পুঁজিবাদের উৎপত্তি সংক্রান্ত কার্ল মার্কসের মতবাদ আলোচনা
ভূমিকা। পুঁজিবাদ হচ্ছে সামাজিক বিবর্তনের আধুনিক রূপ। যেখানে বাক্তি স্বকীয়তা দিয়ে নিজস্ব ইচ্ছা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করতে পারে। সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানা এবং সফল কর্মকাণ্ডের অন্তরালে রয়েছে মুনাফা। এসব বৈশিষ্ট্য যে সমাজে বিদ্যমান থাকবে সেটিকে বলা হয় পুঁজিবাদী সমাজ। পুঁজিবাদ ও পুঁজিবাদী সমাজ এক দিনে তৈরি হয়নি বরং এর উদ্ভবের পেছনে অনেক সুদূরপ্রসারী প্রেক্ষাপট জড়িয়ে রয়েছে।
পুঁজিবাদের উৎপত্তিতে কার্ল মার্কসের ধারণা
পুঁজিবাদ সমাজেও এমন একটা স্তর, যেখানে ব্যক্তিগত মালিকানার দ্বারা উৎপাদন ব্যবস্থা, কলকারখানা ও শ্রমিকদের শ্রম নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর এ পুঁজিবাদ সমাজে একদিনে গড়ে ওঠেনি। এর উৎপত্তির পেছনে রয়েছে অনেক দিনের সুদূরপ্রসারী প্রেক্ষাপট।
পুঁজিবাদী সমাজের উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে যেসব তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন তাদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জনক কার্ল মার্কস অন্যতম। কার্ল মার্কস বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে পুঁজিবাদের যথা উল্লেখ করেছেন। মার্কসের মতে, উৎপাদন পদ্ধতিতে পরিবর্তন, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কলকারখানা বৃদ্ধির জন্যই পুঁজিবাদের জন্ম হয়েছে। বস্তুতপক্ষে বর্তমান সমাজের দিকে লক্ষ্য করলে আমরা কার্ল মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গির সত্যতা খুঁজে পাই।
কার্ল মার্কস মনে করতেন যে, পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে অনেকগুলো শক্তির সমন্বয়ে। যেমন- বাণিজ্য পুঁজির আবির্ভাব, মুদ্রা অর্জনে পুঁজির আবির্ভাব, কাঁচামালকে দক্ষতা সহকারে ব্যবহার করে অন্য বস্তুতে রূপান্তর করার বৃহত্তর সম্ভাবনার সৃষ্টি, ক্রমবর্ধমান হারে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি মুদ্রার মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার প্রথা, বিকাশ, শ্রম কিংবা দ্রব্য খাজনায় রূপান্তর ইত্যাদি। উপরিউক্ত প্রক্রিয়াসমূহের মিথস্ক্রিয়ায় প্রজাভিক্তিক কৃষিকাজের বিকাশ, স্বাধীন সম্পত্তির মালিক হিসেবে কৃষকের আবির্ভাবের দরুন কৃষিক্ষেত্রে দিনমজুর শ্রেণির উদ্ভব হলো এবং পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হলো।
বাণিজ্য পুঁজির বিকাশ ও বাজার বিস্তারের সাথে সাথে মানানসইভাবে বিকশিত হয়েছে। তৎসঙ্গে সমাজের সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্রমশই মুদ্রাভিত্তিক হয়ে দাঁড়ায়। সমাজের উৎপাদন পদ্ধতিতে মুদ্রা বিরাট পরিবর্তন সাধন করে এবং তার চরিত্রটিও সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে। ব্যক্তিগত স্বাধীন সম্পত্তির ওপর কৃষকের মালিকানাটি সমাজে আবির্ভূত হয়েছে তখন, যখন সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে সামন্তবাদী উৎপাদনব্যবস্থাটি নির্মূল হলো। কিন্তু যেসব সামাজিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হায় কৃষক তার স্বাধীনতাটি অর্জন করেছিল তার ওপর ভর করেই কৃষক তার ব্যক্তিমালিকানা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতাটি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল।
পুঁজি যখন সুদ অর্জনকারী পুঁজি হিসেবে দেখা দিল তখন থেকেই মুদ্রা দিয়ে মুদ্রা অর্জন করার ভূমিকাটি দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকল। ফলশ্রুতিতে পুরনো সমাজটি পুঁজির করায়ত্তে চলে গিয়ে একটি নতুন সমাজব্যবস্থায় পরিণত হয়। ইউরোপীয় মহাদেশে বুর্জোয়া বিপ্লবের ফলে বেশ কয়েক দেশে সামন্ততন্ত্রের পতন হয়। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্ককে সামন্ততান্ত্রিক বন্ধন মুক্ত করে তার দ্রুত বিকাশের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়।
কৃষিতে ধনতন্ত্রবাদ এবং উৎপাদিকাশক্তি দ্রুত বিকশিত হয়। এ পথে কৃষিক্ষেত্রে ধনতন্ত্রবাদের বিকাশ ফ্রান্স ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিতে ধনতন্ত্রবাদ বিকাশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফরাসি বিপ্লব বড় বড় জমিদারী বিলোপ করে কৃষকদের হাতে জমি তুলে দিয়েছিল। তারপরর কৃষিতে ধনতন্ত্রবাদের বিকাশ কৃষকদের মধ্যে বৈষম্যের পথ ধরে অগ্রসর হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে ধনী কৃষকদের সম্মুখে টেনে এনে বৃহৎ ধনতন্ত্রী বৃদ্ধকে পরিণত করা হয়েছে। আর অপরদিকে গরিব কৃষকের জোক ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
পুঁজিবাদের উৎপত্তি কখন হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে সামাজিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পুঁজিবাদের ধারণা কৃষিনির্ভর সমাজ থেকেই উদ্ভব হয়েছে এবং এর চরম প্রকাশ ঘটে শিল্পবিপ্লবের মাধ্যমে। ভারতে এর বিকাশ লাভ ঘটে সামন্তবাদের পর কৃষকেরা ক্রমে ক্রমে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসার করে যখন পুঁজিবাদের সৃষ্টি করে। পুঁজিবাদী সমাজে অর্থই হলো সমস্ত উৎপাদনব্যবস্থার মূল উৎস। পুঁজিবাদী সমাজে মুনাফার জন্য শ্রমিক মজুর দ্বারা উৎপাদন ও তাদের হাতিয়ার হিসেবে উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করাই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। লেলিন দেখিয়েছেন যে, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা সর্বত্র একইভাবে বিকাশ লাভ করেনি। একই মৌল কাঠামোকে অপরিবর্তিত রেখে তিনটি পর্যায়ে এর স্বরূপ লক্ষ করা যায়। যেমন- বাণিজ্যিক পুঁজিবাদ, উপনিবেশিক পুঁজিবাদ এবং অর্থনৈতিক পুঁজিবাদ।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, পুঁজিবাদ হলো সমাজের এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি গড়ে তোলার ও ব্যবসায়ের দ্বারা অবাধ মুনাফা লাভের স্বাধীনতা থাকে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ধনদৌলতের মালিকানার নির্দিষ্ট কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম না থাকায় মানুষ ব্যক্তিগত ইচ্ছায় সম্পত্তি বাড়িয়ে সমাজে ধনী বলে আত্মপ্রকাশ করে। তাই ব্যক্তিগত সম্পত্তি হচ্ছে পুঁজিবাদী সমাজের প্রকৃত রূপ। পুঁজিবাদীব্যবস্থায় সমগ্র সামাজিককাঠামো ব্যক্তিগত মালিকানার উপর গড়ে ওঠে। সমাজে ধনিক শ্রেণির একক আধিপত্য দেখা যায়। আর এ পুঁজিবাদের উৎপত্তি সম্পর্কে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে কার্ল মার্কস যে মতবাদ বা তত্ত্ব প্রদান করেছেন তা সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যৌক্তিক ও বাস্তব।
