রাষ্ট্রের পতন সম্পর্কে কার্ল মার্কসের অভিমত ব্যাখ্যা
অথবা, রাষ্ট্র আপনাআপনিই বিলুপ্ত হয়ে যাবে- উক্তিটি মূল্যায়ন কর
ভূমিকা: কার্ল মার্কসের রাষ্ট্রসম্পর্কিত মতবাদের মধ্য কার্ল মার্কসের বক্তব্য ইতিহাসের নিরিখে গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত। তিনি তাঁর একাধিক গ্রন্থে রাষ্ট্রের কথা তুলে ধরেছেন। কার্ল মার্কস মানবসমাজের প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক সমাজব্যবস্থা পর্যন্ত সময়কে পর্যায়ক্রমিক ধারা বর্ণনার মাধ্যমে রাষ্ট্রের পরিপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি মানবসমাজের ঐতিহাসিক পটচিত্র পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যদ্বাণী ব্যক্ত করেছেন যে, রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটবে এবং শ্রেণিহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রের পতন সম্পর্কে কার্ল মার্কসের অভিমত:
রাষ্ট্র আপনাআপনি বিলুপ্ত হয়ে যাবে কার্ল মার্কস এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দেখিয়েছেন যে মানবসমাজ এক অবস্থা থেকে প্রতিনিয়ত অন্য অবস্থা বা শোষণ ব্যবস্থায় পৌঁছাচ্ছে। তিনি মানবসমাজের ইতিহাসকে পাঁচটি পর্যায়ে বিষক্ত করেছেন। রাষ্ট্র আপনাআপনি বিলুপ্ত হয়ে যাবে কার্ল মার্কসের এই মতের যথার্থ প্রমাণকল্পে সমাজের এই পাঁচটি সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে হবে। নিম্নে কার্ল মার্কসের সমাজ বিবর্তনের পাঁচটি সমাজব্যবস্থা তুলে ধরা হলো।
(i) আদিম সাম্যবাদী সমাজ (Primitive society),
(ii) দাসসমাজ (Slavery society),
(iii) সামন্ততান্ত্রিক সমাজ (Feudal society),
(iv) পুঁজিবাদী সমাজ (Capitalism society) এবং
(v) সমাজতান্ত্রিক সমাজ (Socialism society)।
নিম্নে Marx-এর সমাজ বিকাশের পর্যায়গুলোকে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হলো-
(i) আদিম সাম্যবাদী সমাজ:
প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর কোনো ব্যক্তিমালিকানা ছিল না। ব্যক্তিগত সম্পত্তির চেতনাই ছিল অনুপস্থিত। "Life was either a feast of a fast. অর্থাৎ, "জীবন ছিল ভুঁড়িভোজের না হয় উপবাসের। ব্যক্তিগত সম্পত্তির চেতনা অনুপস্থিত থাকায় এ যুগের মানুষের মধ্যে সামা অবস্থা বিরাজমান ছিল অর্থাৎ আদিম সমাজ ছিল শ্রেণিহীন। শ্রেণিহীন এ সমাজে কোনোরকম শ্রেণিবৈষম্য ছিল না। ফলে, শ্রেণিসংগ্রাম বা শ্রেণিবৈষম্য ছিল অনুপস্থিত।
(ii) দাসসসমাজ:
সময়ের পরিক্রমায় আদিম সাম্যবাদী সমাজের অবলুপ্তি ঘটে সৃষ্টি হয় দাসসমাজ। এখানে উৎপাদন সম্পর্ক ছিল খুবই বৈরী বা শোষণ ও অত্যাচারমূলক। এ উৎপাদনব্যবস্থায় দাস মালিকরা উৎপাদনের সবটাই ভোগ করতেন আর উৎপাদকরা, অর্থাৎ দাসরা ভোগের অধিকার থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত ছিল। সমাজের এ স্তরে প্রধান যে শ্রেণি দুটি প্রতীয়মান হয় তা হলো- (ক) দাস (Slave) এবং (খ) দাস মালিক (Slave Master)। এ দুটি শ্রেণির মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্বের ফলে সমাজ পরবর্তী স্তরে রূপ নেয়।
(iii) সামন্ততান্ত্রিক সমাজ:
সামন্তসমাজের প্রধান দুটি শ্রেণি হচ্ছে সামন্তপ্রভূ বা ভূস্বামী এবং ভূমিদাস। ভূস্বামী বিশাল জমিদারির মালিক। অন্যদিকে ভূমিদাস হলো ভূমিহীন কৃষকপ্রজা। সামন্ত সমাজে ভূমিদাস শোষিত ও ভূস্বামী শোষক বা শাসক। এই দুটো শ্রেণির মধ্যে পরস্পর দ্বন্দ্ব বিরাজমান। উৎপাদনশক্তির সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কের চরম বৈরিতার সৃষ্টি হয় এবং সামন্তসমাজের পতন অনিবার্য হয়ে যায়।
(iv) পুঁজিবাদী সমাজ:
সামন্তসমাজের পতনের পর আগমন ঘটে পুঁজিবাদী সমাজ এর। এ সমাজে সৃষ্ট বুর্জোয়াশ্রেণি সকল প্রকার উৎপাদন উপকরণের মালিক আর অন্য শ্রেণিটি অর্থাৎ প্রলেতারিয়েত শুধু কায়িকশ্রমের মালিক যা, সে বিক্রি করতে বাধ্য। উৎপাদন উপকরণের মুষ্টিমেয় মালিকরা শ্রমিকের শ্রমকে চুরি করে বা উদ্বৃত্ত মূল্য শোষণ করে বিপুল ধনসম্পদের মালিক, হতে থাকে। পুঁজিবাদী সমাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে একজন ব্যক্তিস্বাধীনভাবে পুঁজি খাটিয়ে ইচ্ছেমতো মুনাফা অর্জন করতে পারে। উৎপাদনের উপায়ের মালিকানা গুটিকতক মানুষের যাতে থাকে আর অধিকাংশ মানুষ হয়ে পড়ে কপর্দকহীন।
"পুঁজিবাদী সমাজে শোষিত শ্রমিক একপর্যায়ে সংগঠিত হয়ে শোষক পুঁজিপতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অবতীর্ণ হবে এবং নতুন এক শোষণহীন সমাজব্যবস্থার জন্ম দেবে যেখানে সম্পত্তির ওপর ব্যক্তিমালিকানার পরিবর্তে সামাজিক মালিকানা এবং সর্বহারার একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।"
(v) সমাজতান্ত্রিক সমাজ:
Marx বলেন যে, পুঁজিবাদী সমাজ ধ্বংসের মাধ্যমে পৃথিবীতে আগমন ঘটবে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার। এই উৎপাদন ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপকরণের মালিকানার অবসান ঘটে সামাজিক মালিকানার সৃষ্টি হবে। ফলে, উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে কোনো বৈরিতা থাকবে না এবং সমাজ শ্রেণিশোষণমুক্ত হবে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির তিরোধান করে শ্রেণিশোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠাই সমাজতান্ত্রিক সমাজের মূল লক্ষ্য। এখানে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ দেওয়া হয় এবং কাজ অনুযায়ী মজুরি দেওয়া হয়। তিনি সমাজতান্ত্রিক সমাজকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সমাজ বলে উল্লেখ করেন এবং এই সমাজের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হবে সাম্যবাদী সমাজ।
কার্ল মার্কস তাঁর ধারণা ব্যক্ত করেন যে, সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিসমাপ্তি ঘটে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং এই সমাজেই রাষ্ট্রের পরিসমাপ্তি ঘটবে।
মার্কস বলেছেন রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে থাকে শ্রেণি বিভক্ত সমাজের ওপর ভিত্তি করে। আদিম সাম্যবাদী সমাজে কোনো শ্রেণি বিভক্তি ছিল না তাই সে সমাজকে রাষ্ট্রও বলা যাবে না। তেমনি পুঁজিবাদী সমাজের বিলুপ্তির মাধ্যমে শ্রেণি বিভক্ত সমাজের সমাপ্তি ঘটবে, ফলে রাষ্ট্রেরও বিলুপ্তি ঘটবে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, কার্ল মার্কস রাষ্ট্র বিলোপ সম্পর্কিত যে ধারণা ব্যক্ত করেছেন তার বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তিট নেই এবং বর্তমান পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা যেভাবে পুরো পৃথিবীজুড়ে বিস্তার লাভ করেছে তাতে মনে হয় এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিলোপ সাধন মোটামুটি অসম্ভব একটি কল্পনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই বর্তমান অবস্থার বাস্তরচিত্র লক্ষ করে কার্ল মার্কসের মতো রাষ্ট্র আপনাআপনি বিলুপ্ত হয়ে যাবে তা বলা যায় না।
