সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন রূপ সম্পর্কে আলোচনা কর

সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন রূপ সম্পর্কে আলোচনা

ভূমিকা: উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতি বিশ্লেষণে কিংবা আন্তর্জাতিক দুনিয়ার সম্পর্ক বিশ্লেষণে একটি বহুল প্রচলিত প্রত্যয় হচ্ছে 'সাম্রাজ্যবাদ। সাধারণ আর্থ সাম্রাজ্যবাদ বলতে সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাকে বোঝায়। অন্যভাবে বলা যায়, অপর রাজ্য গ্রাস করে সেই অঞ্চলের মানুষকে জোর করে বিদেশি শাসনাধীনে আনা এবং তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করার নামই হলো সাম্রাজ্যবাদ। তাই সাম্রাজ্যবাদের অর্থ বিদেশি শাসন ও শোষণ। কোনো রাষ্ট্রে অন্য হার্টে আগ্রাসন বিস্তার করলে তাকে সাম্রাজ্যবাদী বলে আখ্যা দেওয়া হয়। উন্নয়নশীল সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে সাম্রাজ্যবাদ কথাটি সাধারণত নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। কেননা সাম্রাজ্যবাদের মূল লক্ষ্যই হলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শোষণ করা।

সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন রূপসমূহ

সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন রূপসমূহ:

সাম্রাজ্যবাদের দুটি রূপ দেখা যায়। যথা- (ক) উপনিবেশবাদ ও (খ) নব্য উপনিবেশবাদ। উভয়েরই মূল লক্ষ্য হলো, অপর জাতিকে নিয়ন্ত্রণ ও শোষণ করা। তবে নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের মধ্যে পদ্ধতিগত পার্থক্য বিদ্যমান। নিম্নে সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্নরূপ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো-

ক. উপনিবেশবাদ:

আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায় উপনিবেশবাদ শব্দটি বিশেষভাবে প্রচলিত। উপনিবেশ স্থাপনের বাসনা মানব ইতিহাসের অতি প্রাচীন ঘটনা। ল্যাটিন শব্দ কলোনিয়া (Colonia) থেকে ইংরেজি কলোনি Colony) বা উপনিবেশ শব্দটির উৎপত্তি ঘটেছে। 'উপনিবেশ শব্দটির মূল অর্থ হলো "মানবসমাজের একটি স্থানান্তরিত অংশ। রাজনৈতিক দিক থেকে বিচার করলে উপনিবেশ বলতে বুঝায়-

(ক) দেশের সীমান্তের বাইরে অপর বসতিস্থাপন, অথবা (খ) রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো কোনো রাষ্ট্রে একটি ভূখণ্ড, যে ভূখণ্ড উক্ত রাষ্ট্রের কাছে আনুগত্য করে।

এই উপনিবেশবাদের মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো অধীন রাষ্ট্রগুলোর উপর সম্যকভাবে রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য কায়েম করা। কোনো কোনো রাষ্ট্র আবার আধা উপনিবেশে পরিণত হয়। অর্থাৎ এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করলে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নির্ভরশীলতার জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। তবে উপনিবেশবাদ যে প্রকারেরই হোক না কেন, উপনিবেশগুলো বিশ্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে কাঁচামাল ও রসদ জোগানের ভান্ডার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ব্রুটেন্টস (Brutents) উপনিবেশবাদের সর্বগ্রাসী প্রসারের তিনটি মূল কারণ লিপিবদ্ধ করেছেন। যথা-

প্রথমত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর প্রধান ভূমিকা।

দ্বিতীয়ত, উপনিবেশগুলোর জনগণের নির্লিপ্ততা এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। কারণ, প্রথম থেকেই তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ঔপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসনকে প্রতিহত করতে সমর্থ হয়নি।

তৃতীয়ত, এই উপনিবেশগুলোর জনগণ যদিও বা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতো, তবুও তারা এই মহাশক্তিধর জনগোষ্ঠীর বা রাষ্ট্রের সাহায্য পেত না।

এভাবে অপ্রতিহতভাবে উপনিবেশবাদ তার শোষণ কায়েম করতে থাকে। তবে, এই অবস্থা চিরস্থায়ী হয়নি। বেসামাল অর্থনীতি, চূড়ান্ত দারিদ্র্য, খাদ্য ও শিক্ষার অভাব এবং রাজনৈতিক স্বৈরাচারিতার মুখে উপনিবেশের জনগণের মধ্যে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বিয়েষ গড়ে ওঠে। সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মধ্যে হতাশাজনিত বিদ্বেষ সঞ্চায়িত হয়। একই সময় মার্কসীয় চিন্তার আবির্ভাব ও প্রসার উপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে আঘাত হানে। এছাড়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান উপনিবেশবাদের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। কারণ উভয়ই মহাশক্তির মর্যাদা লাভ করার জন্য উপনিবেশের অবসান ঘটিয়ে সেখানাকার জনগণকে প্রভাবিত করতে চেয়েছে।

খ. নব্য উপনিবেশবাদ:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলের উপনিবেশগুলো ধীরে ধীরে স্বাধীনতা অর্জন করলেও উপনিবেশবাদ তখনও সম্পূর্ণরূপে অবলুপ্ত হয়নি। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাদের উপনিবেশিক শাসনের গাল গুটিয়ে আনতে বাধ্য হলেও তারা নতুন উপায়ে পরোক্ষ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনুশাসন চালিয়ে যেতে সচেষ্ট হয়। এরূপে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেই নয়। উপনিবেশবাদ হলো, সাম্রাজ্যবাদের বা উপনিবেশবাদের আধুনিক রূপ। লেনিনের মতে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো মৃতপ্রায় হয়ে পড়লেও নতুন কৌশল নিয়ে বাঁচবার চেষ্টা করছে। তারা সরাসারি নিজেদের শাসনভার অপর দেশের উপর চাপিয়ে দিয়ে শোষণ করতে পারছে না। তাই নতুন কৌশল নিয়েছে। এই কৌশলের নাম নব্য উপনিবেশবাদ। অর্থাৎ বিশ্বের ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো পূর্বতন উপনিবেশগুলোর উপর আধিপত্য স্থাপনের যে নতুন কৌশল গড়ে তুলেছে, তার নাম হলো নব্য উপনিবেশবাদ।

নব্য উপনিবেশবাদের ভূমিকা ও কৌশলসমূহ

নব্য উপনিবেশবাদের ভূমিকা ও কৌশলগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

১। বৈদেশিক সাহায্য ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার:

নব্য উপনিবেশবাদের প্রধান কৌশল হলো নতুন কায়দায় পূর্বতন উপনিবেশগুলোর উপর পুনরায় অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করা। অর্থাৎ অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাকে বাঁচিয়ে রেখে ঐসব দেশের উপর সাবেকী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে নব্য উপনিবেশবাদ আর্থিক সাহায্য, ঋণ, অসম বাণিজ্য চুক্তি প্রভৃতির মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশের উপর একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা করে।

২। বহুজাতিক সংস্থা ও নব্য উপনিবেশিক শোষণ:

নব্য উপনিবেশবাদের শোষণের আরেকটি হাতিয়ার হলো ছোট-বড় কয়েক হাজার বহুজাতিক সংস্থা বা কোম্পানির ভূমিকা। এরা বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক প্রভুত্ব বিস্তার করে চলেছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই। দারিদ্র্য বা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো অর্থনৈতিক দুর্দশা লাঘবের জন্য এবং শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাব মেটানোর জন্য বহুজাতিক সংস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে।

৩। সামরিক জোট গঠন:

নব্য উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণের অপর একটি কৌশল হলো সামরিক জোট গঠন এবং সামরিক চুক্তি সম্পাদন। নব্য উপনিবেশবাদ নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে নানা সামরিক জোটের। যেমন- ন্যাটো, সিয়াটো, ওয়ারশ, অ্যাঞ্জাস প্রভৃতির অন্তর্ভুক্ত করে তাদের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনী কর্তৃক ইরাক আক্রমণ এবং সাদ্দাম সরকারের উৎখাত উক্ত সংস্থার একটি জলন্ত দৃষ্টান্ত।

৪। সামরিক ঘাঁটি স্থাপন:

দুর্বল দেশগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নয়। উপনিবেশবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন স্থানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন। যেমন তুরস্ক, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভারত মহাসাগরে মার্কিন ঘাঁটি ছিল।

৫। পুতুল সরকার গঠন:

নব্য ঔপনিবেশিক শোষন চালাবার অপর গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ও কৌশল হলো পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা। যেমন- দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড প্রভৃতি রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহ পুতুল সরকার গঠন করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। আর এই যদি আনুগত্য দেখাতে সামান্য গাফিলতি করে, তাহলে তার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।

৬। সাংস্কৃতিক কৌশল:

সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোর সাংস্কৃতিক জীবনকেও নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। ঐসব দেশের সুস্থ সংস্কৃতির গতিরোধ করে, বিজ্ঞানমনস্কতাকে নষ্ট করে দিয়ে বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে উৎসাহ দিয়ে ঐসব দেশের সাংস্কৃতিক জীবনকে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করে থাকে।

৭। জাতিগত সংঘাত:

নব্য উপনিবেশবাদ সাম্প্রতিককালে এশিয়া ও আফ্রিকায় জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘর্ষ এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘর্ষে প্ররোচনা জুগিয়ে চলেছে। রুয়ান্ডা, আফগানিস্তান, মোজাম্বিক, সোমালিয়া, বসনিয়া প্রভৃতি দেশে জাতিগত দাঙ্গার কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার পরিশেষে বলা যায়, সাম্রাজ্যবাদের অবসান ঘটলেও নব্য উপনিবেশবাদের অবসান হয়নি। বিকাশশীল দেশগুলো নব্য উপনিবেশবাদের স্বরূপ জেনে ফেলেছে। তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু তাদের ছোবল থেকে পুরাপুরি মুক্ত হতে পারছে না। উপনিবেশবাদ জগদ্দল পাথরের মতো তাদের উপর চেপে বসেছে। কারণ, দ্রুত বিকাশের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছ থেকে সাহায্য নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই সুযোগ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নানা ধরনের শোষণমূলক শর্ত আরোপ করছে। তবে এ কথা সত্য যে, শোষণ চালাতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। কিন্তু তাতে তারা বিচলিত না হয়ে, পিছু যা হটে নিত্যনতুন কৌশল আবিষ্কার করছে।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন