পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা
ভূমিকা: সমগ্র মধ্যযুগ ধরে ইউরোপসহ সমগ্র বিশ্বে সামন্তবাদ বিরাজ করেছে। সামন্তবাদের পতনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। প্রায় সমগ্র পৃথিবী জুড়ে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার প্রচলন ঘটে। একথা সর্বজনস্বীকৃত যে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক উভয় ব্যবস্থা আজকের বিশ্বে কমবেশি বিদ্যমান। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রবাদ সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। দুটি রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক সমাজব্যবস্থা। বিভিন্ন দিক থেকে এদের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করা যায়। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সম্পদে ব্যক্তিমালিকানার স্বীকৃতি থাকলেও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে ব্যাক্তিমালিকানায় স্থান নেই।
পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য:
বর্তমান শতাব্দীতে সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ বহুল আলোচিত শব্দ। এই দুটি তত্ত্বের ক্ষেত্রে বেশকিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো-
১. সংজ্ঞাগত পার্থক্য:
সাধারণভাবে পুঁজিবাদ বলতে এমন এক অবস্থাতে বুঝায়, যেখানে উৎপাদনের উপকরণসমূহ ব্যক্তিগত মালিকানাধীনে থাকে এবং অগাধ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে একচেটিয়া মুনাফা অর্জনের সুযোগ থাকে। আর সমাজতন্ত্র বলতে এমন এক সমাজব্যবস্থাকে বুঝায়, যেখানে শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং উৎপাদনের উপকরণসমূহ সমাজের সার্বিক কল্যাণের নিমিত্তে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীনে থাকে।
২. সম্পদের মালিকানা:
পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় সম্পদের মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে না থেকে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। উৎপাদন উপাদানগুলোর উপর রাষ্ট্রের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কিন্তু, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সম্পদের সামগ্রিকভাবে মালিকানা রাষ্ট্র বা সমাজের উপর বর্তায়। এক্ষেত্রে উৎপাদনের উপকরণের উপর রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক বিদ্যমান এবং তা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা রাষ্ট্র করে থাকে।
৩. অবাধ প্রতিযোগিতা:
পুঁজিবাদে অবাধ প্রতিযোগিতাকে জাতীয় সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে সহায়ক শক্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। সমাজতন্ত্রে অবাধ প্রতিযোগিতার নীতিকে সমর্থন করে না। অবাধ প্রতিযোগিতা কেবল সমপর্যায়ভুক্ত ব্যক্তির মধ্যে চলতে পারে।
৪. রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ:
পুঁজিবাদ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে সমর্থন করে না উৎপাদনের সকল ক্ষেত্রে ব্যক্তির প্রাধান্যকে গুরুত্ব দেয়া হয়। সমাজতন্ত্র অনুসারে ব্যক্তির কল্যাণ সাধনের জন্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ একান্ত কাম্য। তাই শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নীতিতে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রভাব স্পষ্ট
৫. জাতীয় আয় বণ্টন:
পুঁজিবাদে সম্পত্তির আযের সাথে বন্টনের ক্ষেত্রে যোগ্যতার নীতি অনুসরণ করা হয় না। কিন্তু, সমাজতন্ত্রে সম্পত্তির আয়ের সাথে বন্টনের ক্ষেত্রে যোগ্যতার নীতি অনুসরণ করা হয়। অর্জিত আয় প্রত্যেককে তার যোগ্যতা অনুযায়ী বণ্টন করা হয়। এক্ষেত্র মৌলিক অধিকার ও প্রয়োজনের বিষয়টির উপর সর্বাধিদ্ধ গুরুত্বারোপ করা হয়।
৬. শ্রেণিহীন সমাজ:
পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা মূলত শ্রেণিভিত্তিক। কারণ পুঁজির সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে সমাজে ব্যক্তি। অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু, সমাজতন্ত্রে বৈষম্য হ্রাসের লক্ষে শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা মত দেয়া হয়। পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে অবস্থান করে শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করা হয়।
৭. মূল্য ব্যবস্থা:
পুঁজিবাদে পুঁজির দ্বারাই মূল্য ব্যবস্থা নির্ধারিত। সমাজতন্ত্রে উৎপাদন, বণ্টন, বিনিয়োগ বণ্টন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে মূল্য ব্যবস্থা রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত এক্ষেত্রে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
৮. একক কর্তৃত্ব:
পুঁজিবাদে গণতন্ত্রকে সমর্থন করা হয় বড় একক কর্তৃত্বের ধারণাটিকে প্রতিহত করা হয়। সমাজতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো এক কর্তৃত্ব কায়েম করা। এক্ষেত্রে বহু দল, বহু মতকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
৯. উৎপাদন কৌশল গোপন রাখার ক্ষেত্রে
ধনতান্ত্রিক সমাজে নয়া প্রযুক্তির আবিষ্কার ঘটলেও ধনীরা ব্যক্তিগত লাভের জন্য সেটা গোপন রাখে। অপরদিকে, সমাজতন্ত্রে ব্যক্তিগত মালিকানা অনুপস্থিত থাকায় উৎপাদকের ভেতর হীন প্রতিযোগিতা নেই। কাজেই উৎপাদন কৌশল গোপন রাখারও কোনো কারণ নেই। এ কারণে সমাজতান্ত্রিক সমাজে কারিগরি ও প্রযুক্তিবিদ্যা দ্রুত বিকাশ ঘটে।
১০. ভোক্তাদের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে
পুঁজিবাদে উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা থাকে। একই জিনিস বিভিন্ন মানের উৎপাদি হয়। ক্রেতা তার পছন্দমতো যে-কোনটি ক্রয় করতে পারে অন্যদিকে, সমাজতন্ত্রে ক্রেতাদের কোনো স্বাধীনতা থাকে না। তাদের পছন্দ অপছন্দের কোনো মূল্য দেওয়া হয় না। সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীনে যা উৎপাদন করা হয়, ক্রেতাকে তা কিনতে হয়।
১১. পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে:
ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদ অর্থনীতিতে কোনো দ্রব্য কতটুকু উৎপাদন হবে এবং কীভাবে উৎপাদন হবে এসব বিষয় নির্ধারিত হয় একটি স্বয়ংক্রিয় যা পদ্ধতির মাধ্যমে। অপরদিকে, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে যাবয়ী অর্থনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় পরিবক্ত থাকে, তারাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।
১২. শ্রমিকদের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে:
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমিকদের শোষণ করা হয়। তাদেরকে ন্যায্য পাওনা হতে বঞ্চিত করা হয়। অপরদিকে, সমাজতন্ত্রে প্রত্যেকেই তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পারিশ্রমিক পায়।
১৩. স্বাধীনতার ক্ষেত্রে:
ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থায় ধনসম্পদ অর্জনের জন্য ব্যক্তিকে অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হয়। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সবার স্বার্থে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার কোনো মূল্য দেওয়া হয় না।
১৪. অপচয় রোধগত পার্থক্য:
পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উৎপাদকগণ ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। যার ফলে বিজ্ঞাপন বা প্রচারে প্রচুর অর্থ খরচ হয়। পক্ষান্তরে, সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় মালিকানায় উৎপাদন হয় বিধায় এখানে বিজ্ঞাপন বা প্রচারে তেমন অর্থ অপচয় হয় না।
১৫. মুনাফার্জনে পার্থক্য:
পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় মুনাফা অর্জনই উৎপাদনকার্যের মূল উদ্দেশ্য। এখানে ধনি শ্রেনি বা পুঁজিপতিদের স্বার্থেই উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু থাকে। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মুনাফার কোনো স্থান নেই। সামাজিক প্রয়োজন মিটানোর লক্ষ্যে উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়।
১৬. শ্রেণির অস্তিত্বগত পার্থক্য:
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রেণির অস্তিত্ব বিদ্যমান। মার্কসের মতে, এ ব্যবস্থায় শ্রমিক ও মালিকের অস্তিত্ব বিদ্যমান। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কোনো শ্রেণির অস্তিত্ব লক্ষ করা যায় না। এখানে আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান।
১৭. কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে পার্থক্য:
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সমাজের সম্পদ এক শ্রেণির পুঁজিপতিদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। পুঁজিপতিরা অবাধে শ্রমিকদের শোষণ করে। সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় উৎপাদনের উপকরণগুলোর উপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৮. শিল্পায়নের উদ্দেশ্য:
পুঁজিবাদে উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধিত হয়। প্রায় সকল ধরনের উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে মুনাফা লাভের জন্য ব্যাপক শিল্পায়ন করা হয়। পক্ষান্তরে, সমাজতন্ত্রে শ্রমজীবী মানুষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের মাধ্যমে বৃহদায়তন শিল্পের প্রসার ঘটায়।
১৯. সর্বহারা একনায়কত্ব:
পুঁজিবাদে রাষ্ট্রতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে থাকে এবং তারা রাষ্ট্রীয় আইন, রীতিনীতি প্রভৃতি নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে তৈরি করে। আর সমাজতন্ত্রে বুর্জোয়া বা শোষক শ্রেণিকে উৎখাত করে সর্বহারা বা শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
২০. শ্রেণি বৈষম্য:
পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় শ্রেণিবৈষম্য প্রকট রূপ লাভ করে। এ সমাজের প্রধান দুটি শ্রেণি হলো পুঁজিপতি ও শ্রমিক তথা বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত। এ ছাড়া বিদ্যমান থাকে উঠতি পুঁজিপতি, মধ্যবিত্ত কৃষকসহ অন্যান্য শ্রেণি। পক্ষান্তরে, সমাজতন্ত্রে শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হয়।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের বহুবিধ পার্থক্য বিদ্যমান থাকলেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এর দুটি মতাদর্শের মধ্যে ভিন্নতা লক্ষ করা হয়। আবার পুঁজিবাদ মূলত বলা যায়, দুটি ভাল্লর মধ্যে অর্থনৈতিক পার্থক্য পরস্পরবিরোধী মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
