সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় কার্ল মার্কসের বিচ্ছিন্নতাবোধ তত্ত্বের গুরুত্ব
ভূমিকা: সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় 'বিচ্ছিন্নতাবোধ' প্রত্যয়টির ব্যবহার অনেক পুরানো এবং অনেক বহুমাত্রিক। সময়ের সাথে সাথে আধুনিক সময়ের প্রেক্ষিতে এই প্রত্যয়ের গুরুত্ব আরও বাড়ছে।
সমাজবিজ্ঞানে মার্কসের 'বিচ্ছিন্নতাবোধ' তত্ত্বের গুরুত্ব:
নিচে সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় কার্ল মার্কসের বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রত্যয়ের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো-
১. উৎপাদন সম্পর্কের আলোচনা
সমাজবিজ্ঞানের উৎপাদন সম্পর্ক বিষয়ক আলোচনায় 'বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রত্যয়টি সব থেকে বেশি আলোচিত হয়। উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে আধিপত্যশীলতা কীভাবে ব্যক্তির মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি করে তা এখানে আলোচিত হয়।
২. সামাজিক মূল্যবোধ ব্যাখ্যা
সমাজের মূল্যবোধ, ঐতিহ্য প্রকৃতি বিষয়গুলো সামগ্রিক সামাজিক জীবনে যদি সঠিকভাবে অন্তবিষ্ট হয় তা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য সামাজিক মূল্যবোধ বিষয়ক আলোচনায় বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রত্যয়টি এখানে আলোচিত হয়।
৩. সামাজিক সংহতি ব্যাখ্যা
সমাজের গোষ্ঠীবদ্ধতার প্রক্রিয়া ভেঙে গেলে তা সামাজিক সংহতি নষ্ট করে ফেলে এবং অনেক বিচ্ছিন্ন সামাজিক ব্যক্তির উদ্ভব হয়। কীভাবে এই বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় তা বোঝার জন্য সামাজিক সংহতি বিষয়ক আলোচনায় বিচ্ছিন্নতাবাদ প্রত্যয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪. আত্মহত্যা বিষয়ক আলোচনা
সমাজতাত্ত্বিক ডুর্খেইম তার আত্মহত্যা বিষয়ক আলোচনায় দেখিয়েছেন কীভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আত্মহত্যা প্রবণতা তৈরি করে। অনেক সমাজতাত্ত্বিক দেখান যে, ডুর্থেইমের anomic আমলে পরবর্তী সময়ের বিচ্ছিন্নতাবাদ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
৫. সমাজ মনস্তত্ত্ব আলোচনা
সমাজ মনস্তত্ত্ব বিষয়ক আলোচনায় 'বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রত্যয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়। সমাজের সদস্যদের সমরূপ মনস্তত্ত্ব-এর বিকাশ ঘটে সমাজের প্রেক্ষিতে। এটা মনে হলেও অনেক সমাজে ব্যক্তিক ভিন্নতাগুলো নতুন সামাজিক প্রকরণ তৈরি করে। এই বিষয়গুলো ব্যাখ্যায় বিচ্ছিন্নতাবাদ প্রত্যয়টি সমাজ মনস্তত্ব বিষয়ক আলোচনায় অত্যন্ত গ্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ।
৬. সামাজিক গতিশীলতা অধ্যয়ন
সামাজিক গতিশীলতার কারণে সমাজের বাক্তি মানুষের সামাজিক পরিস্থিতি উত্থান বা পতন হয়। এই নতুন পরিস্থিতিতে সে সমাজের অন্য সদস্যদের গ্রেক্ষিতে এক ধরনের আপেক্ষিক বিচ্ছিন্নভ্যবোধে আক্রান্ত হতে পারে। এভাবে গতিশীলতা এবং বিচ্ছিন্নকরণ এবং বিচ্ছিন্নতাবোধ এই বিষয়গুলোর পারস্পরিকতা বোঝার জন্য 'বিচ্ছিন্নতাবাদ' প্রত্যয়টির আলোচনা এখানে দরকার।
৭. সামাজিক অভিযোজন ব্যাখ্যা
সমাজের কোনো ব্যক্তি যদি সামগ্রিক অভিযোজন প্রক্রিয়ায় নিজেকে আত্মস্থ না করতে পারেন তাহলে তার মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি হবে। এই বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি অভিযোজনের নতুন পন্থায় প্রবেশ করতে পারেন, অথবা আরও বেশি বিচ্ছিন্ন হতে হতে সামাজিক অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলতে পারেন। এই বিষয়গুলো ব্যাখ্যার জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদ বিষয়ক আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৮. নিরপেক্ষ বিচ্ছিন্নতাবোধ ব্যাখ্যা
যদি কোনো পরিস্থিতিতে কোনো ব্যক্তি এবং অন্যকোনো প্রক্রিয়ার সাপেক্ষে বিচ্ছিন্নতাবোধ করলেও যদি বাক্তির মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধের অনুভূতি তৈরি হয়, তাকে বস্তুনিরপেক্ষ বিচ্ছিন্নতাবোধ বলা হয়। এই বস্তুনিরপেক্ষ বিচ্ছিন্নতাবোধে আক্রান্ত ব্যাক্তি কীভাবে সমাজে আপ্ত হন বা আপ্ত হতে পারেন তা সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
৯. সামাজিকীকরণ ব্যাখ্যা
সামাজিকভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি সমাজের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করতে পারেন না বা পারলেও সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মূল বিষয়গুলো তার মধ্যে প্রবেশ করে না। ফলে তার কাছে সামাজিকীকরণ ব্যর্থ হয়ে যায়। সামাজিকীকরণ বিষয়ক আলোচনায় বিচ্ছিন্নতাবাদ বা বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রত্যয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
১০. বিচ্যুতি ও অপরাধ ব্যাখ্যা
সমাজের বিচ্যুতি এবং অপরাধ ব্যাখ্যায় বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রত্যয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক বিচ্ছিন্নভাবোধ হতেই ব্যক্তির মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বিকশিত হয়। অপরাধ প্রবণতার জন্য ব্যক্তিকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধের শিকার হতে হয়। তা আলোচনায় সমাজবিজ্ঞানের অপরাধ বিষয়ক আলোচনায় বিচ্ছিন্নতাবোধের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
১১. সামাজিক পুনর্বাসন আলোচনা
সমাজের মানুষগুলোর জন্য আলাদা অর্পিত সামাজিক পুনর্বাসন ব্যবস্থা করতে হবে এবং কী ধরনের পুনর্বাসন ব্যবস্থা করতে হবে, কোন প্রেক্ষিতে করতে হবে তা বোঝার জন্য 'বিচ্ছিন্নতাবোধ' বিষয়ক আলোচনা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
১২. দারিদ্র্য বিষয়ক আলোচনা
দারিদ্র্য বিষয়ক আলোচনায় বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রত্যয়টি সবসময়ই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্র ব্যক্তি তার দারিদ্রোর জন্য সমাজ হতে বিচ্ছিন্ন হতে পারেন যেমন, তেমনই সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হবার পরেও কেউ দারিদ্র্যে পতিত হাতে পারেন। এভাবে দারিদ্র এবং বিচ্ছিন্নতাবোধের পারস্পরিকতার বিভিন্ন বিশ্লেষণগুলো সমাজবিজ্ঞানের আলেচনায় সব সময় গুরুত্বপূর্ণ।
১৩. উপসংস্কৃতি বিষয়ক আলোচনা
সমাজে এক বা একাধিক উপসংস্কৃতির অস্তিত্ব থাকলে এসব উপসংস্কৃতির সদস্যদের সাথে সমাজের মূল ধারার অংশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা অনেক সময়ে উপসংস্কৃতির সদস্যদের মধ্যে একটি বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি করে। উপসংস্কৃতি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার পারস্পরিকতা অধ্যয়ন সমসাময়িক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়।
১৪. রাজনৈতিক বিবর্তন ব্যাখ্যা
সমাজের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের ফলে অনেক সময়ে একটি রাজনৈতিক পর্যায়ের অংশরা পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে আবির্ভূত হন, তারা নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করতে পারেন না। ফলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ব্যাখ্যা না করা হলে সমাজবিজ্ঞান রাজনৈতিক বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে পারে না।
১৫. জেন্ডার সম্পর্ক অধ্যয়ন
সমাজে জেন্ডার পরিস্থিতি অধ্যয়নে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার আলোচনা সব সময়ে প্রাসঙ্গিক। কারণ সমাজে বিভিন্ন অবনমনের মাধ্যমে নারীকে সমাজে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। এভাবে জেন্ডার সম্পর্কের মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অধ্যয়ান করার জন্য সমাজবিজ্ঞানে বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রত্যয় যুক্ত করা হয়।
১৬. বিশ্বায়ন আলোচনা
বিশ্বায়নের ফলে পৃথিবীর প্রতিটি সমাজ এখন দ্রুত পরিবর্তনশীল। প্রতিনিয়ত এই পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সমাজে নতুন নতুন পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতায় প্রেক্ষাপট এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন নতুন নতুন সামাজিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটেছে। ফলে বিশ্বায়ন প্রসারিত হবার সাথে সাথে নতুনভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অধ্যয়নের প্রেক্ষাপটও এখানে যুক্ত হচ্ছে।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার পরিশেষে বলা যায় যে, সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় বিচ্ছিন্নত। একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আলোচনার এ পর্বে বিভিন্ন পর্যায়ে বিচ্ছিন্নতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সমাজকে কেন্দ্র করেই বিচ্ছিন্নতা আবর্তিত হয়। কেননা সকল মানুষ সমাজকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। কাজেই বলা যায় যে, বিচ্ছিন্নতা তত্ত্বটি সমাজবিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
