কার্ল মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মৌলনীতিসমূহ
ভূমিকা: মার্কসবাদ যে-সব তাত্ত্বিক ভিত্তির উপর দণ্ডায়মান, তার মধ্যে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অন্যতম। মার্কস তার ঐ তত্ত্বটি দাঁড় করিয়েছেন German classical philosophy কে উৎস করে। পুঁজিবাদের প্রেক্ষাপটে শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটলে পুঁজিপতিদের সাথে শ্রমিক শ্রেণির দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। এ কারণে মার্কস শ্রমিক শ্রেণিকে সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে একটি বৈজ্ঞানিক প্রত্যয় ও একটি শুদ্ধ বৈপ্লবিক তত্ত্বের অবতারণা করেন। এ তত্ত্বই হলো 'ঐতিহাসিক বস্তুবাদ'। মার্কস তার এই তত্ত্বটি সমাজ বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।
মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মৌলনীতি:
ঐতিহাসিক বস্তুবাদ হলো মানবসমাজের উদ্ভব, বিকাশ ও তার বৈপ্লবিক রূপান্তরের সাধারণ বিধিসমূহের উপলব্ধি, অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে দ্ব্যমূলক বস্তুবাদের মূলনীতিসমূহের প্রয়োগপত্র। অন্যভাবে বলা যায়, মানবসমাজের ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি আলোচনার ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী তত্ত্বের প্রয়োগকেই বলা হয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদ।
ঐতিহাসিক বস্তুবাদের কতিপয় মৌলনীতি রয়েছে। নিম্নে এ সকল মৌলনীতি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
(i) সমাজ মানুষের তৈরি, অতিপ্রাকৃত ঘটনা বা ভগবানের সৃষ্ট নয়:
বাস্তব অস্তিত্বকে জিইয়ে রাখার জন্য ব্যক্তি নানা প্রকার উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হয়। বেঁচে থাকার জন্য আহার, বাসস্থান, বস্তু ইত্যাদি তাকে জোগাড় করতেই হবে এবং এগুলোর জন্য উৎপাদন যে আবশ্যক, তা ব্যক্তি মানে এবং এ কারণে সে উৎপাদন কাজে নিযুক্ত হয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তির একার পক্ষে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। অন্যদের সঙ্গে তাই তাকে বহুবিধ সম্পর্কে যুক্ত হতে হয়। এভাবে সংঘবদ্ধতা বা সমাজবদ্ধতার আবির্ভাব ঘটে। ব্যক্তি নিজের প্রয়োজনে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করল। আর এভাবে তৈরি হলো সমাজের অর্থনীতিক ভিত্তি। এ প্রসঙ্গে লেনিন বলেন, "সমস্ত প্রজ্ঞার উৎপাদন সম্পর্ক এক জায়গায় পুঞ্জীভূত হয়ে তৈরি হলো অর্থনীতিক গঠন। এটাই মানুষের তৈরি, যা ভগবান বা অলৌকিক কোনো শক্তি গড়ে তোলে নি।
(ii) শ্রম, উৎপাদন ও সচেতনতা:
প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলেও উৎপাদনের প্রয়োজনে মানুষের শ্রম অপরিহার্য। কারণ শ্রম ব্যতীত মানুষ কোনো কিছুই উৎপাদন করতে পারেনা। প্রাণীর শ্রম করার ক্ষমতা থাকলেও সে প্রকৃতিকে তার নিয়ন্ত্রণাধীন করতে পারে না। আর এখানেই মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। অর্থাৎ, মানুষ যে কাজই করুক না কেন তা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে সচেতনতার সাথে সে করে থাকে। তাই সচেতনতা মানুষের সমাজ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয় এবং অন্যান্য প্রার্থী থেকে মানুষকে পৃথক করে। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, সামাজিক অস্তিত্ব ও সামাজিক সচেতনতার মধ্যে একটা সেতুবন্ধন তৈরি করে। মানুষ সচেতনভাবে শ্রম প্রয়োগ ভাত সমাজের ভিত্তি অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্ক এবং একই সঙ্গে উপরিকাঠামো ও গড়ে তোলে। তাই বলা যায়, সচেতন প্রথই সমাজ গঠনের ভিত্তি। কেবল শ্রমটাই বড় কথা নয়, বরং সচেতন শ্রম হলো আসল যা মানুষের রয়েছে।
(iii) সামাজিক সচেতনতা ও সামাজিক অস্তিত্ব:
মানুষের সচেতনতা কথা Human consciousness প্রকৃতি থেকে উদ্বৃত। মানুষের সচেতনতা সম্পর্কে ফায়কবাকের এ ধারণাই সচেতনতাকে সর্বপ্রথম জড়বাদের উপর প্রতিষ্ঠা করেছিল। কার্ল মার্কস, সচেতনতা সম্পর্কে ফয়েরবাকের এ মূলনীতিটি গ্রহণ করে সচেতনতাকে আরো বিজ্ঞানসম্মত করে তোলেন। নির্দিষ্ট সামাজিক সুসম্পর্কের কাঠামোর মধ্যেই সচেতনতা তৈত্তি হয়। আর নির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্ক আসে সামাজিক অস্তিত্ব থেকে। আর সামাজিক অস্তিত্ব থেকে জন্ম নেয় সামাজিক সচেতনতা। মূলত সামাজিক অস্তিত্ব মুখ্য ও সামাজিক সচেতনতা গৌণ। সামাজিক অস্তিত্বই সামাজিক সচেতনতা নির্ধারণ করে। সামাজিক অস্তিত্ব না থাকলে সামাজিক সচেতনতা আসতে পারে না।
(iv) মানুষের শ্রম সৃজনশীল
অনন্ত সত্তা বা পরলোকের সন্ধানের জন্য মানুষ তার শ্রম বিনিয়োগ করে না, বরং প্রতিকূল পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের প্রয়োজন মেটাবার জন্য সচেতনভাবেই মানুষ তার শ্রম ও শক্তি ব্যয় করে। ঐতিহাসিক বস্তুবাদে এজন্যই মানুষের শ্রমকে সৃজনশীল বলে আখ্যা দেয়া হয়। তাই বলা যায়, সৃজনশীল শ্রমের সাহায্যেই মানুষ সমাজব্যবস্থার রূপান্তর ঘটায়। তাই মানুষের সচেতন ক্রিয়াকর্ম, যার অভিব্যক্তি ঘটছে সৃজনশীলতায় সেটিই সমাজের ( পরিচালিকাশক্তি। তাই বলা যায়, মানুষের শ্রম সচেতনতার সাথে গ্রযুক্ত এবং এর ফলে সেটা হয়ে উঠে সৃজনশীল। এ কারণে সমাজ বিকাশের জন্যও দায়ী হলো এই সৃজনশীল শ্রম।
(v) উৎপাদন ব্যবস্থা:
সামাজিক অস্তিত্ব ও সামাজিক সচেতনতার মধ্যই ঐতিহাসিক বস্তুবাদের তৃতীয় সূত্র বা নীতির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিহিত। যেহেতু মানুষ অনন্ত সত্তা, যা পরলোকের সন্ধানে ধাবমান নয়, সেহেতু সে নিজের বাস্তব অস্তিত্বকে টিকিয়ে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করার কাজে ব্যাপৃত থাকে। তাই সে সৃজনশীল শ্রমকে উৎপাদনের কাজে বিনিয়োগ করে। নিজের শ্রম ছাড়া সঞ্চিত শ্রমও উৎপাদনের কাজে নিযুক্ত, সঞ্চিত শ্রম হলো উৎপাদনের কাজে নিযুক্ত নানা প্রকার যন্ত্রপাতি বা হাতিয়ার। আর অতীতে আবিষ্কৃত বৈজ্ঞানিক কলাকৌশল, সবকিছুই মিলে তৈরি হয় উৎপাদিকাশক্তি। মার্কস ও এঙ্গেলস বলেন যে, উৎপাদনের জন্য উৎপাদিকাশক্তিও উৎপাদন সম্পর্ক নামে পরিচিত। উৎপাদিকাশক্তি ও উৎপাদন সম্পার্কের মধ্যে যে মিখক্রিয়া, তার ফলেই সমাজের অগ্রগতি সাধিত হয়।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মৌলিক নীতিসমূহ যেমন উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্ব মানব সভ্যতার অগ্রগতির প্রকৃত চালিকাশক্তি। এই নীতিগুলোই সমাজ বিবর্তনের প্রতিটি পর্যায়কে (আদিম সাম্যবাদ থেকে সমাজতন্ত্র) বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করতে এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে একটি পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক রূপ দিতে সর্বাধিক সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
