মৌল ও উপরিকাঠামো কী? ঐতিহাসিক বস্তুবাদের আলোকে মৌলকাঠামো ও উপরিকাঠামোর মধ্যে সম্পর্ক উল্লেখ কর

মৌল ও উপরিকাঠামো কী? ঐতিহাসিক বস্তুবাদের আলোকে মৌল ও উপরিকাঠামোর মধ্যে সম্পর্ক

উত্তর: ঐতিহাসিক বস্তুবাদ হলো মার্কসবাদের প্রধান উপাদান। এটি হলো মার্কসীয় দর্শনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি একটি পদ্ধতি বা দৃষ্টিভঙ্গি এবং একটি সমাজতত্ত্বগত তত্ত্ব। এটি হলো ইতিহাস সম্পর্কে মার্কসীয় দর্শন। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সামগ্রিকভাবে সমাজ বিকাশের সাধারণ দিকগুলো এবং সমাজ বিকাশের সাধারণ নিয়মাবলি ও চালিকাশক্তিগুলোর বিশ্লেষণ করে। তাই ঐতিহাসিক বস্তুবাদে উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত মৌল কাঠামো ও উপরিকাঠামোর পরিচয় পাওয়া যায়।

মৌল ও উপরিকাঠামো কী? ঐতিহাসিক বস্তুবাদের আলোকে মৌলকাঠামো ও উপরিকাঠামোর মধ্যে সম্পর্ক

মৌল কাঠামো:

কার্ল মার্কসের মতে, প্রতিটি সমাজেরই একটা মৌল কাঠামো রয়েছে, যা ভিত্তি বা বুনিয়াদ নামে পরিচিত। এ মৌল কাঠামো সমাজের অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে নিয়ে গড়ে উঠে। আর এ উৎপাদন প্রণালিই সমাজের সকল কর্মকান্ডের মূল চালিকাশক্তি। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদনশক্তি (Forces of production) ও উৎপাদন সম্পর্ক (Relation of production) উৎপাদনের উপায় যেমন- যন্ত্রপাতি, শ্রম, দক্ষতা, প্রযুক্তি ইত্যাদি হলো উৎপাদন শক্তি। অন্যদিকে, উৎপাদন উপায়ের পারস্পরিক সম্পর্ক, সম্পদের মালিকানা, উৎপাদিত পণ্য বণ্টন ও বাজারজাতকরণ হলো উৎপাদন সম্পর্ক। ব্যক্তিমালিকানার ক্ষেত্রে কারখানার মালিক, ব্যবস্থাপক, দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক ইত্যাদির মধ্যে উৎপাদন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে সম্পর্ক। এদের প্রত্যেকেরই উৎপাদন কাজে একটি বিশেষ ভূমিকা ও নায়িত্ব রয়েছে, যা শ্রমবিভাগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এ ছাড়া রয়েছে দায়িত্ব ও কর্তব্য অনুসারে মজুরি বণ্টন। মার্কসের মতে, এই উৎপাদন সম্পর্কই মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষণরূপে জন্য নেয়। অন্যদিকে, সামাজিক মালিকানার ক্ষেত্রে উৎপাদন কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা সহযোগিতা ও সাম্যের প্রতীক। এভাবেই উৎপাদন সম্পর্কগুলো একযোগে গড়ে তোলে সমাজের মৌল কাঠামো তথা অর্থনৈতিক কাঠামো। তাই বলা যায়, কোনো একটি সময়ে আধিপত্যশীল উৎপাদন সম্পর্কসমূহ সাবেকী উৎপাদন প্রণালির রয়ে যাওয়া উৎপাদন সম্পর্কসমূহ এবং সেই সমাজব্যবস্থার মধ্যে চলমান নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত উৎপাদন সম্পর্কসমূহ নিয়েই সমাজের ভিত্তি যা বুনিয়াদ বা মৌল কাঠামো তৈরি হয়।

উপরিকাঠামো:

ঐতিহাসিক বস্তুবাদের পর্যালোচনার ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক অবস্থান হলো ভিত্তি ও উপরিকাঠামোর আলোচনা। উপরিকাঠামো একটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। এই ভিত্তিটি হলো সম্পদের অর্থনৈতিক কাঠামো। তাই বলা যায়, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন উপাদান ব্যতীত যাবতীয় অন্য সবকিছুই এই প্রকাণ্ড উপরিকঠামোর অন্তর্গত। আর এর ভেতর রয়েছে আইনকানুন, দর্শন, বাজনীতি, চিন্তাচেতনা, সাহিত্য, ধর্ম, শিল্পকলা ইত্যাদি।

তাই দেখা যায়, উৎপাদন সম্পর্কগুলো মৌল কাঠামো গড়ে তোলে আর এর উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠে আইনগত ও রাজনৈতিক উপরিকাঠামো। আর এ মৌল ও উপরিকাঠামোর জন্ম দেয় এক ধরনের সামাজিক সচেতনতা। অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়া উপরিকাঠামোর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দুটি ভিন্ন রূপ আছে। সামাজিক বলতে উপরিকাঠামোর রাজনৈতিক ও আইনানুগ বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর উপরিকাঠামোর অন্যান্য দিক সাংস্কৃতিক বিভিন্ন অঙ্গ বিশেষ বলে বিবেচিত হয়। সমাজ জীবনের মূলভিত্তির সাথে উপরিকাঠামোর পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। ফলে প্রত্যেক সমাজের অর্থনৈতিক স্বনিয়ান পরিবর্তিত হওয়ার ফলে শীঘ্রই হোক আর বিলম্বেই হোক সমগ্র উপরিকাঠামোও রূপান্তরিত হয়। তবে মৌল কাঠামো ও উপরিকাঠামোর রূপান্তর একেবারে এক সাথে নাও হতে পারে। ফলে পরিবর্তনের মধ্যে এক ধরনের ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়, যা Cultural Lag নামে পরিচিত।

D. Chesnokov-এর মতে, দুটি মূল উপাদান নিয়ে উপরিকাঠামো গঠিত হয়।

ক. সামাজিক ধ্যানধারণাসমূহ: যার মধ্যে রয়েছে সামাজিক ভাবধারা, মেজাজ, সামাজিক অনুভূতি ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব।

খ. সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানসমূহ: যাদের মধ্যে রয়েছে-রাষ্ট্র, বিচারালয়, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ ইত্যাদি। এই গঠনগত বিন্যাসের দিক থেকে বিচার করে মার্কসবাদী, লেলীনবাদী দর্শনের মূলকথাতে বলা হয়েছে। উপরিকাঠামো হলো নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে উদ্বৃত সামাজিক ভাবধারা, প্রতিষ্ঠান ও সম্পর্কগুলোর মোট যোগফল।

মৌলকাঠামো ও উপরিকাঠামোর মধ্যে সম্পর্ক:

ঐতিহাসিক বস্তুবাদের পর্যালোচনার ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তাত্তিক অবস্থান হলো মৌল ও উপরিকাঠামোর অন্তর্বর্তী সম্পর্ক। উৎপাদনশক্তি ও উৎপাদন সম্পর্ক অর্থাৎ উৎপাদন পদ্ধতিই হলো সমাজ কাঠামোর মূলভিত্তি বা মৌল কাঠামো। আর এই ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে মূল্যবোধ, মতাদর্শ, সংস্কৃতি, রাজনীতি প্রভৃতি উপাদান। মার্কসবাদী ব্যাখ্যা অনুযায়ী মৌল কাঠামো উপরিকাঠামোকে প্রভাবিত করে। এ প্রেক্ষাপটে নিম্নে মৌল ও উপরি কাঠোমোর অ মধ্যকার কতিপয় সুস্পষ্ট সম্পর্ক উল্লেখ করা হলো-

প্রথমত, অর্থনৈতিক উৎপাদন সম্পর্ক দ্বারা সমাজের বস্তুগত উৎপাদনশক্তির যে বিকাশ ঘটে, তা সমাজের মৌল কাঠামোর নির্মাণ করে। আর এর উপর নির্ভর করে গড়ে উঠে উপরিকাঠামো। 'তাই আইন, সাহিত্য, শিল্পকলা, দর্শন এসব উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত হয় উপরিকাঠামো।

দ্বিতীয়ত, সামাজের মৌল কাঠামোর রূপ উপরিকাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করে অর্থাৎ সমাজের উৎপাদনশক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের সমন্বয়ের রূপ বা ভিত্তি অনুসারে মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, সাহিত্য ইত্যাদি গড়ে ওঠে।

তৃতীয়ত, সমাজের মৌল কাঠামো অধিকতর গতিশীল, তাই মৌল কাঠামো পরিবর্তিত হলে তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে উপরিকাঠামোও পরিবর্তিত হয়।

চতুর্থত, উপরিকাঠামো সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে। এটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর গড়ে ওঠে। আর উপরিকাঠামো মৌল কাঠামোর প্রতি মানুষের মনোভাষ প্রকাশ করে।

পঞ্চমত, সমাজ বিকাশের একটা নির্দিষ্ট স্তরে সমাজের যে অর্থনীতিক কাঠামো গড়ে ওঠে, তাকেই মৌল কাঠামো বলে। আর মৌল কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ধর্মীয়, রাজনৈতিক, মতাদর্শগত নানা প্রকার ধ্যানধারণা এবং এদের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা নানা প্রতিষ্ঠানকে উপরিকাঠামো বলা হয়।

ষষ্ঠত, মৌল কাঠামো বিশ্লেষণের দ্বারা সমাজ কাঠামোর স্বরূপ উদঘাটন করা যায় কিন্তু উপরিকাঠামো দ্বারা সমাজ কাঠামোর স্বরূপ পুরোপুরি উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব না হলেও এটি সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

সুতরাং বলা যায়, উপরিকাঠামোর জন্ম মৌল কাঠামো থেকে। সমাজে মৌল ও উপরিকাঠামোর মধ্যে স্পষ্ট পরিলক্ষিত হলেও উপরিউক্ত ক্ষেত্রগুলোতে এদের উভয়ের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ঐতিহাসিক বস্তুবাদের আলোচ্য বিষয়সমূহের মধ্যে মৌল ও উপরিকাঠামো সংক্রান্ত আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এ মৌল ও উপরিকাঠামোর উপর ভিত্তি করেই সমাজ কাঠামো গড়ে উঠে। আবার, সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনও সাধিত হয়। তাই উপরিকাঠামোর জন্য মৌল কাঠামোর মধ্য থেকে হলেও এবং সমাজে মৌল ও উপরিকাঠামোর মধ্যে বৈরী সম্পর্ক পরিলক্ষিত হলেও উপরিউক্ত ক্ষেত্রগুলোতে তাদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়। আব মৌল ও উপরিকাঠামোর মধ্যকার এ সম্পর্ক ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ভিত্তিতেই কার্ল মার্কস আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন