ইউরোপীয় সামন্তবাদ পুঁজিবাদের জন্ম দিয়েছিল, কিন্তু ভারতীয় সামন্তবাদ পুঁজিবাদের জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়েছিল (নাজমুল করিম)
ভূমিকা: সমাজবিকাশের ধারায় ইউরোপে এক বিশেষ ধরনের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক, ব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটে, যার নাম সামন্তবাদ। দশম, একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ, ভূমিব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত যে নতুন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল তাকেই সামন্তবাদ বলা হয়। আদিম সাম্যবাদীব্যবস্থার অবসান এবং রোমান দাসপ্রথার অবক্ষয়ে সামন্তসমাজের উদ্ভব ঘটে।
ইউরোপীয় সামন্তবাদ জন্ম- ভারতীয় সামন্তবাদ পুঁজিবাদের জন্ম দিতে ব্যার্থ উক্তিটির ব্যাখ্যা
সামন্তবাদ বা Feudalism হলো মধ্যযুগের একটি বিশেষ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা। সমাজবিজ্ঞানী নাজমুল করিম (Nazmul Karim) তাঁর বিখ্যাত উক্তিতে বলেছেন "European feudalism gave birth to capitalism, while Indian feudalism of its own accord failed to do so." নিচে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. সামন্তবাদের সংজ্ঞা ও শ্রেণি বিন্যাস
প্রত্যক্ষ উৎপাদক কৃষকসমাজকে শোষণই এই সমাজব্যবস্থায় মৌল উৎপাদন পদ্ধতি। জমির মালিকানা ছিল সামন্ত প্রভুদের হাতে। এখানে ভূস্বামী ব্যক্তিবর্গ ভূমিদাসদেরকে বেগার খাটিয়ে ও খাজনা আদায় করে শোষণ প্রক্রিয়া চালিয়ে যেত। এই সমাজব্যবস্থায় প্রধানত দুটি শ্রেণিব্যবস্থার অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। যথা: সামন্তপ্রভু ও ভূমিদাস।
২. প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমাজের ভিন্নতা
আবহমানকাল ধরেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে সমাজের গড়নপ্রক্রিয়া ও বিকাশের ধারা ভিন্নতর। যেসব বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে এ দুয়ের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান তা হলো আবহাওয়া, ভূমিব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রকৃতি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো, ধ্যান-ধারণা ইত্যাদি।
৩. ইউরোপীয় সামন্ততন্ত্রের বিবর্তন ও পুঁজিবাদ
খ্রিষ্টীয় নবম শতক থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত ইউরোপীয় সমাজে বিভিন্ন ধারায় সামন্তপ্রথার উদ্ভব হয়। সামন্তযুগের উৎপাদনব্যবস্থা ও উৎপাদন-সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়ে সেখানে পুঁজিবাদী অর্থনীতির গোড়াপত্তন হয়। পাশ্চাত্য সামন্ততন্ত্রের অবক্ষয়ের পর পুঁজিবাদী এই সমাজব্যবস্থা পুঁজিবাদী সমাজে পরিণত হয়েছে।
৪. ভারতীয় সামন্তপ্রথার স্বরূপ ও ভূমিস্বত্ব
প্রাক-ব্রিটিশ আমলের ভারতীয় সমাজের গড়ন যে সামন্ততান্ত্রিক ছিল তা অনেকেই অস্বীকার করতে চান না। তবে পাশ্চাত্য সামন্ত্রসমাজের সাথে কিছুটা কাঠামোগত মিল থাকলেও কতগুলো মৌল বিষয়ের মধ্যে অমিলই বেশি রয়েছে। বিশেষ করে ভূমিব্যবস্থায় প্রকৃতি ভিন্ন হওয়ায় এমনটি মনে করা হয়ে থাকে।
মালিকানার অনুপস্থিতি: ভারতীয় সামন্তপ্রথায় ভূমিতে ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না। সম্পত্তির ধারণা ছিল পাশ্চাত্য থেকে আলাদা। হিন্দু, বৌদ্ধ বা মুসলিম শাসনামলে তথা প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভারতীয় সমাজে ভূমিতে কোনো মালিক শ্রেণির অস্তিত্বই দেখা যায়নি।
এ. আর. দেশাইর (A. R. Desai) মতবাদ: তিনি তাঁর 'Social Background of Indian Nationalism' গ্রন্থে বলেন, "Indian feudalism is distinguished from European feudalism by the striking feature that no class of landed feudal nobility with proprietary rights over land existed under it."
খাজনা আদায়কারী শ্রেণি: রাষ্ট্র ও সাধারণ কৃষককুলের মধ্যবর্তী যে শ্রেণিটির অস্তিত্ব ছিল তারা জমির মালিক ছিল না; তারা ছিল খাজনা আদায়কারী একটি শ্রেণিমাত্র।
৫. রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ভূসম্পত্তি
ইউরোপীয় সামন্ত প্রথায় রাজা একাধারে তার রাজ্যের সকল মানুষ এবং সম্পত্তির মালিক ছিলেন। রাজা থেকে ডিউক, কাউন্ট, ব্যারন, নাইট ইত্যাদি পর্যায়ক্রমে তারা ভূমি ও সংশ্লিষ্ট ভূমিদাস লাভ করত। পক্ষান্তরে, ভারতীয় সমাজকাঠামোতে রাজা তাত্ত্বিকভাবে জমির মালিক ছিলেন না। সম্রাট বা রাজা নির্দিষ্ট এলাকার খাজনা আদায় করার ক্ষমতা দিতেন মাত্র, এর বিনিময়ে তারা একটি কমিশন লাভ করতেন।
৬. ভারতীয় সামন্তপ্রথার মৌলিক ভিত্তি
ভারতীয় সামন্তপ্রথার মৌলিক ভিত্তি হলো তিনটি:
স্বনির্ভর গ্রাম সম্প্রদায়: গ্রাম কমিটি দ্বারা পরিচালিত এই গ্রামগুলো ছিল স্বনির্ভর ও সুগঠিত।
যৌথ পরিবার ব্যবস্থা: পরিবারগুলো ছিল প্রায়ই যৌথ সংগঠন। এখানে ব্যক্তির অস্তিত্ব গৌণ, ব্যক্তি ছিল পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
বর্ণশ্রম প্রথা: পেশাগুলো ছিল জন্মসূত্রে পাওয়া। বর্ণপ্রথায় স্ব-স্ব জাতি অনুযায়ী পেশা গ্রহণ করতে হতো যা পরিবর্তন করা ছিল প্রায় অসম্ভব।
৭. পুঁজিবাদের বিকাশে বাধা ও সামাজিক প্রভাব
বাজার পণ্য (Commodity): ভারতে উৎপাদন হতো গ্রামের চাহিদা অনুযায়ী, উৎপাদিত দ্রব্য কখনো বাজার পণ্যে পরিণত হয়নি।
মুক্ত অর্থনীতি: ইউরোপীয় বর্ণপ্রথায় এ ধরনের প্রকটতা ছিল না বলে পেশা নির্ধারণে প্রতিবন্ধকতা ছিল না। ফলে সেখানে উন্মুক্ত অর্থনীতির বিকাশ ঘটে এবং মুক্ত ব্যবসায়ীশ্রেণির উদ্ভব ঘটে যা পুঁজিবাদ বিকাশে সহায়তা করেছিল।
প্রটেস্ট্যান্ট মূল্যবোধ: পশ্চিম ইউরোপীয় সমাজব্যবস্থায় Protestant মূল্যবোধ মানুষকে পুঁজি গঠনে এত বেশি উদ্বুদ্ধ করেছিল যে, সেখানে পুঁজিবাদের বিকাশের পথ সুগম হয়েছিল।
ম্যানর (Manor) ব্যবস্থা: ভারতীয় সামন্তপ্রথা ইউরোপীয় সামন্তরাজ্যের ম্যানর ব্যবস্থারও জন্ম নিতে পারেনি। ভূস্বামীর অধীন স্বয়ংসম্পূর্ণ উৎপাদন একক হলো এই ইউরোপীয় ম্যানর। এদিক থেকে বিচার করলে এ কথা বলা যায়, "The institution of the manor existed in the pro-British Indian society"
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, পুঁজিবাদ হলো একটি বিশেষ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিকব্যবস্থার নাম যেখানে সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানা ও মুনাফার নিশ্চয়তা থাকে। এই পুঁজিবাদের উদ্ভব ও পূর্ণবিকাশ মূলত অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে ইংল্যান্ডে হয়েছে। যেসব বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় পুঁজিবাদ বিকশিত হতে পারেনি সেগুলো হলো-অনুন্নত যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। এ ছাড়াও অনুৎপাদনশীল খাতে অবিবেচকের মতো খরচও ভারতীয় জীবন দর্শনই বহুলাংশে দায়ী।
