আদিম সাম্যবাদী সমাজের বৈশিষ্ট্য এবং আদিম সাম্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের মধ্য পার্থক্যসমূহ

আদিম সাম্যবাদী সমাজের বৈশিষ্ট্য এবং আদিম সাম্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের মধ্য পার্থক্যসমূহ

উত্তর: মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কার্ল মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ একটি অনন্য মাত্রা যোগ করে। মানুষের অগ্রযাত্রার প্রথম ধাপ হলো আদিম সাম্যবাদী সমাজ। এই পর্যায়টি ছিল সভ্যতার শৈশব, যেখানে মানুষের আদি ভিত্তিভূমি রচিত হয়েছিল। আজ আমরা বিস্তারিতভাবে জানবো আদিম সাম্যবাদী সমাজের বৈশিষ্ট্য এবং পরবর্তীকালে বিকশিত সামন্ততন্ত্রের সাথে এর মূল পার্থক্যগুলো।

আদিম সাম্যবাদী সমাজের বৈশিষ্ট্য এবং আদিম সাম্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের মধ্য পার্থক্য

আদিম সাম্যবাদী সমাজ

মানুষের আবির্ভাবের প্রাথমিক পর্যায়কে আদিম সাম্যবাদী সমাজ বলা হয়। জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্কস (Karl Marx) এর মতে, এটি ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম এবং শোষণহীন একটি সমাজব্যবস্থা। এখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির কোনো অস্তিত্ব ছিল না এবং সমাজের প্রতিটি সদস্য সমান অধিকার ভোগ করত। প্রকৃতিই ছিল তাদের প্রধান নিয়ন্ত্রক।

আদিম সাম্যবাদী সমাজের বৈশিষ্ট্য

কার্ল Max-এর মতে, আদিম সাম্যবাদী সমাজ ছিল শোষণহীন সমাজ। এ সময় মানুষ প্রকৃতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। নিম্নে এর বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরা হলো।

১. খাদ্য সংগ্রহকারী:

আদিম সাম্যবাদী সমাজের মানুষ খাদ্য সংগ্রহের জন্য হন্য হয়ে দুর্গম পথ অতিক্রম করতো। তারা ফলমূল সংগ্রহ, মৎস্য ও পশু শিকারের জন্য বের হতো। সংগৃহীত খাদ্য সকলে মিলে ভোগ করতো। তারা খাদ্য উৎপাদন করতে পারতো না।

২. শ্রেণিহীন সমাজ

বাক্তিগত সম্পত্তির না থাকার কারণে আদিম সাম্যবাদী সমাজ ছিল শ্রেণিহীন। শ্রেণিহীন সমাজব্যবস্থা বিরাজ করার কারণে সেখানে শ্রেণিবৈষম্য ছিল না, ফলে শ্রেণিদ্বন্দ্বও ছিল না।

৩. সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানার অনুপস্থিতি

আদিম সাম্যবাদী সমাজে কোনো ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না। সকলে সকল সম্পত্তিতে সমান অধিকার ভোগ করতো। ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা সেখানে অনুপস্থিত ছিল।

৪. সমতা

খাদ্য সংগ্রহ ও খাদ্য বণ্টন সকল ক্ষেত্রে সমাজে সমতার নীতি অনুসরণ করা হতো। তারা খাদ্যের সন্ধান পেলে ভূরিভোজে অংশগ্রহণ করতো। কখনু কখনও খাদ্য না পেলে উপোস থাকতে হতো। এ প্রসঙ্গে বলা হয়, "Life was either feast of a fast."

৫. যৌথ পরিবার

এ সময়ে যৌথ সম্পত্তির ন্যায় দলগত বিবাহভিত্তিক যৌথ পরিবার ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। Morgan-এর পরিবারের উৎপত্তিকে মার্ক্স সমর্থন দিয়ে বলেছেন, এ সময়ে Consanguine ও Punaluan পরিবার ব্যবস্থা ছিল। পরিবার যখন Moanoganvian Family (ত রূপ নিল তখনই উদ্ভব হলো ব্যক্তিগত মালিকানা।

আদিম সাম্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য

কার্ল মার্কসের সমাজব্যবস্থার বর্ণনায় যে পাঁচটি সমাজব্যবস্থার নাম পাওয়া যায় তার মধ্যে প্রথম পর্যায় হলো আদিম সাম্যবাদ। আদিম সাম্যবাদ বলতে মার্কস সেই সমাজব্যবস্থাকে বুঝিয়েছেন, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা ছিল না। ছিলো না কোনো শ্রেণিদ্বন্দ্ব ও শ্রেণিসংঘাত। মানুষ কৃষির আবিষ্কারের ফলে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণার উদ্ভব ঘটে। শুরু হয় মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা সেখান থেকে দাস সমাজ, সামন্তসমাজ হয়ে মানুষ পুঁজিবাদী সমাজে পদার্পণ করে। যেখানে মানুষে মানুষে চরম বৈষম্য সর্বক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। সেই বৈষম্যমূলক অবস্থার অবসানে সফলের মধ্যে সমতা আনয়নের লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত হয় সমাজতান্ত্রিক সমাজ।

নিম্নে আদিম সাম্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করা হলো-

১. মানব সভ্যতার শুরুতে যে সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল তার প্রধান ভিত্তি ছিল সাম্যবাদ। পক্ষান্তরে, দাস সমাজের দাসদের বিদ্রোহের ফলে ভূমিভিত্তিক যে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠে তাই হলো সামন্ততন্ত্র।

২. আদিম সাম্যবাদমূলক সমাজে ভূমি মালিকানা বলতে কিছুই ছিল না। সকলে প্রকৃতিতে বাস করত এবং যে যার চাহিদা মতো প্রকৃতি থেকে খাদ্য সংগ্রহ করত।

৩. আদিম সাম্যবাদ ছিল শ্রেণিহীন পক্ষান্তরে, সামন্ততন্ত্রে ভূমিকে কেন্দ্র করে অনেক শ্রেণির উদ্ভব হয়, যেমন- রাজা, সামস্ত প্রভু, শ্রমিক শ্রেণি।

৪. আদিম সাম্যবাদে শ্রেণিবৈষম্য ছিল না। পক্ষান্তরে, সামন্ততন্ত্রে যাজক শ্রেণি, অভিজাত শ্রেণি, তৃতীয় শ্রেণির জন্ম নেয়া এবং শ্রেণি বৈষম্য লক্ষ করা যায়।

৫. আদিম সাম্যবাদে কোনো প্রশাসনিক শাসনব্যবস্থা ছিল না, সমাজতন্ত্রে একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা লক্ষ করা যায়।

৬. আদিম সাম্যবাদে যেহেতু কোনো প্রশাসন ছিল না, সকলে মিলে যৌথভাবে শিকার বা খাদ্যসংগ্রহ করতো কাজেই সেখানে কাউকে কর দেওয়ার কোনো রীতি বা প্রয়োজনীয়তা ছিল না, অন্যদিকে, সামন্ততন্ত্রে কৃষকদের বিভিন্ন কর বা নজরানা দিতে হতো।

৭. আদিম সাম্যবাদে মানুষের জীবন ছিল স্বাধীন অন্যদিকে, সামন্ততন্ত্রে শ্রমিক শ্রেণি ভূমিনাসে পরিণত হয় এবং তারা সামন্ত প্রভুদের দাসে পরিণত হয়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, আদিম সাম্যবাদ ও সামন্ততন্ত্র দুটো দুই মেরুতে অবস্থিত দুটি প্রতায়। আর প্রত্যয় দুটি মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। কারণ আদিম সাম্যবাদে ছিল পুরোপরি শ্রেণিহীন ব্যবস্থা আর সামন্ততন্ত্রে ছিল তার বিপরীত শ্রেণিমূলক এক সমাজব্যবস্থা।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন