দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি সম্পর্কে হেগেলীয় মতবাদ সমালোচনা
ভূমিকা: সমাজচিন্তার ক্ষেত্রে একজন সুপ্রতিষ্ঠিত ও পরম ভারবাদী দার্শনিকের নাম হলো জি, ডব্লিউ, হেগেল। তিনি যে শক্তি মানুষ ও প্রকৃতিয় স্রষ্টা, তিনি সেই, অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস করতেন। তবে ভাববাদী হিসেবে হেগেল সমধিক পরিচিত হলেও, তার সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ তত্ত্ব হলো দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব। কেননা, হোগলের পূর্বে দ্বান্দ্বিকতা সম্পর্কে অনেক উপাদান পেলেও স্বান্দ্বিকতা বিষয়টি দার্শনিক মর্যাদা পেয়েছে হেগেলের মাধ্যমেই। আজকের আলোচনায় আমরা হেগেলের দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের জন্য এবং এর সীমাবদ্ধতা বা বিশদভাবে জানব।
হেগেলের দ্বান্দ্বিক মতবাদ (Hegel's Dialectical Theory)
বিকাশ ও বিবর্তন সম্পর্কে পূর্বতন সকল একপেশে ব্যাখ্যার বিপরীতে সবচেয়ে সুগভীর ও বিষয়সমৃদ্ধ মতবাদ হিসেবে দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব উপস্থাপন করেন জার্মান দার্শনিক হেগেল। হেগেলের দ্বান্দ্বিক তত্ত্বকে ভাববাদী দ্বন্দ্ব তত্ত্বও বলা হয়। কেননা তার তত্ত্বের ভিত্তি ছিল ভাব বা মনন প্রক্রিয়াগত। এভাবে ঐতিহাসিক বিকাশ বা বিবর্তনের প্রক্রিয়াটি চিন্তা বা ধারণার দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার বিকাশের উপর নির্ভরশীল। মূলত হেগেলের মনন প্রক্রিয়া হলো বাস্তবতার স্রষ্টা বা নির্মাতা। এ প্রক্রিয়াকে আইডিয়া আখ্যা দিয়ে দ্বন্দ্ববাদ সম্পর্কে একটি দার্শনিক মতবাদের উপস্থাপন করেন হেগেল।
মূল বক্তব্য:
হেগেল সর্বপ্রথম দার্শনিক, যিনি দ্বান্দ্বিক তত্ত্বকে একটা সুনির্দিষ্ট দার্শনিক পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। হেগেলের মতে দ্বান্দ্বিকতা হলো চিন্তা ও ধারণার বিকাশের নিয়ম। তিনি আরও বলেন- বৈপরীত্য ও বিরোধ হলো প্রকৃতির এক সর্বজনীন নিয়ম, যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ও মানুষের চিন্তার জগতেও সমভাবে কার্যকর।দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি সর্বত্রই বৈপরীত্যের সংঘর্ষের ফলে নতুন শক্তির জন্ম হয়। এই প্রক্রিয়াটি অনবরত চলতে থাকে, যার লক্ষ্য হলো বিশ্বসত্তার যথার্থ স্বরূপ নিরূপণ করা বা পরম আদর্শে উপনীত হওয়া।
তত্ত্বের ব্যাখ্যা
দ্বান্দ্বিকতা সম্পর্কে হেগেলের মতবাদ হলো চিন্তা ও ধারণা বিকাশের নিয়ম। দ্বান্দ্বিকতা সম্পর্কে তার এই পদ্ধতি মানুষের এ যাবৎকালের চিন্তার ধারাকেই বদলে দিয়েছে। দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির এ মতবাদের মাধ্যমে তিনি অধিবিদ্যার লেবেল থেকে দর্শনের ইতিহাসকে মুক্ত করতে সক্ষম হন। তার মতে, যে-কোনো প্রকারের ধারণা ও বিপরীতধর্মী ধারণায় দ্বন্দ্ব হলো সমস্ত বিকাশের ভিত্তি। হেগেল ছিলেন ভাববাদী অর্থাৎ তার কাছে মানসিক ভাবনা, বাস্তব বস্তু ও প্রক্রিয়ার ন্যূনাধিক বিমূর্ত প্রতিবিম্ব নয়। পক্ষান্তরে তাঁর মতে, বিশ্বজগৎ আবির্ভাবের পূর্ব থেকেই কোথায় যেন বিদ্যমান কোনো এক ধারণার প্রতিাহুবিই হলো বস্তু ও তার বিকাশ। হেগেলের মতে, যা কিছু বাস্তব সবই যুক্তিসঙ্গত। তার মতে, ইতিহাসে যা কিছু আছে সবই পরম সত্তার প্রকাশ। কাজেই যা কিছু ঘটমান, যা কিছু চলমান জ্ঞানের মাপকাঠিতে তার সবই যুক্তিযুক্ত। হেগেল দ্বান্দ্বিক তত্ত্বকে বিকাশের নিয়ম হিসেবে। অভিহিত করে বলেন, প্রকৃতি ও ইতিহাসের ক্ষেত্রেও এ বিকাশ অব্যাহত ধারায় চলমান। আর এ কারণেই সমাজ পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়। পূর্বের যে-কোনো দর্শনের তুলনায় হেগেলীয় দর্শন ব্যাপক পরিসরে ব্যাপ্তি লাভ করেছে। এসব ক্ষেত্রে হেগেলীয় দর্শনের বিস্ময়কর বিকাশ ঘটেছে।
চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে হেগেল কেবল সৃজনশীল মানসিকতারই ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন বিশ্বখ্যাত আনগরিমার অধিকারী। হেগেল Idea-কে ভিত্তি হিসেবে ধরে তার দ্বান্দ্বিক তত্ত্বটি উপস্থাপন করেন। এক্ষেত্রে তার Dialectic-এর মূল বিষয় হলো Idea-এর সাথে Idea- এর জন্ম। যার ফলে চিন্তার বিকাশ ঘটে এবং এই চিন্তাই বস্তুতে পরিণত হয়। হেগেলের মতে, সমাজ গড়ে উঠেছে এ সম্পর্কিত দ্বান্দ্বিক চিন্তাভাবনা থেকেই। এই সামাজিক চেতনা ও চিন্তায় বিকাশ সাধিত হয়েছে সামাজিক অভিজ্ঞতার আলোকেই। উপরিউক্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, Hegel-এর Dialectic মার্কস থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সমালোচনা
হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি দর্শনের ইতিহাসে এক অনবদ্য সৃষ্টি যা মানুষের এ যাবৎকালের চিন্তাধারাকে বদলে দিয়েছে। যদিও তিনি আত্মিক পদ্ধতির মাধ্যমে অধিবিদ্যার লেবেল থেকে দর্শনের ইতিহাসকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তার পরও ভাববাদী মানসিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তাই তার দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
১. প্রকৃতি ও ইতিহাসের ভূমিকা অনুল্লেখ
হেগেল দ্বন্দ্বতত্ত্বের নিয়ম উদ্ঘাটন করেছেন ধারণা থেকে, কোনো বস্তু থেকে নয়। তার মতে, প্রকৃতি ও ইতিহাসের যাবতীয় পরিবর্তন ও বিকাশের মূল হলো ধারণা। বিশ্ব উন্নয়নের সবকিছুর পেছনেই তিনি এই ধারণাকেই ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন কিন্তু প্রকৃতি ও ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া থেকে তিনি তার দ্বান্দিক ধারণাটি লাভ করলেও তিনি তার তত্ত্বে এ বিষয়টি উল্লেখ করেন নি।
২. প্রকৃতির বিকাশকে অস্বীকার
হেগেলের নিকট বিকাশ অর্থ প্রকৃতির বিকাশ নয়। বিকাশ অর্থ চেতনার বিকাশ। তার মতে, প্রকৃতির বিকাশ চেতনার বিকাশের প্রতিফলন ব্যতীত আর কিছুই নয়। তিনি দ্বান্দ্বিক তত্ত্বকে পরম চেতনার বিকাশের হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেন এবং প্রকৃতির বিকাশকে অস্বীকার করেন।
৩. নিজ বক্তব্যের অস্বীকার:
হেগেল যখন দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির কথা বলেন, তখন তিনি বিকাশকে স্বীকার করেন কিন্তু যখন তিনি পরম সত্তার কথা বলেন তখন বিকাশের কথা অস্বীকার করেন। এখানে তিনি নিজেই নিজের বক্তব্যকে অস্বীকার করেন।
৪. মূল বক্তব্যের অসংগতি
হেগেল দ্বান্দ্বিক তত্ত্বকে বিকাশের নিয়ম হিসেবে অভিহিত করেন। তার দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব অনুসারে প্রকৃতি ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে এ বিকাশ অব্যাহত ধারায় চলমান কিন্তু দ্বান্দ্বিকতার ক্ষেত্রে তিনি যখন পরম ভাবসত্তার নিকট আত্মসমর্পণ করেন, তখন আপনাআপনি এই সত্তার কাছে বিকাশের নিয়ম বিলীন হয়ে যায় এবং বিকাশের পথও বন্ধ হয়ে যায়।
৫. সাংঘর্ষিক তত্ত্ব
হেগেলের দ্বান্দ্বিক তত্ত্বটি একটি সাংঘর্ষিক তত্ত্ব। কেননা, তার এ দর্শনকে একদিকে বৈপ্লবিক মনে হলেও তা অন্যদিকে রক্ষণশীল। তার দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে সমস্ত কুসংস্কার যেখানে বিলীন হয়, সেখানে পরম সত্তার ধারণা সমগ্র অংশেই রক্ষণশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈপ্লবিক দিকটি চাপা পড়ে যায়।
৬. স্বেচ্ছাচারী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ
হেগেলের মতে, যা কিছু বাস্তব সবই যুক্তিসংগত। হেগেলের এই বক্তব্য দ্বারা গোঁড়ামি ও স্বেচ্ছাচারী মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে উঠে। তাঁর মতে, ইতিহাসে যা কিছু আছে সবই পরম সত্তার প্রকাশ। কাজেই যা কিছু ঘটমান, যা কিছু চলমান, জ্ঞানের মাপকাঠিতে তার সবই যুক্তিযুক্ত। আর যদি তাই-ই হয়, তবে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের নিপীড়ন, নির্যাতনও যুক্তিযুক্ত।
ফয়েরবাকের সমালোচনা
ফয়েরবাক হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিকে অত্যন্ত জোরালোভাবে সমালোচনা করে বলেন, হেগেলের ভাববাদ ধর্ম তত্ত্বের নতুন সংস্করণ ছাড়া আর কিছুই নয়। ফয়েরবাকের সমালোচনার প্রধান দিকসমূহ হলো-
(ক) হেগেল মানুষকে নয়, বরং মানুষের 'ভাব'-কে গুরুত্ব দিয়েছেন।
(খ) তিনি দ্বাত্মিক পদ্ধতির মাধ্যমে পরম সত্তার ধারণা অর্থাৎ প্রকারান্তরে ধর্মতত্ত্বকে নাকচ করেন এবা বিমূর্ত নির্দিষ্ট ব্যস্তবতাকে স্বীকার করেন।
(গ) তিনি পুনরায় বাস্তবতায় এই স্বীকৃতিকে বাতিল করেন, আবার গরম সত্তার ধারণার মাধ্যমে ধর্মতত্ত্বকে স্বীকৃতি প্রদান করেন।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, দ্বান্দ্বিকতা সম্পর্কে অনেক তাত্ত্বিক আলোচনা করলেও হোগলই প্রথম দার্শনিক, যিনি দ্বান্দ্বিকতাকে একটা সুনির্দিষ্ট দার্শনিক পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। অধিকন্তু এ দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির মাধ্যমেই তিনি অধিবিদ্যার লেবেল থেকে দর্শনের ইতিহাসকে মুক্ত করতে সক্ষম হন। তাই উপরিউক্ত বিভিন্ন সমালোচনা সত্ত্বেও বলা যায়, হেগেলের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ তত্ত্ব হলো দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব আর তার এ দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব থেকেই পরবর্তীতে মার্কসসহ অন্যান্য তাত্ত্বিকদের দ্বান্দ্বিকতার বক্তব্য উপস্থাপিত হয়েছে।
