কার্ল মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তত্ত্ব আলোচনা
ভূমিকা: সমাজতন্ত্রকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্লেষণ এবং কল্পনাবিলাস পরিত্যাগ করে ঐতিহাসিক কার্যকরণ সম্বন্ধ নির্ণয়কারী ও দিক নির্দেশনাকারী কার্ল মার্কস আধুনিককালের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত পরিচিত নাম। তিনি একাধারে ছিলেন অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী। জ্ঞানের রাজ্যের সর্বস্তরে বিচরণকারী কার্ল মার্কস ছিলেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জনক ও পুরোধা। আর মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রত্যয় হচ্ছে এ ঐতিহাসিক বস্তুবাদ।
Karl Marx-এর ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তত্ত্ব বা ইতিহাস সম্পর্কে মার্কসের বস্তুবাদী ধারণা
Marx & Angels-এর অনবদ্য সৃষ্টি 'Communist Manifesto' গ্রন্থের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হচ্ছে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। মার্কস স্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ন্যায় ইতিহাসের ধারা ব্যাখ্যা করেছেন। আর এ ধারার মৌলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-উৎপাদন ব্যবস্থা, উৎপাদন সম্পর্ক প্রভৃতি। সমাজ বিকাশের ইতিহাস কোনো অভিপ্রকৃত ঐশ্বরিক শক্তির ইচ্ছায় বা কোনো ব্যক্তির একক স্বাধীন চেষ্টাতে সৃষ্টি হয় নি। বরং ইতিহাস হলো উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যক্তি ও তাঁর বিষয়গত পরিস্থিতির দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের বিকাশের ফলশ্রুতি। এ ধারণার বিশ্লেষণের মধ্যেই নিহিত আছে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মূল বক্তব্য ও সূত্রাবলি।
প্রকৃত প্রস্তাবে, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ হলো সমাজ জীবনের যাবতীয় ঘটনাকে অনুধাবন করার এক সাধারণ তত্ত্ব বা পদ্ধতি। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অনুসারে মানবসমাজের গঠন ও প্রকৃতি অনুধাবনের ক্ষেত্রে তিনটি মুখ্য সূত্র প্রয়োগ করা হয়। যথা- (i) সমাজের পরিবর্তন ও বিকাশ প্রকৃতির মতোই সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক নিয়মের নিয়ন্ত্রণাধীন। (ii) রাজনৈতিক তত্ত্ব, ভাবাদর্শ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি হয় সমাজের বৈষয়িক জীবনযাত্রার বিকাশের ভিত্তিতে, বাস্তবে বৈষয়িক জীবনযাত্রার পদ্ধতি কর্তৃক সৃষ্ট মতবাদ ও প্রতিষ্ঠান সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে।
ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বলে শ্রমই হলো সমাজের অস্তিত্ব ও বিকাশের মূল শক্তি। Marx শ্রমকে সম্পদের জনক এবং প্রকৃতিকে জননীরূপে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, ইতিহাস মূলত অর্থনৈতিক অবস্থার দ্বারা আবর্তিত ও বিবর্তিত হয়। আর এক্ষেত্রে উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার বিধানগুলোই এ বিবর্তনের প্রধান কারণ। মানবসমাজের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য দিকগুলো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক বুনিয়াদ উপরিকাঠামোকে প্রভাবিত করে। সমাজ পরিবর্তন ও শ্রেণি সম্পর্কের মূল কারণ হলো সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা। আর এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয় পরিলক্ষিত হয়।
অর্থনৈতিক জীবনধারা সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনধারাকে প্রভাবিত করে:
সমাজ বিকাশের সাধারণ বিধান, উৎপাদনের সামাজিক পদ্ধতির সাথে জড়িত। মানুষের জীবনধারণের জন্য বস্তুগত উপায় তথা উৎপাদনের পদ্ধতি সামগ্রিকভাবে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারাকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ, জীবনধারণের জন্য উপকরণ সংগ্রহের উপায় বা বৈষয়িক দ্রব্যাদির উৎপাদনের পদ্ধতি মানবসমাজের ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ শক্তি হিসেবে কাজ করে।
উৎপাদন পদ্ধতির গুরুত্ব:
মার্কসীয় তত্ত্ব অনুসারে, উৎপাদন পদ্ধতিই হলো সকল কিছুর মূল। এ পদ্ধতির পরিবর্তনই সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন সূচিত করে। প্রকৃতির বিভিন্ন বস্তু ও শক্তির উপর মানুষের শ্রমশক্তি প্রয়োগ করে বৈষয়িক দ্রব্য সৃষ্টি করা হয়। উৎপাদন পদ্ধতিতে প্রকৃতির সাথে মানুষের যেমন সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তেমনি মানুষের সাথেও মানুষের সম্পর্ক স্থাপিত হয়।
উৎপাদন পদ্ধতির দুটি দিক:
উৎপাদন পদ্ধতি বলতে উৎপাদনশক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের সমন্বয়কে বুঝায়। যে-কোনো নির্দিষ্ট সমাজের উৎপাদন পদ্ধতি গড়ে উঠে উৎপাদন শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্কের ভিত্তিতে। উৎপাদনশক্তি বলতে শ্রমিক ও তাঁর শ্রমশক্তি এবং আনুষঙ্গিক হাতিয়ার, যন্ত্রপাতি প্রভৃতিকে বুঝায়। আর উৎপাদন সম্পর্ক বলতে উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে মানুষের পারস্পরিক সংযোগকে বুঝায়।
উৎপাদনশক্তি:
উৎপাদনশক্তি গঠিত হয় উৎপাদনের উপায় এবং এ উৎপাদনের উপায়ে গতি সঞ্চার করার ক্ষেত্রে নিযুক্ত শ্রমের হাতিয়ার ও অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের সমন্বয়ে। উৎপাদনের উপায়ের মাধ্যমে বৈষয়িক দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদন করা হয়। আর সমাজের উৎপাদনশক্তি গঠিত হয় শ্রমের সংশ্লিষ্ট হাতিয়ার এবং বৈষয়িক সম্পদ সৃষ্টিকারী মানুষকে নিয়ে।
শ্রমের সামগ্রী বলতে সেসব বস্তুকে বুঝায়, মানুষ যার মাধ্যমে নিজের স্বার্থে প্রকৃতিকে প্রভাবিত করে ও রূপান্তরের চেষ্টা করে। শ্রমের উপকরণের উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- লোহা, কাঠ, কয়লা, হাতুড়ি, কোদাল, বেলচা, অন্যান্য আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং রাসায়নিক উপাদানসমূহ ইত্যাদি।
উৎপাদনশক্তির বিকাশের মাত্রা যদি অধিক হয়, তাহলে প্রকৃতির উপর মানুষের কর্তৃত্ব কায়েমের মাত্রাও অধিক হয় উৎপাদনশক্তিই উৎপাদনের বিকাশের ক্ষেত্রে পরিচালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
উৎপাদন সম্পর্ক:
উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত প্রস্তাবে উৎপাদন সম্পর্ককে বাল দিয়ে উৎপাদন প্রক্রিয়া সংল থাকতে পারে না। প্রকৃতিগত বিচাে উৎপাদন সম্পর্ক সবসময় এক ধরনের হয় না। উৎপাদন সম্পন সকল সমাজব্যবস্থায় অভিন্ন প্রকৃতির হয় না। মূলত উৎপাদ সম্পর্ক হলো মালিকানার সম্পর্ক। উৎপাদনের উপাদানের ব্যক্তিগত/সমগ্র সমাজের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে এক ধরনের উৎপাদন সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং দ্বিতীয়। ক্ষেত্রে অন্য ধরনের উৎপাদন সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ব্যক্তিগত মালিকানার ক্ষেত্রে বণ্টনে বৈষম্য এবং সামাজিক মালিকানার ক্ষেত্রে সমবন্টন, সমমর্যাদা ও সহযোগিতার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।
উৎপাদনশক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে সামঞ্জস্য ও বিরোধ:
উৎপাদন সম্পর্ক উৎপাদনশক্তির উপর নির্ভরশীল থাকে। উৎপাদনশক্তির পরিবর্তন ও বিকাশ ঘটলে, তখনই বা কিছুটা দেরিতে অনুরূপভাবে উৎপাদন সম্পর্কেরও পরিবর্তন ও বিকাশ ঘটে। উৎপাদনশক্তির বৈশিষ্ট্যের সাথে উৎপাদন সম্পর্ক সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকলে উৎপাদন শক্তির দ্রুত বিকাশ ও অগ্রগতি সহজে সম্ভব হয়। আবার উৎপাদনশক্তির পরিবর্তন, বিকাশ ও উন্নতি মন্থর বা অধিক দ্রুত হলেও স্বাভাবিকভাবে বিরোধের ঘটনা ঘটতে পারে। তা ছাড়া নতুন ও উন্নততর উৎপাদনশক্তির বিকাশের পথে পুরাতন ও পশ্চাৎপদ উৎপাদন সম্পর্ক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে।
উৎপাদন সম্পর্কের ঐতিহাসিক বিবরণ:
মানবসমাজের আদিম অবস্থা থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, উৎপাদনশক্তির উন্নতি ও পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে উৎপাদন সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি ও পরিবর্তন ঘটে। যেমন আদিম সাম্যবাদী সমাজে সকলে একত্রে পরিশ্রম করতো এবং জীবিকার ব্যবস্থা করতো। সমগ্র সমাজই ছিল উৎপাদনের উপাদানসমূহের মালিক। উৎপাদনের উপকরণের উপর কোনো ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ধারাসমূহ পরিলক্ষিত হয়-
(১) দাস সমাজ: ব্যবসায় সমগ্র সমাজের মালিকানার পরিবর্তে ব্যক্তিগত মালিকানা কায়েম হয়। উৎপাদনে শ্রমবিভাগের সৃষ্টি হয় এবং শ্রেণিভেদ ও শ্রেণি শোষণের সূত্রপাত হয়। দাস মালিকরাই ছিল উৎপাদনের উপকরণ এবং দাসদের মালিক।
(২) সামন্ত সমাজ: সমাজব্যবস্থায় উৎপাদনের উপকরণগুলোর মালিক হন সামন্ত প্রভুরা। আর উৎপাদনে নিযুক্ত শ্রমিকরা হলো ভূমিদাস। এগুলো ছিল এ সময়কার উৎপাদন সম্পর্ক।
(৩) পুঁজিবাদী সমাজ: সমাজব্যবস্থায় উৎপাদনের যাবতীয় উপকরণের মালিক হলো পুঁজিপতি শ্রেণি। আর শ্রমিকদের জীবনধারণের জন্য পুঁজিপতিদের কাছে শ্রমশক্তি বিক্রয় করতে হয়। পুঁজিবাদী উৎপাদন যাবস্থায় উৎপাদনশক্তির অভাবনীয় উন্নতি ও বিকাশ ঘটে।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় সামাজিক বিবর্তনের রহস্য জানার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আর কার্ল মার্কস সামাজিক পরিবর্তনের/ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দর ও নিখুঁতভাবে সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন সমালোচকরা মার্ক্স-এর ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে সমালোচনা করার জন্য তাদের নিজেদের মত ব্যাখ্যা করেছেন। তাই বলা যায়, ঐতিহাসিক বস্তুবাদের বিরূদ্ধে সমালোচনার অধিকাংশই এক দোষে দুষ্ট।
