কার্ল মার্কসের মতে রাষ্ট্র বাস্তবে শ্রেণিরাষ্ট্র আলোচনা কর

কার্ল মার্কসের রাষ্ট্রতত্ত্ব: রাষ্ট্র বাস্তবে শ্রেণিরাষ্ট্র

অথবা, রাষ্ট্র সমাজে বিরাজমান শ্রেণিকাঠামোকে প্রতিফলিত করে। ব্যাখ্যা কর।

ভূমিকা: মার্কসবাদ যেসব বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রাষ্ট্রবিষয়ক ধারণা বা রাষ্ট্রতত্ত্ব। রাষ্ট্র সম্পর্কে প্রচলিত মতবাদগুলোর মধ্যে কার্ল মার্কসের উৎপত্তিসংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক মতবাদ সবচেয়ে শক্তিশালী। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা মার্কস ও এঙ্গেলস তাদের যৌথভাবে রচিত 'Communist Manifesto' এবং মার্কস তাঁর অমর গ্রন্থ 'Das Kapital'-এ রাষ্ট্রের উৎপত্তি, বিকাশ ও প্রকৃতি সম্পর্কে এই বৈজ্ঞানিক মতবাদের অবতারণা করেন।

কার্ল মার্কসের মতে রাষ্ট্র বাস্তবে শ্রেণিরাষ্ট্র

মার্কসের রাষ্ট্রতত্ত্ব:

রাষ্ট্র সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের উদয় হয় কেবল ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় দ্বান্দিক ব্যাখ্যা শুরু হওয়ার পর। আর এ তত্ত্ব প্রদান করেন মার্কসবাদের জনক হিসেবে খ্যাত কার্ল মার্কস। মূলত মার্কসীয় তত্ত্বে রাষ্ট্রের মতো অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান এন্ড গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ কারণে মার্কস কর্তৃক প্রদত্ত রাষ্ট্রতত্ত্ব বাষ্ট্রচিন্তার জগতে এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী মতবাব হিসেবে বিবেচিত হয়। নিম্নে মার্কসের রাষ্ট্রতত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

রাষ্ট্রতত্বের মূল বক্তব্য:

মার্কস রাষ্ট্রকে সমাজের 'উপরি-কাঠামো' (Superstructure) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, সমাজ যখন উৎপাদনের উপকরণের মালিক এবং শ্রমিকের ভিত্তিতে দুই ভাগে বিভক্ত হয়, তখনই রাষ্ট্রের প্রয়োজন দেখা দেয়। সংখ্যালঘু মালিক শ্রেণি তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে এই শক্তিশালী সংগঠনটি ব্যবহার করে। তাই মার্কসের মতে, রাষ্ট্র হলো শ্রেণিশাসনের প্রতীক এবং এক শ্রেণি কর্তৃক অন্য শ্রেণিকে শোষণ করার যন্ত্র। মার্কস-এর মতে, "মানুষের নৈতিক জীবনের পূর্ণতার জন্য রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়নি। সমাজস্থ মানুষের ইচ্ছার স্রোতধারার মাধ্যমে রাষ্ট্র বয়ে আসেনি, বরং মানুষের মধ্যে সংঘটিত নানাবিধ সংঘাতের মধ্য থেকে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। সে, কারণে রাষ্ট্র কর্তৃত্ব ও অবদমনের একটা যন্ত্রবিশেষ।"

রাষ্ট্র বাস্তবে শ্রেণিরাষ্ট্র তত্ত্বের ব্যাখ্যা:

কার্ল মার্কস রাষ্ট্রকে একটি বিচ্ছিন্ন সামাজিক ক্ষমতা হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং বলেন যে, সমাজ ও রাষ্ট্র অনিবার্যভাবে দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীকালে তিনি রাষ্ট্রকে সমাজের অংশ হিসেবে গণ্য করেন। রাষ্ট্র উপরিকাঠামোর সবচেয়ে সক্রিয় প্রতিষ্ঠান। তাঁর মতে, রাষ্ট্র আকস্মিকভাবে সৃষ্টি হয়নি। এমন এক সময় ছিল, যখন কোনো রাষ্ট্র ছিল না। আদিম সাম্যবাসী সমাজে মানুষের রাষ্ট্র সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। কারণ তখন জনগণের মধ্যে কোনো শ্রেণিবিভাজন ছিল না। যা উৎপাদন করত তা সকলে মিলেমিশে ভোগ করত। সমাজবিকাশের একটা স্তরে যখন একদল উৎপাদনের উপকরণের মালিক এবং একদল উৎপাদনকারীতে সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়ে তখনই রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। কারণ যারা উৎপাদনের উপকরণের মালিক ছিল তারা সংখ্যালঘু হওয়ায় সংখ্যাগুরু শ্রেণির ওপর আধিপত্য কায়েম করা ও কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য একটি শক্তিশালী ও ক্ষমতাশালী সংগঠনের আবশ্যকতা অনুভব করে। আর এই ক্ষমতাশালী সংগঠনই হলো রাষ্ট্র।

বিভিন্ন শ্রেণি রাষ্ট্র: দাস সমাজ, সামন্তসমাজ ও পুঁজিবাদ

দাসমাজেই সর্বপ্রথম রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখা দেয়। দাসসমাজেই সর্বপ্রথম শ্রেণিবিভক্ত সমাজ। এ সমাজের দুটি শ্রেণি হলো- দাস, মালিক ও দাস। আর দাসদের নিয়ন্ত্রণ এবং দাস-মালিকদের স্বার্থ রক্ষ্য করার জন্যই গড়ে ওঠে রাষ্ট্রব্যবস্থা।

দাসসমাজের পরবর্তী পর্যায়ে সামন্তসমাজেও সামন্তপ্রভুদের স্বার্থ রক্ষা এবং ভূমিদাস ও কৃষকদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাষ্ট্র একটি হাতিয়ার বা ক্ষমতা প্রয়োগকারী সংগঠনে পরিণত হয়।

সামন্তসমাজের পরে আসে পুঁজিবাদী সমাজ। পুঁজিবাদী সমাজের দুটি শ্রেণি হলো পুঁজিপতি ও সর্বহারা বা প্রলেতারিয়েত। এ সমাজে পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য তথা শ্রমিকশ্রেণিকে শোষণ করার জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা বিরাজ করতে থাকে।

মার্কসীয় মতানুসারে এই পুঁজিবাদী সমাজে দুটো শ্রেণি রয়েছে। যার একটি হলো শোষকশ্রেণি এবং অপরটি হলো শোষিতশ্রেণি বা সর্বহারাশ্রেণি। এমন একদিন আসবে যখন শ্রেণিসংগ্রাম আকার ধারণ করবে। তখন সংঘবদ্ধ সর্বহারাশ্রেণি বিপ্লবের মাধ্যমে বুর্জোয়াশ্রেণিকে হারিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করবে। সর্বহারাশ্রেণি তাদের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যে শোষকশ্রেণিকে ধ্বংস করে শোষণমুক্ত সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে। তখন সমাজে কোনো পরস্পরবিরোধী শ্রেণি থাকবে না। সকল জনগণই সম্পদের সামাজিক মালিকানা লাভ করবে। শ্রেণি থাকবে না ফলে শোষণ করার যন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রের অবলুপ্তি ঘটবে।

এ কারণেই মার্কসবাদীরা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার কথা বলেন। এ ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রের ভূমিকা হবে সমাজবিপ্লবের হাতিয়ার হিসেবে। শ্রমিকশ্রেণিকে শাসক শ্রেণিতে উন্নীত করা এবং প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই হবে এই রাষ্ট্রের মূল কাজ।

কার্ল মার্কসের রাষ্ট্রতত্ত্ব বিশ্লেষণে রাষ্ট্রসম্পর্কিত চারটি অনুসিদ্ধান্ত:

প্রথমত, রাষ্ট্র হচ্ছে মূলত শ্রেণিশত্রুতার বহিঃপ্রকাশ। সুতরাং যতদিন শ্রেণিশত্রুতা বিরাজ করবে ততদিন রাষ্ট্রও বিরাজ করবে।

দ্বিতীয়ত, প্রকৃতিগতভাবেই রাষ্ট্র একটি হিংস্র ও বলপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের নিকট থেকেই অহিংসা ও শান্তি আশা করা যায় না। এরূপ হিংস্র ও ভয়ংকর প্রতিষ্ঠানকে উৎখাত করতে হলে হিংস্র ও ভয়ংকর পথ অবলম্বন করতে হবে।

তৃতীয়ত, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সাথে শ্রমিকশ্রেণি কখনো আপস করতে পারে না। এরূপ রাষ্ট্রের প্রতি শ্রমিক শ্রেণি যে মনোভাব গ্রহণ করে তা হলো শত্রুতা ও বিরোধিতার মনোভাব, বন্ধুত্ব এ সহযোগিতার মনোভাব নয়।

চতুর্থত, রাষ্ট্রের উৎপত্তির বিষয়টি নিহিত হয়েছে বস্তুগত উৎপাদনব্যবস্থার মধ্যে। সমাজবিকাশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্যায়ে বস্তুগত উৎপাদনব্যবস্থা পরিবর্তিত হওয়ার সাথে সাথে রাষ্ট্রের রূপ ও প্রকৃতিও পরিবর্তিত হয়।

সমালোচনা:

রাষ্ট্র সম্পর্কে মার্কসের ধারণা সর্বাংশে সত্য নয়। রাষ্ট্রসম্পর্কিত তার এ মতবাদ কতগুলো সমালোচনায় সম্মুখীন। যথা-

১. রাষ্ট্রের বিলুপ্তিসংক্রান্ত ভুল অনুমান:

রাষ্ট্রের বিবৃতি সম্পর্কে মার্কস যে ধারণা পোষণ করেছেন তা সত্য নয়। বর্তমান বিশ্বে এমন অনেক দেশ আছে। যেমন- গণপ্রজাতন্ত্রী চীন, কিউব প্রভৃতি দেশে দীর্ঘদিন যাবৎ সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চললেও শোষণের এই যন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানটির বিলুপ্তি ঘটেনি।

২. রাষ্ট্রের জনকল্যাণমূলক ভূমিকা অস্বীকার:

মার্কস রষ্ট্রকে শুধু শ্রেণিশোষণ, শ্রেণিশাসন ও শ্রেণিস্বার্থের ধারক-বাহক হিসেবে চিন্তা করেছেন। কিন্তু তার এ ধারণা সর্বাংশে ঠিক নয়। কারণ, বর্তমান বিশ্বে অনেক রাষ্ট্র আছে যারা জনকল্যাণকর কাজ করে যাচ্ছে।

৩. অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র:

মার্কসের মতে, রাষ্ট্র একটি বলপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। মার্কসের এ ধারণাও সম্পূর্ণ সত্য নয়। কারণ, রাষ্ট্র শুধু বলই প্রয়োগ করে না বরং তা অনেক সময় জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও গ্রহণ করে।

৪. ভ্রান্ত ধারণা:

কার্ল মার্কসের রাষ্ট্রের উৎপত্তিসম্পর্কিত প্রবাদটি ভ্রান্ত ধারণার শামিল। তিনি মনে করেন যে, রাষ্ট্র একমাত্র শ্রেণীসংঘাত হতেই উৎপত্তি হয়েছে, তাঁর এ ধারণা স্বতঃসিদ্ধ ও অভ্রান্ত বলা যায় না। কারণ কোনো একক কারণে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হতে পরে না। এর পেছনে বিভিন্ন শক্তির অবদান রয়েছে।

৫. অস্পষ্টতা:

কার্ল মার্কসের রাষ্ট্রের উৎপত্তিসংক্রান্ত ধারণা অস্পষ্ট দোষে দুষ্ট। তিনি বিশ্বাস করেন যে রাষ্ট্র ক্রমশ বিলোপ হবে Government of persons, Government of things-এ রূপান্তরিত হবে। কিন্তু তাঁর এ ধারণা অতটা বোধগম্য ও স্পষ্ট নয়।

৬. গণতন্ত্র উপেক্ষিত:

Karl Marx রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের মুল্যায়ন করেননি। তিনি এক পর্যায়ে অভিজাততন্ত্র ও পরবর্তীতে একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে একনায়কত্বের কথা বলায় গণতন্ত্রকে অবমূল্যায়িত করা হয়েছে।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, কার্ল মার্কসের রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদ ত্রুটিমুক্ত নয়। বিভিন্ন আলোচক বিভিন্নভাবে তার এ মতবাদকে সমালোচিত ও প্রশ্নবিদ্ধ আসলেও রাষ্ট্রের উৎপত্তিসংক্রান্ত একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হিসেবে তার এই তত্ত্ব রাষ্ট্রচিন্তার জগতে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন