মার্কসীয় দর্শন হলো বস্তুবাদী দর্শন জোসেফ স্ট্যালিনের বক্তব্যের আলোকে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
ভূমিকা: ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, জার্মান দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জনক কার্ল মার্কস মানব ইতিহাসের ধারায় এক আমূল পরিবর্তনকারী দর্শনের জন্ম দেন। তাঁর এই দর্শন কেবল জগতকে ব্যাখ্যা করার জন্য নয়, বরং জগতকে পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে শোষিত মানুষের হাতে অর্পিত হয়েছে। মার্কসীয় দর্শনের মূল ভিত্তি হলো 'দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ'। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা জোসেফ স্ট্যালিন তাঁর বিখ্যাত ‘দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ (Dialectical and Historical Materialism) প্রবন্ধে মার্কসীয় দর্শনকে একটি সুসংগত বস্তুবাদী দর্শন হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃতি ও সমাজ বোঝার ক্ষেত্রে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত পথ।
মার্কসীয় দর্শন হলো বস্তুবাদী দর্শন
জোসেফ স্ট্যালিনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মার্কসীয় দর্শনের বস্তুবাদী রূপটিকে নিম্নলিখিত চারটি প্রধান বৈশিষ্ট্যের আলোকে আলোচনা করা হলো:
১. বিশ্বজগতের বস্তুময়তা (Materiality of the World)
মার্কসীয় দার্শনিক বস্তুবাদের প্রথম এবং প্রধান শিক্ষা হলো—এই বিশাল মহাবিশ্ব তার প্রকৃতিগতভাবেই বস্তুময়। এখানে ঈশ্বর বা কোনো অলৌকিক অতিপ্রাকৃত শক্তির কোনো স্থান নেই। স্ট্যালিনের মতে, এই বিশ্বের বিচিত্র ও বহুমুখী ঘটনাবলি আসলে গতিশীল বস্তুর (Matter in motion) বিভিন্ন রূপ মাত্র। বস্তুর অস্তিত্ব কোনো বিশেষ 'পরমাত্মা' বা 'ঐশ্বরিক ইচ্ছার' বহিঃপ্রকাশ নয়। বরং প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মেই বিবর্তিত হচ্ছে এবং এই বস্তুময় জগতই হলো একমাত্র বাস্তব সত্য।
২. মন ও চিন্তা-নিরপেক্ষ অস্তিত্ব (Objective Reality)
ভাববাদী দার্শনিকরা মনে করেন, জগত আমাদের চিন্তার সৃষ্টি। কিন্তু মার্কসীয় বস্তুবাদ এর সম্পূর্ণ বিপরীতে অবস্থান করে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বস্তু ও প্রকৃতি আমাদের মন, চিন্তা বা অনুভূতির বাইরেও স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল। অর্থাৎ, মানুষ পৃথিবীতে আসার আগে থেকেই প্রকৃতির অস্তিত্ব ছিল এবং মানুষ না থাকলেও এই মহাবিশ্বের নিয়মগুলো কার্যকর থাকবে। বস্তুজগতের অস্তিত্ব আমাদের ইচ্ছা বা অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না; এটি একটি বস্তুনিষ্ঠ বাস্তব সত্য (Objective Reality)।
৩. বস্তুর প্রাথমিকতা ও মনের গৌণতা (Primacy of Matter over Consciousness)
মার্কসীয় দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বস্তু এবং চিন্তার মধ্যকার সম্পর্ক নির্ধারণ। স্ট্যালিন মার্কসকে অনুসরণ করে বলেন, বস্তুজগতই হলো 'প্রাথমিক' (Primary), আর মন বা চেতনা হলো 'গৌণ' (Secondary)। কারণ:
মানুষের চেতনা বা চিন্তা হলো উন্নতভাবে বিকশিত বস্তুর (অর্থাৎ মস্তিষ্ক) একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
বস্তু বা অস্তিত্ব ছাড়া কোনো চিন্তা উৎপন্ন হতে পারে না।
আমাদের চেতনা আসলে বাইরের বস্তুজগতের একটি প্রতিফলন মাত্র। চিন্তাকে বস্তু থেকে কোনোভাবেই আলাদা করা সম্ভব নয়। বস্তুহীন মনের অস্তিত্ব কল্পনা করা অবাস্তব ও অবৈজ্ঞানিক।
৪. জগতের জ্ঞানগম্যতা (Cognizability of the World)
ভাববাদী দার্শনিকদের একটি বড় অংশ মনে করেন যে, জগত রহস্যময় এবং একে পূর্ণাঙ্গভাবে জানা অসম্ভব। কিন্তু মার্কসীয় বস্তুবাদ এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। স্ট্যালিনের মতে, এই জগৎ এবং এর প্রাকৃতিক নিয়মাবলি মানুষের পক্ষে সম্পূর্ণরূপে জানা সম্ভব। বিজ্ঞানের ক্রমাগত উন্নতি ও মানুষের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রকৃতির গূঢ় রহস্যগুলো উন্মোচিত হচ্ছে। যা আজও অজানা, তা অজেয় নয়; বরং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে তা অবশ্যই জানা যাবে। মানুষের জ্ঞান কোনো সীমানায় আবদ্ধ নয়।
ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও সমাজ বিশ্লেষণ
মার্কসীয় এই বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে যখন মানব সমাজের ইতিহাসে প্রয়োগ করা হয়, তখন তাকে বলা হয় 'ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। স্ট্যালিন ব্যাখ্যা করেন যে, প্রকৃতির ন্যায় সমাজের বিবর্তনও কোনো দৈব শক্তির ইশারায় ঘটে না। সমাজের বৈষয়িক জীবন বা উৎপাদন পদ্ধতিই (Mode of Production) হলো মূল ভিত্তি। মানুষের চিন্তাধারা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও আইন সবই এই অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যখন উৎপাদনের উপকরণের পরিবর্তন ঘটে, তখন সমাজের উপরি-কাঠামোতেও পরিবর্তন আসে এবং এভাবেই সমাজ ব্যবস্থা এক স্তর থেকে অন্য স্তরে (যেমন- সামন্তবাদ থেকে পুঁজিবাদ) রূপান্তরিত হয়।
মার্কসীয় বস্তুবাদের গুরুত্ব ও প্রভাব
মার্কসীয় দর্শন কেবল তত্ত্বের খাঁচায় সীমাবদ্ধ নয়। এর গুরুত্ব অপরিসীম কারণ:
বিজ্ঞানের ভিত্তি: এটি বিজ্ঞানের জয়যাত্রাকে সমর্থন করে এবং কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠনে উদ্বুদ্ধ করে।
বিপ্লবের হাতিয়ার: শোষিত মানুষকে বুঝতে শেখায় যে তাদের দারিদ্র্য বিধিলিপি নয়, বরং প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার কুফল।
কর্মমুখী দর্শন: মার্কস বলেছিলেন, "দার্শনিকরা জগতকে কেবল নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু আসল কাজ হলো একে পরিবর্তন করা।" এই বস্তুবাদী দর্শন মানুষকে কর্মতৎপর হতে শেখায়।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, জোসেফ স্ট্যালিন কর্তৃক ব্যাখ্যাত মার্কসীয় বস্তুবাদী দর্শন হলো একটি পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক বিশ্ববীক্ষা। এটি প্রমাণ করে যে, এই জগৎ কোনো অলৌকিক সত্তার করুণা নয়, বরং বস্তু ও তার গতির ফল। মানুষের চেতনা মূলত বস্তুরই উচ্চতর প্রতিফলন। এই দর্শন মানবজাতিকে অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্তি দিয়ে যুক্তিনির্ভর ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার দিকনির্দেশনা প্রদান করে। আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের গবেষণায় মার্কসীয় এই বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আজও এক অপরিহার্য ও প্রভাবশালী দর্শন হিসেবে স্বীকৃত।
