বিপ্লব কী? সমাজবিপ্লব সম্পর্কিত তোমার অভিমত ব্যাখ্যা কর

বিপ্লব কী? সমাজবিপ্লব সম্পর্কিত তোমার অভিমত ব্যাখ্যা

ভূমিকা: বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বহুল ব্যবহৃত ও পরিচিত প্রত্যয় হচ্ছে বিপ্লব। সমাজে যখন হঠাৎ কোনো সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটে যার ফলে ভাবধারা এবং জীবনপ্রণালিতে অতীতের সঙ্গে প্রায় সব ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন এরকম পরিবর্তনকে বিপ্লব বলে।

বিপ্লব কী? সমাজবিপ্লব সম্পর্কিত অভিমত ব্যাখ্যা

বিপ্লব কাকে বলে:

ইংরেজি Revelation শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে বিপ্লব। আর এই Revolution শব্দটি ইংরেজি ভাষায় সর্বপ্রথম প্রবেশ করে ১৬০০ সালের দিকে, আর তখন বিপ্লব কথাটি দ্বারা পুরনো ব্যবস্থায় পুনরুদ্ধারকে নির্দেশ করতো। অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক জীবনে মৌলিক ও নতুন উন্নয়ন বোঝাদের জন্য বিপ্লব শব্দটি ব্যবহার করা হয়। বিপ্লবের ধারণা প্রাচীনকালেও ছিল। সাধারণভাবে বিপ্লব বলতে সরকার বাবস্থায় প্রগতিশীল পরিবর্তন সাধনের জন্য মানুষের কার্যক্রমকে বোঝায়। অন্যভাবে বলা যায়, অভ্যন্তরীণ সংঘাতপূর্ণ ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশের সরকার ও শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানোকে বিপ্লব বলে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা:

বিপ্লব ধারণাটি বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে এবং বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে এবং বিভিন্ন ধরনের বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার দরুন এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করা কঠিন। তবুও নিম্নে বিভিন্ন তাত্ত্বিকদের প্রদত্ত সংজ্ঞা প্রদান করা হলো-

সিগম্যান্ড নিউম্যান-এর মতে, 'বিপ্লব কেবল রাজনৈতিক সংগঠনের নয় বরং সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ এবং সমাজ বিন্যাসের সুদুরপ্রসারী ও মৌলিক পরিবর্তন।"

পিটার অ্যাম্যান এর মতে, "বিপ্লব হচ্ছে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র ক্ষমতার ক্ষণস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী পতন যার সাথে সাধারণত আনুগত্যের অভ্যাস জড়িত।"

চার্লস এলউড-এর মতে, "বিপ্লব হচ্ছে সামাজিক অভ্যাসের আংশিক পতনের কারণে সৃষ্ট সামাজিক বিন্যাস বিশৃঙ্খলা, যা অভ্যাসগুলোকে পুনর্গঠিত করে।"

রেক্স হোগার-এর মতে, "বিপ্লব হচ্ছে এই ধরনের সামাজিক পরিবর্তন, যা এমন একটি সময়ে উদ্ভূত হয় যখন একটি সামাজিক বিন্যাসের মৌল প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ বাতিল হয় এবং মতুন মূল্যবোধ গৃহীত হয়।"

ডেল ইউডার-এর মতে, 'বিপ্লব যাচ্ছে সামাজিক মনোভাব ও মূল্যবোধের পরিবর্তন। যেগুলো সনাতনি প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাসের মূল।"

স্যামুয়েল হান্টিংটন-এর মতে, "বিপ্লব হচ্ছে একটি সমাজের প্রধান মূল্যবোধ ও বিশ্বাস, রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠান, সামাজিক কাঠামো এবং সরকারি কর্মকান্ড ও নীতিমালায় দ্রুত, মৌলিক ও সহিংস অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন।"

সুতরাং বলা যায়, সমাজের বা রাষ্ট্রের সার্বিক পরিবর্তনের জন্য জনগণের সংগ্রামের সর্বশেষ প্রায়ই হলো বিপ্লব। এজন্য বলা হয়, বিপ্লব মানেই আমূল পরিবর্তন।

সমাজবিপ্লব:

বিপ্লবের মার্কসীয় সংজ্ঞা অমার্কসীয় সংজ্ঞাগুলো থেকে শুধু পৃথকই নয় বরং গুণগতভাবেও ভিন্ন। মার্কস ও এঙ্গেলসের ধারণানুসারে বিপ্লব হলো একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। যার পরিণতি হলো সমাজের পরিবর্তন, রাজনৈতিক ব্যবস্থায়। আকস্মিক সহিংস পরিবর্তন নয়। মার্কস এবং এঙ্গেলস বিপ্লব বলতে প্রধানত সমাজ বিপ্লবকেই বুঝিয়েছেন। সমাজবিপ্লব প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বিপ্লব একটি মুহূর্ত মাত্র। সমাজ বিপ্লব সম্পর্কে ধারণা প্রদানের পূর্বে মার্কস-এঙ্গেলস সমাজ বলতে কী বুঝিয়েছেন তা জানা অত্যাবশ্যক। জাতীয় ভৌগোলিক পরিসীমার অন্তর্গত সমাজগুলোকে সমাজের মৌল এককের মর্যাদা দিতে রাজি নন মার্কস-এঙ্গেলস। তাঁদের মতে, প্রকৃত সামাজিক একক হলো ঐতিহাসিক বিকাশ প্রক্রিয়ার একটি পর্বের অন্তর্গত সকল মনুষ্যগোষ্ঠী।

সমাজবিপ্লব সম্পর্কে মার্কসীয় ধারণাটি ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মূল তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ঐতিহাসিক বস্তুবাদের অন্যতম। বক্তব্য হলো যে, বিকাশমান উৎপাদনশক্তির সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্বে পুরাতন সমাজব্যবস্থা ভেঙে গিয়ে নতুন সমাজব্যবস্থার জন্ম হয়। অর্থাৎ, উৎপাদন সম্পর্কের বিরুদ্ধে নতুন উৎপাদন শক্তির বিদ্রোহকেই সমাজ বিপ্লব বলে।

উল্লিখিত ব্যাখ্যা থেকে সমাজবিপ্লব সম্পর্কে কয়েকটি ধারণা লাভ করা যায়। এগুলো হলো-

প্রথমত, সমাজবিপ্লব কোনো অবস্থাতেই অকস্মাৎ সংঘটিত হয় না। ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই সমাজবিপ্লবের উদ্ভব হয় একটি সমাজব্যবস্থার রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে।

দ্বিতীয়ত, বিশেষ কোনো নেতা বা ব্যক্তির ইচ্ছা-অন্যিহার ভিত্তিতে সমাজ বিপ্লব ঘটে না। কেবল বাস্তব পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমেই সমাজব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব।

তৃতীয়ত, যেকোনো ধরনের সমাজবিপ্লবই হোক না কেন তার নির্দিষ্ট বিষয়গত সামাজিক, অর্থনৈতিক অন্তর্নিহিত বস্তু থাকে। আর এটি ব্যক্তির ইচ্ছা ও চেতনানিরপেক্ষ।

সমাজবিপ্লবের এই ধারণা থেকে আমরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি। যথা-

১। সমাজবিপ্লব যেহেতু পুরাতন উৎপাদন সম্পর্কের বিলোপসাধন করে নতুন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে, সেহেতু এর উল্লেখযোগ্য মুখ্য উপযোগিতা হলো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত পুরাতন শ্রেণিব্যবস্থাকে বিলীন করে দিয়ে নতুন শ্রেণির ক্ষমতায় আরোহণকে স্বাগত জানানো। অর্থাৎ, যে শাসকশ্রেণি গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করত, ওয়েভকে উচ্ছেদ করার মাধ্যমে যখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শ্রেণিশক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সমাজবিপ্লবের সার্থকতা সুস্পষ্ট রূপ পরিগ্রহ করে। সমাজবিপ্লবের মূলকথা হলো, পুরাতন রাষ্ট্রশক্তির বিলুপ্তি ঘটিয়ে নতুন রাষ্ট্রশক্তি কায়েম করা। এককথায় এর অর্থ রাজনৈতিক অমতা দখলম করা। প্রাক-সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সমাজবিপ্লব অনুষ্ঠিত হয়েছে এক শোষকশ্রেণির তিরোধান এবং অপর এক শোষকশ্রেণির আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দাসব্যবস্থার পতন হয়ে যখন সামন্ততন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে তখন দাস-মালিকদের স্থলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সামন্তপ্রবুরা স্থলাভিষিক্ত হয়। আবার, বুর্জোয়া বিপ্লবের মাধ্যমে সামন্ততন্ত্রের তিরোধানের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদের আবির্ভাব ঘটে। ফলে উৎপত্তি ঘটে এক নব্য শোষকশ্রেণির। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় শোষিতশ্রেণি অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণি। আর তখনই ইতিহাসে চির শোষণের অবসান ঘটে।

২। পুরাতন উৎপাদন সম্পর্কের সাথে নতুন উৎপাদনশক্তির স্বন্দ্বের ফলে পুরাতন শ্রেণিকে পরাজিত করে যে নব্য শ্রেণি সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে, সেই শ্রেণিই সেই মাহেন্দ্রক্ষণে হয়ে দাঁড়ায় সমাজবিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি। আর এভাবেই নির্ধারিত হয় সমাজবিপ্লবের শ্রেণিগত চরিত্র।

উপরিউক্ত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজবিপ্লবের ধারণাসম্পর্কিত আলোচনার ক্ষেত্রে এ কথা স্মরণ রাখা আবশ্যক যে, "মার্কসবাদ যেহেতু কোনো প্রকার নিয়তিবাদকে স্বীকার করে না, সেহেতু উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্ক এই দুইয়ের প্রতিক্রিয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিই হলো বিপ্লব। এমন ধরনের কোনো যান্ত্রিক তত্ত্ব মার্কসবাদের চিন্তারাজ্যে সম্পূর্ণভাবে অচল। এই প্রক্রিয়াটি সমাজবিপ্লবের প্রেক্ষাপট রচনা করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত শ্রেণিসংগ্রামের গতিপথের ওপরই নির্ভর করে সমাজ বিপ্লবের উৎপত্তি, বিকাশ ও সফলতা।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, শ্রেণিসংগ্রামের প্রধান কুশীলব হলো শ্রমজীবী মানুষ। আর তাই মার্কস-এঙ্গেলস বর্ণিত সমাজবিপ্লবের ধারণাটির মূলভিত্তি হলো ঐতিহাসিক বস্তুবাদের প্রধান দ্বান্দিক সূত্র। ব্যক্তির একক ইচ্ছায় যেমন কোনো ইতিহাসের উৎপত্তি হয় না, ইতিহাসের অগ্রগতি, বিপ্লবী প্রক্রিয়ার বিকাশ যেমন ব্যক্তির ইচ্ছা নিরপেক্ষ তেমনি ইতিহাসও মানুষের উৎপাদন শক্তিকে ত্বরান্বিত করায় ও পুরনো উৎপাদন সম্পর্ক ভেঙে নতুন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সক্রিয় ফল।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন