কার্ল মার্কসের বিপ্লব বিষয়ক তত্ত্ব বিশ্লেষণ কর

কার্ল মার্কসের বিপ্লব বিষয়ক তত্ত্ব বিশ্লেষণ

ভূমিকা: বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জনক হিসেবে খ্যাত কার্ল মার্কসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ বা তত্ত্ব হচ্ছে বিপ্লব বিষয়ক তত্ত্ব। তাঁর এ বিপ্লব বিষয়ক তত্ত্ব অন্য তাত্ত্বিকদের থেকে ভিন্ন। কারণ তিনি বিপ্লবের প্রচলিত ধারণাকে অগ্রাহ্য করে পূর্ণ নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে বিপ্লবকে সংজ্ঞায়িত করেন। তাঁর মতে, জনগণ যখন সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ও নিজেদের অবস্থার উন্নতির জন্য সংগ্রাম করে তখন তাকে প্রকৃত অর্থে বিপ্লব বলা যায়। আর এরই প্রেক্ষাপটে তিনি তাঁর বিপ্লব বিষয়ক মতবাদটি উপস্থাপন করেন।

কার্ল মার্কসের বিপ্লব বিষয়ক তত্ত্ব

মার্কসের বিপ্লব বিষয়ক তত্ত্ব বা বিপ্লবতত্ত্বের সূক্ষ্মদর্শী বিশ্লেষণ:

মার্কসবাদে বিপ্লবকে একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য করা হয় এবং বলা হয় বিপ্লব হলো ইতিহাসের চালিকাশক্তি। সমাজের প্রগতির জন্য বিপ্লব অপরিহার্য। বস্তুত মার্কসবাদীরা বিপ্লব বলতে রাজনৈতিক বিপ্লবকে বাুঝায় না। তারা বিপ্লব বলতে অভ্যুথানের মাধ্যমে ঐতিহাসিক দিক হতে পুরাতন সামাজিক, অর্থনৈতিক বিন্যাস থেকে আরও গতিশীল সামাজিক, অর্থনৈতিক বিন্যাসে উত্তরণকে বোঝায়। অর্থাৎ, সামাজিক বিপ্লব বলতে বোঝায় সমাজব্যবস্থার সামগ্রিক পরিবর্তন। নিম্নে আলোচনায় মার্কসের বিপ্লব তত্ত্বের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১. উৎপাদনশক্তির উন্নয়ন ও বিপ্লব:

মার্কস তাঁর বিপ্লব বিষয়ক তত্বে বিপ্লবের জন্য উৎপাদনশক্তির ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর মতে, উৎপাদনের উপাদানের উন্নতি হলে উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন হয়। ফলে পুরাতন উৎপাদন সম্পর্কের সাথে নতুন উৎপাদন-সম্পর্কের বিরোধ দেখা দেয় এরই ফলে বিপ্লব সূচিত হয়। তাঁর মতে, উন্নয়নের এক বিশেষ পর্যায়ে উৎপাদনের জড়বাদী শক্তিগুলো প্রচলিত উৎপাদন সম্পর্কের সাথে তথা সম্পত্তি সম্পর্কের সাথে সংঘাত সৃষ্টি করে। উৎপাদনশক্তির উন্নয়নের সাথে এই সম্পর্কসমূহ তাদের বন্ধনের পথে ধাবিত হয়। অতঃপর বিপ্লবের অঅগমন ঘটে।

২. শ্রেণিসংগ্রাম ও বিপ্লব:

মার্কসের মতে, শ্রেণিসংগ্রামের চূড়ান্ত রূপ হলো বিপ্লব। শোষণমূলক সমাজের অভ্যন্তরে যে বিপরীত্য বা দ্বন্দ্ব থাকে তার ফলেই বিপ্লব সংঘটিত হয়। বিপ্লবের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে সময় লাগে। জনগণের মধ্যে নানা কারণে বিক্ষোভ দানাবাঁধতে পারে। মাঝে মাঝে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনার ভেতর দিয়ে এই জাতীয় বিক্ষোভ প্রকাশ পায়। প্রথম দিকে এসব ঘটনাকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুঞ্জীভূত বিক্ষোভ হঠাৎ কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে সবকিছু বদলে দিতে পারে। এই জাতীয় আমূল পরিবর্তনের মূলে শোষিত ও নির্যাতিতদের সংগ্রামে মুখ্য ভূমিকা পালন করে বলে মার্কস অভিমত ব্যক্ত করেন।

৩. বিপ্লব হলো ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া:

মার্কসীয় ধারণা অনুযায়ী বিপ্লব হলো একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, যা সামাজিক পরিবর্তনের পথকে প্রশস্ত করে এবং যার মাধ্যমে শাসকশ্রেণির উচ্ছেদ সাধন ও নতুন প্রগতিশীল শাসকশ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এর মাধ্যমে এক শ্রেণির হাত থেকে অপর শ্রেণির হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতার হস্তান্তরকে সামাজিক বিপ্লব বলে। তবে শুধু এক শ্রেণির হাত থেকে অপর শ্রেণির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরকে সামাজিক বিপ্লব বলা যায় না। যেমন- সামরিক অভ্যুত্থান বা প্রাসাদবিপ্লব সামজিক বিপ্লবের সমর্থক নয়। কারণ এ ধরনের বিপ্লবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিবর্তন ঘটে। উৎপাদন সম্পকের পরিবর্তন ঘটে না। সুতরাং বিপ্লব হলো সমাজের মৌলিক রূপান্তরের হাতিয়ার।

৪. বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লব:

মার্কসীয় ধারণায় বিপ্লবের পাশাপাশি প্রতিবিপ্লব সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। মার্কসীয় ধারণা অনুযায়ী বিপ্লব হলো সকল প্রকার শোষণ ও অসাম্যকে দূর করে শ্রেণি ও শোষণহীন সমাজগঠনের প্রচেষ্টা। আর প্রতিবিপ্লব হলো শোষণ ও অসাম্যকে রক্ষা করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগের প্রচেষ্টা। বিপ্লবকে যদি অগ্রগতির সূচক বলা হয়, তবে প্রতিবিপ্লব হলো প্রতিক্রিয়াশীলতার তথা পশ্চাদগামীর সূচক। প্রতিবিপ্লব দু-ভাবে সাধিত হয়। যথা-

(ক) পুরনো শাসকশ্রেণি সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তর এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে পুরনো ব্যবস্থাকে ধরে রাখতে পারলে এবং

(খ) বৈপ্লবিক প্রক্রিয়া বেশ কিছুটা অগ্রসর হওয়ার পর পুরনো সমাজের শাসকশক্তিগুলো শক্তি সঞ্চয় করে পূর্বের অবস্থায় ফিরে গেলে।

৫. বিপ্লব ও হিংসা:

মার্কসীয় তত্ত্ব বিপ্লব ও হিংসার মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণেও সচেষ্ট। মার্কবাদীদের মতে, বিপ্লব ও হিংসা সমার্থক নয়। বিপ্লব রক্তপাতহীন, রক্তাক্ত, শান্তিপূর্ণ বা হিংসাত্মক হতে পারে। তবে বিপ্লব কোন পথে চালিত হবে তা নির্ভর করে শোষকশ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।

৬. বিপ্লব ও সংস্কার:

মার্কসীয় মতবাদে বিপ্লব ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে বিদ্যমান শাসন, বৈষম্য ও অবিচার অব্যাহত রাখতে চায়। সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রতিরোধ করাই হলো এর মূল লক্ষ্য। সংস্কারের মধ্যেও সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়। এ মতবাদ অনুসারে সংস্কার হলো একটি সামাজিক প্রক্রিয়া, যার সাহায্যে শাসকশ্রেণি শোষিতশ্রেণির আন্দোলনকে দমন করতে সচেষ্ট হয়। পাশাপাশি সংস্কারের মাধ্যমে সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাসমূহ দূরীকরণের চেষ্টা করা হয়। পুঁজিবাদী সমাজে শাসকশ্রেণি সংস্কারের মধ্য দিয়ে বিদ্যমান শাসন, বৈষম্য অবিচার অব্যাহত রাখতে চায়। সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রতিরোধ করাই এর মূল লক্ষ্য

সমালোচনা:

মার্কসীয় বিপ্লব তত্ত্বটি নানাভাবে সমালোচিত হয়েছে। যথা-

কখনো এই পরিবর্তনের উপযোগিতা রূপায়ণের জন্য বিপ্লব শব্দটিকে নানা বিশেষণে ভূষিত করা হয়। যেমন- শিল্পবিপ্লং সবুজবিপ্লব, সামাজিক বিপ্লব, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ইত্যাদি।

১. বিপ্লবের স্কুল ভবিষ্যদ্বাণী:

কার্ল মার্কস বিপ্লবের যে অবশ্যম্ভাবিতার কথা বলেছেন তা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে, পুঁজিবাদী সমাজের চরম বিকাশের পর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সমাধা হবে বলে দাবি করেন। কিন্তু দেখা যায়, উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বদলে সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীনের মতো পশ্চাৎপদ দেশে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে।

২. অর্থনৈতিক বিষয়ই একমাত্র উপাদান নয়:

মার্কস বিপ্লবের জন্য সমাজজীবনে অন্যান্য বিষয়কে উপেক্ষা করে অর্থনৈতিক বিষয়ের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করেছেন, যা পুরোপুরি ঠিক নয়। কারণ মানুষ সবসময় অর্থনৈতিক স্বার্থ যা চিন্তা দ্বারা পরিচালিত হয় না।

৩. শ্রেণিষ্যবস্থায় নশ্বরতা

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার পর শোষণহীন ও শ্রেণিহীন সমাজব্যবস্থা কায়েম হলেও শ্রেণিহীন সমাজব্যবস্থী প্রতিষ্ঠা তো হয়নি বরং সেখানে পুনরায় ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েম হয়েছে।

৪. সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ব্যর্থতা:

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পৃথিবীর কোনো দেশে শান্তিপূর্ণ পথে সফল হতে পারেনি। শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজতন্ত্র আনার চেষ্টা যেখানে সফল হয়েছে সেখানেই সমাজতন্ত্র উচ্ছেদ হয়েছে। এক্ষেত্রে চিলির আলেন্দে সরকার প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরে সামরিক বাহিনী কর্তৃক উৎখাতের কথা বলা যায়।

উপসংহার: উপরিউক্ত সমালোচনা সত্ত্বেও বলা যায়, কার্ল মার্কস তাঁর এই তত্ত্বের মাধ্যমে সমাজের প্রকৃতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে একটি মধ্য দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করেছেন। যার দ্বারা বিপ্লবের কারণ, বিপ্লব ও হিংসা, বিপ্লব ও সংস্কার সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। তাই তার এ তত্ত্বটি নানাভাবে সমালোচিত হওয়া সত্ত্বেও বলা যায়, মার্কসের বিপ্লবের রাজনৈতিক তাৎপর্যকে অস্বীকার করা যায় না, কেননা নতুন সমাজের জন্মলগ্নে বিপ্লব অনিবার্য। মার্কসবাদীদের ভাষায় বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। বিপ্লবের চরিত্র যত বেশি মৌলিক হবে গণতন্ত্রের গভীরতা ও ব্যাপকতাও তত বেশি হবে। তাই বিপ্লবের মধ্যেই গণতন্ত্রের নির্যাস নিহিত।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন