলোর একচেটিয়া মালিকানা উন্নত পুঁজির শক্তিকে বৃদ্ধি করে এবং মধ্য স্বত্ব ভোগীদের বিরোধকে আরও প্রবল করে তোলে।

হিলফারডিং এবং লেলিন সাম্রাজ্যেবাদে ব্যাংকগুলোর ভূমিকাও উল্লেখ করেন। তাদের মতে ব্যাংকগুলো একচেটিয়া কারবারের জন্ম দেয়।

ব্যাংকগুলোর পরিমিত মধ্যস্বত্বভোগী উদ্যোগগুলোকে অর্থনৈতিক পুঁজির একচেটিয়া কারবারিতে উন্নতি করে। পুঁজিবাদী দেশগুলো বড় বড় ব্যাংকগুলোর দ্বারা ব্যাংক পুঁজি ও শিল্পপুঁজির মাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলে, যার মাধ্যমে পুরো দেশের পুঁজি ও আয়ের বিরাট একটি অংশ নিজেদের হস্তগত করে নেয় বা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক শাসকদের সঙ্গে সহযোগিতা করে।

লেলিন (Lenin) এবং হিলফারিং (Hilferding) এর মতে উপনিবেশবাদী নীতি থেকে একচেটিয়া কারবারের জন্য দেয় এবং উপনিবেশবাদী নীতির পুরাতন উদ্দেশ্যগুলোর আলোকে আর্থিক পুঁজির রপ্তানি লভ্যাংশের প্রভাব ক্ষমতা বিস্তারের জন্য বিভিন্ন উৎসগুলোকে কুক্ষিগত করতে প্রচেষ্টা চালায়।

সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য:

লেলিন (Lenin) এবং হিলফারিং (Hilferding)-এর সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্বের বিশ্লেষণে । A. Hobson তাঁর Imperialism গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেন।

১. উৎপাদনের একচেটিয়াকরণ:

শিল্পের বিস্তার এবং বৃহৎ উদ্যোগগুলোর অধীনে উৎপাদনের একচেটিয়াকরণ প্রক্রিয়া সাম্রাজ্যবাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম। উৎপাদনে আধুনিক গবেষণাগুলো সম্পূর্ণ ও সঠিক উপাত্ত পরিবেশন করে। একচেটিয়াকরণ ক্রমশ বাড়তেই থাকে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে বড় থেকে আরও বড় হতে থাকে।

২. পুঁজি রপ্তানি:

পুরাতন পুঁজিবাদের আদর্শস্বরূপ ছিল পণ্যের রপ্তানি। একচেটিয়া কারবারের নিয়ন্ত্রণ তথা পুঁজিবাদের সর্বশেষ ভরের আদর্শ স্বরূপ হালা পুঁজির রপ্তানি। পুঁজিপতিরা পণ্য রপ্তানি না করে পুঁজি রপ্তানি করার কাজে মনোনিবেশ করেন।

৩. ব্যাংকের ভূমিকা:

ব্যাংকগুলোর নির্দেশনায় ব্যবসায় উদ্যোগগুলো ক্রমবধিষ্ণু হারে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন শিল্পে মিলিত হয়ে বিশাল বিশাল ব্যবসায় উদ্যোগে রূপান্তরিত হয়। এটা মূলত একচেটিয়া কারবারিদের কৌশল, সিন্ডিকেট গড়ে তুলে এবং পুঁজি কেন্দ্রীভূতকরণে ত্বরান্বিত করে। পুরাতন পুঁজিবাদে একে অন্যের সাথে যুক্ত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করত কিন্তু বর্তমান পুঁজিবাদের ধরন ভিন্ন যার বিবর্তনের মূলে রয়েছে ব্যাংকিং ব্যবস্থা।

৪. বণ্টনপ্রক্রিয়া:

বণ্টনপ্রক্রিয়ায় সম্রোজ্যবাদের মাধ্যমে পৃথিবীটাকে বৃহৎ পুঁজির রাষ্ট্রগুলোয় মাঝে বণ্টন করে নেওয়া হয়, যার মাধ্যমে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক পৃথিবীর মুক্ত অঞ্চলগুলো দখল করার ঔউপনিবেশিক নীতির অবসান হবে। বণ্টন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভূমিগুলো মালিকানাধীন থেকে মালিকানায় স্থানান্তর হওয়ার পরিবর্তে কেবল এক মালিক থেকে আরেক মালিকে স্থানান্তর হবে।

৫. বাজার অর্থনীতি বণ্টন:

একচেটিয়া পুঁজিবাদী সংস্থা কৌশল, সিন্ডিকেট ও ট্রাস্টগুলো তাদের পুঁজি ও শক্তির অনুপাতে চুক্তির মাধ্যমে দেশি বাজার, বাজার অর্থনীতি তথা আন্তর্জাতিক বাজার অর্থনীতির বণ্টন করে নেয়।

৬. আর্থিক পুঁজি:

বাক্তিগত সম্পত্তির সাধারণ অবস্থায় একচেটিয়া কারবারগুলোর ব্যবসায় কার্যক্রমগুলো আর্থিক পুঁজিতে রূপ নেয়। সাধারণত পুঁজিবাদে পুঁজির ব্যবহার শিল্প উৎপাদন পুঁজি থেকে পৃথক হয়ে যায়। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদে এ পৃথকীকরণ এত ব্যাপক অনুপাতে পৌঁছে যে, সকল পুঁজির ওপর আর্থিক পুঁজির পার্থক্যই হলো উপস্বত্বজীবী ও আর্থিক পুঁজির প্রাধান্য বিস্তার।

৭. পুঁজির বিভাজন প্রক্রিয়া:

পুঁজির বিভাজন প্রক্রিয়ার উন্নত দেশগুলোর মাঝে বিভিন্ন পুঁজির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। সাম্রাজ্যবাদের ধারাবাহিকতায় পুঁজির বিভাজন উন্নত দেশগুলোর প্রভাব দ্বারা বণ্টন করা হয়।

৮. উৎপাদনে কেন্দ্রীভূতকরণ:

উৎপাদন কেন্দ্রীভূতকরণ প্রক্রিয়া শিল্পের দ্রুত বিস্তার ও উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণে সাম্রাজ্যবাদে সহায়তা করে। উন্নত প্রভাবশালী দেশগুলো উপনিবেশিক প্রভাব বিস্তার দ্বারা উৎপাদন কেন্দ্রীভূতকরণে নিজের অংশ বৃদ্ধি করে ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে বৃষৎ থেকে আরও বৃহত্তর হতে থাকে। যার মাধ্যমে উপাদান কেন্দ্রীভূত করণে সহায়তা করে।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, লেনিন ও হিলফারডি সাম্রাজ্যবাদকে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণের মাধ্যমে একচেটিয়া পুঁজিবাদের উত্তব ঘটে এবং সম্পদের মালিকানা একটি নিনিম্ন পুঁজিপতিগোষ্ঠীর কাছে কুক্ষিগত হয়ে পড়ে যার ফলে একচেটিয়া কারবারের জন্ম হয়।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন