দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের উৎপত্তি ও প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা কর

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের উৎপত্তি ও প্রকৃতি আলোচনা

ভূমিকা: মননশীল জার্মান দার্শনিক, সমাজ চিন্তাবিদ বৈজ্ঞানিক, সমাজতন্ত্রের প্রবকা কার্ল মার্কস শোষিত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষদের মুক্তির জন্য নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নির্মাণের মাধ্যমে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছেন। তার অনেক ভাবধারা এবং তত্ত্ব মানবজাতির চিন্তার জগতকে সমৃদ্ধ করেছে। এসব তত্ত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গই হলো 'দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ', যার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে মার্কসীয় দর্শন।

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের উৎপত্তি ও প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ উৎপত্তি:

সাম্যবাদের দর্শন হিসেবে স্বীকৃত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের কল্প সমাজতত্ত্বের ক্ষেত্রে কার্ল মার্কসের একটি বিশেষ অবদান হিসেবে বিবেচিত। কেননা, তার এ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের তত্ত্বাই তার সমগ্র দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। কার্ল মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের কড় হেগেন্সীয় দ্বন্দ্ববাদের উপর ভিত্তি করে বিকশিত হলেও, তা হেগেলীয় দ্বন্দ্ববাদের তত্ত্ব থেকে পৃথক। এ প্রেক্ষাপটে নিম্নে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের উৎপত্তি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-সাম্যবাদের দর্শন হিসেবে স্বীকৃত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের তত্ত্ব সমাজতত্ত্বের ক্ষেত্রে কার্ল মার্কসের একটি বিশেষ অবদান হিসেবে বিষেচিত। কেননা তার এ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের ততই তার সমগ্র মর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। কার্ল মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের তত্ত্ব হেগেলীয় দ্বন্দবাদের উপর ভিত্তি করে বিকশিত হলেও তা হেগেলীয় দ্বন্দ্ববাদের তত্ত্ব থেকে পৃথক। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের তত্ত্ব অনুযায়ী বিশ্বের যাবতীয় প্রপঞ্চ বিশ্লেষণে বস্তুই প্রধান। বস্তুই প্রথম এবং তারপর চিন্তা বা মন। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সারকথা হলো সমস্ত বস্তুত অথবা প্রপঞ্চের বিকাশ হয় দ্বন্দ্বের কারণেই এবং সমাজ পরিবর্তনেরও মূল কারণ দ্বন্দ্ব। এ প্রেক্ষাপটে নিম্নে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের উৎপত্তি সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো-

মানবসমাজের ইতিহাস সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমার ইতিহাস। বর্তমানে যে সভ্যতা আমরা দেখেছি তা একদিনে সূচিত হয় নি, বরং বন্যদশা থেকে বর্বরতার মধ্য দিয়ে আজ এই সভ্যতার উত্তরণ ঘটেছে। মানব সভ্যতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা। জ্ঞানবিজ্ঞানের শাখাপ্রশাখাসমূহ মানুষের চিন্তাভাবনাকে আরো গতিশীল ও সমৃদ্ধ করেছে। আর মানুষের জ্ঞানের ক্রমবিকাশের ঐঐতিহাসিক ধারায় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এমন এক ধরনের উন্নত চিন্তাভাবনা, যা প্রকৃত অবস্থাকে সঠিকভাবে নির্ণয় করতে, অনুধাবন করতে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট অনুসারে পরবর্তন করতে সহায়তা করে। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ অকস্মাৎ সৃষ্টি হয় নি। মানুষের জ্ঞানের দীর্ঘ ইতিহাসের পথ পরিক্রমার ফল হিসেবে একটি সুনির্দিষ্ট প্রকৃত অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঘটনার মধ্য দিয়েই এই তত্ত্বের আবির্ভাব ঘটেছে।

উনবিংশ শতকের এমন এক সময়ে মার্কসীয় দর্শদের উদ্ভব, যে সময় একদিকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও চিরায়ত জার্মান দর্শনের বিকাশ ঘটেছিল। অন্যদিকে, পুঁজিবাদী সমাজে পরস্পরবিরোধী সম্পর্ক ও মানবিক সংকট বিরাজমান ছিল। তবে এখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও জার্মান দর্শনের দ্রুত বিকাশ মার্কসীয় দর্শনের উৎপত্তিকে আরো গতিশীল ও ত্বরান্বিত করে তুলেছিল। এ সময় প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রধান আবিষ্কার যেমন- পদার্থবিজ্ঞানের শক্তির নিত্যতা ও রূপান্তরের সূত্র, জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে জীবদেহে কোষ গঠনের তত্ত্ব এবং বিশেষত চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ।

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রকৃতি

সমস্ত বস্তুজগতের এবং সমাজের ভিত্তি হলো গতি পরিবর্তন ও বিকাশ। এ কারণে বলা হয় যে, সমগ্র বিশ্বই প্রতিনিয়ত একটা অবিশ্রান্ত পরিবর্তনের মুখোমুখি হচ্ছে। এ পরিবর্তন এলোপাতাড়িভাবে না হয়ে দ্বান্দ্বিক নিয়মে সংঘটিত হচ্ছে। গ্রিক দার্শনিকসহ আরো বহু দার্শনিক দ্বান্দ্বিত নিয়মকে অধিবিদ্যার গড়ি থেকে যুক্ত করতে না পারলেও বিকাশ বা পরিবর্তনের একটা সাধারণ নিয়মের কথা বলেছেন। পরবর্তীতে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রমাণ করে যে, প্রকৃতির ন্যায় সমাজ জীবনও মানুষের সচেতনতা দ্বন্দ্বের কিরিতে একটা অবিরাম পরিবর্তন ও বিকাশের আওতাভুক্ত হয়। এ প্রেক্ষাপটে নিম্নে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রকৃতি তুলে ধরা হলো-

১. দ্বন্দ্বের মাধ্যমে বিকাশ (Dialectics)

'দ্বন্দ্ববাদ' শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ 'Dialego' থেকে, যার অর্থ হলো তর্ক-বিতর্ক বা যুক্তির মাধ্যমে সত্যে পৌঁছানো। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রকৃতি হলো যে, প্রতিটি প্রপঞ্চের ভেতরেই তার বিপরীত শক্তি বিদ্যমান। এই বিপরীত শক্তির সংঘাতই সমাজ ও প্রকৃতিকে সামনের দিকে নিয়ে যায়।

২. বস্তুবাদের প্রাধান্য (Materialism)

এই তত্ত্বের প্রকৃতি অনুযায়ী, জগত কোনো আধ্যাত্মিক বা ঐশ্বরিক শক্তির সৃষ্টি নয়। বস্তুই প্রথম এবং মন বা চেতনা হলো দ্বিতীয়। বস্তুর বাস্তব অস্তিত্বই মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

৩. গতির সর্বজনীনতা

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রকৃতি অনুযায়ী, প্রকৃতি বা সমাজ কোনোটিই স্থির নয়। প্রতিটি বস্তু প্রতিনিয়ত পরিবর্তন, রূপান্তর এবং বিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন এলোপাতাড়ি নয়, বরং সুনির্দিষ্ট দ্বান্দ্বিক নিয়মে (যেমন: পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তন) সংঘটিত হয়।

৪. বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ

মার্কসীয় দ্বন্দ্ববাদ কোনো কল্পনাবিলাসী তত্ত্ব নয়। এটি ঐতিহাসিক কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয় করে এবং প্রমাণ করে যে, প্রকৃতির ন্যায় সমাজ জীবনও মানুষের সচেতনতা ও দ্বান্দ্বিক ক্রিয়ার অধীনে বিবর্তিত হয়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ জগতের গতি, পরিবর্তন, অপান্তর এবং বিকাশের ব্যাখ্যায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তাই সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাসকে জানার জন্য কার্ল মার্কসের এই তত্ত্ব বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কেননা আদিম সমাজ থেকে বর্তমান সমাজ পর্যন্ত প্রতিটি সমাজেই দ্বন্দ্ব লক্ষনীয়। আর তাই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের উৎপত্তি ও প্রকৃতি সম্পর্কে উপরোক্ত আলোচনা এ তত্ত্বকে পুরাপুরি বুঝার ক্ষেত্রে অধিকতর সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন