বস্তু ও চেতনার পারস্পরিক সম্পর্ক: দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের ভিত্তি
ভূমিকা: সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে কার্ল মার্কস এক অবিস্মরণীয় নাম। তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ধ্যানধারণা আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাধারাকে আমূল পরিবর্তন করেছে। মার্কসীয় দর্শনের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হলো দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism)। এই তত্ত্বের প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো জগতের মূল সত্তা কী বস্তু নাকি চেতনা? মার্কসীয় দর্শনে বস্তু ও চেতনার পারস্পরিক সম্পর্ক কেবল একটি তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়, বরং এটি মানব ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি বোঝার প্রধান চাবিকাঠি। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ অনুযায়ী, বস্তুই আদি এবং চেতনা বস্তুগত জগতেরই একটি উন্নততর প্রতিফলন।
বস্তু ও চেতনার সংজ্ঞা
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হলো জগৎ প্রকৃতিগতভাবেই বস্তুগত। মানুষের চেতনার বাইরে এক বিশাল বস্তুগত জগৎ বিদ্যমান।
বস্তু (Matter): বস্তু হলো আমাদের চারপাশের সেই বাস্তবতা যা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং আমাদের চেতনার ওপর নির্ভর করে না।
চেতনা (Consciousness): চেতনা হলো বস্তুর বিকাশের একটি নির্দিষ্ট স্তরে সৃষ্ট বিশেষ গুণ। এটি মানুষের মস্তিষ্ক নামক জটিল বস্তুর একটি উন্নততর ক্রিয়া।
মার্কসীয় দর্শন মতে, বস্তু চেতনা সৃষ্টি করে না, বরং চেতনাই বস্তুর বিকাশের ফল। অর্থাৎ, অস্তিত্বই চেতনাকে নির্ধারণ করে, চেতনা অস্তিত্বকে নয়।
(ক) চেতনা: মস্তিষ্কের অনন্য গুণ ও প্রতিবিম্ব
চেতনা কোনো অলৌকিক বা আধ্যাত্মিক শক্তি নয়। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে যে, চেতনা হলো অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও জটিলভাবে গঠিত একটি বস্তুর গুণ, যাকে আমরা মস্তিষ্ক বলি।
মস্তিষ্কের ক্রিয়া: আমাদের চিন্তাশক্তি, অনুভূতি এবং কল্পনা সবই স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিক ক্রিয়ার ফলাফল। মগজ বা মস্তিষ্ক না থাকলে চেতনার কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না।
বাস্তবতার প্রতিবিম্ব: চেতনার কাজ হলো বাইরের বস্তুগত পৃথিবীকে নিজের মধ্যে ধারণ করা বা প্রতিবিম্বিত করা। একটি আয়না যেমন সামনের বস্তুকে প্রতিফলিত করে, মানুষের মস্তিষ্কও তেমনি চারপাশের সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে চেতনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে। তাই চেতনাকে বলা হয় "বস্তুগত জগতের আত্মিক প্রতিচ্ছবি"।
(খ) চেতনার উৎস: বস্তুগত জীবন ও অস্তিত্ব
মার্কস ও এঙ্গেলস তাদের 'The German Ideology' গ্রন্থে স্পষ্টভাবে বলেছেন, "জীবন চেতনা দ্বারা নির্ধারিত হয় না, বরং চেতনা জীবন দ্বারা নির্ধারিত হয়।"
অস্তিত্বের সচেতন উপলব্ধি: মার্কসের মতে, মানুষের চেতনা হলো তার বাস্তব অস্তিত্বের সচেতন রূপ। মানুষ কীভাবে খায়, কীভাবে উৎপাদন করে এবং কীভাবে সমাজে একে অপরের সাথে সম্পর্কিত—তার ওপর ভিত্তি করেই তার ধ্যানধারণা বা চেতনা গড়ে ওঠে।
বস্তুগত ভিত্তি: মানুষ প্রথমে বাঁচার জন্য খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের সংস্থান করে। এই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় লিপ্ত হতে গিয়ে সে নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। এই উৎপাদন পদ্ধতি ও সামাজিক সম্পর্কই হলো ভিত্তি (Base), যার ওপর ধর্ম, দর্শন, আইন এবং চেতনার উপরি কাঠামো (Superstructure) দাঁড়িয়ে থাকে। সুতরাং, চেতনার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে মানুষের বস্তুগত ও সামাজিক প্রয়োজনের তাগিদে।
(গ) বস্তু ও চেতনার দ্বান্দ্বিক মিথস্ক্রিয়া
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ কেবল একতরফাভাবে বস্তুর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে না; এটি বস্তু ও চেতনার মধ্যে একটি পারস্পরিক ক্রিয়া (Interaction) স্বীকার করে। এখানেই মার্কসীয় বস্তুবাদ যান্ত্রিক বস্তুবাদ থেকে আলাদা।
চেতনার সক্রিয় ভূমিকা: যদিও চেতনা বস্তু থেকে উদ্ভূত, কিন্তু উৎপন্ন হওয়ার পর চেতনা নিষ্ক্রিয় থাকে না। এটি পুনরায় বস্তুর ওপর বা বাস্তব সমাজের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
মতবাদ যখন বস্তুগত শক্তি: মার্কস বলেছিলেন, "তত্ত্ব বা মতবাদ যখন জনতাকে গ্রাস করে বা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটি নিজেই একটি বস্তুগত শক্তিতে পরিণত হয়।"
উদাহরণস্বরূপ: মার্কসীয় বৈপ্লবিক চেতনা যখন শ্রমজীবী মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়, তখন সেই 'চেতনা' ব্যবহার করে তারা বাস্তবে বিপ্লব ঘটায় এবং পুরনো সমাজকাঠামো ভেঙে নতুন সমাজ গড়ে তোলে।
পারস্পরিক প্রভাব: বস্তু চেতনাকে রূপ দেয়, আর চেতনা সেই বস্তুগত জগতকে পরিবর্তন করার পরিকল্পনা ও শক্তি যোগায়। এই আদান-প্রদানই হলো দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্ক।
(ঘ) ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও সামাজিক চেতনা
সমাজ বিবর্তনের প্রতিটি স্তরে বস্তু ও চেতনার এই সম্পর্কটি ভিন্ন ভিন্ন রূপ নেয়। আদিম সাম্যবাদী সমাজ, দাস সমাজ, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ এবং বর্তমানের পুঁজিবাদী সমাজ প্রতিটি স্তরেই মানুষের চিন্তাচেতনা নির্ধারিত হয়েছে সেই সময়ের উৎপাদন পদ্ধতির মাধ্যমে।
পুঁজিবাদ ও চেতনা: পুঁজিবাদী সমাজে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যকার যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক, তা শ্রমিকের মধ্যে 'শ্রেণি চেতনা' তৈরি করে। এই চেতনা তাকে তার শোষিত হওয়ার বাস্তবতাকে চিনতে সাহায্য করে এবং পরিবর্তনের প্রেরণা জোগায়। অর্থাৎ, বস্তুগত অভাব ও শোষণই এখানে চেতনার জন্মদাতা।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মূলে রয়েছে বস্তু ও চেতনার এক গভীর ও গতিশীল সম্পর্ক। বস্তুই আদি এবং চেতনার উৎস এ কথা যেমন সত্য, তেমনি সত্য হলো চেতনাও সমাজ পরিবর্তনের এক অপরিহার্য চালিকাশক্তি। বস্তু চেতনাকে উৎপন্ন করে, আর চেতনা সেই বস্তুকে বা সমাজকে নতুন রূপ দিতে মানুষকে পথ দেখায়।
