সমাজ বিকাশের বিশ্লেষণে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এর গুরুত্ব আলোচনা কর

সমাজ বিকাশের বিশ্লেষণে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের গুরুত্ব

ভূমিকা: সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, মননশীল জার্মান দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা কার্ল মার্কস (Karl Marx) শোষিত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির দূত হিসেবে পরিচিত। তিনি বিশ্বজুড়ে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থাকে কেবল ব্যাখ্যাই করেননি, বরং বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নির্মাণের মাধ্যমে এক নতুন বৈপ্লবিক দিগন্তের উন্মোচন করেছেন। মার্কসীয় চিন্তাধারার প্রতিটি স্তরে তাঁর যে তত্ত্বটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে, তা হলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism)। মূলত এই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে সমগ্র মার্কসীয় দর্শন। সমাজ বিকাশের ধারা, শ্রেণির সংঘাত এবং ঐতিহাসিক রূপান্তর বুঝতে হলে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের গুরুত্ব অপরিসীম। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা সমাজ বিকাশের বিশ্লেষণে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের ভূমিকা ও এর তাৎপর্য বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

সমাজ বিকাশের বিশ্লেষণে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের গুরুত্ব

সমাজ বিকাশের বিশ্লেষণে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের গুরুত্ব

নিম্নে সমাজ বিকাশের বিশ্লেষণে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের গুরুত্ব আলোচনা কর হলো-

১. বাহ্যিক বস্তুর অবস্থার কারণেই ধ্যানধারণার উদ্ভব হয় কেবল এতটুকুর উপর জোর দিলেই হবে না, বরং তাদের জন্মদাতা বস্তুর অবস্থার মধ্যে যে সক্রিয় সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার প্রতিও নজর দিতে হবে। যে বস্তুবাদ বস্তু ও ঘটনাপ্রবাহকে তাদের জটিল পারস্পরিক সম্পর্ক ও প্রকৃত গতির পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করে সেই দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের ধ্যানধারণাগুলো কীভাবে বস্তুর অবস্থার উপর প্রতিক্রিয়া করে এবং সমাজের সামগ্রিক ও জটিল বাস্তবতায় সেগুলো কী ভূমিকা পালন করে তা অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন সূতারের তার নিজের পেশার টুকিটাকি সম্পর্কে জ্ঞান আছে, ধারণাও আছে। এই ধারণাগুলো তার মনে বাহ্যিক বস্তুর গুণাবলির প্রতিফলন একবার মনে দানা বেঁধে গেলে এ ধারণাগুলো তার উৎপাদক কর্মের নির্ধারক উপাদান হিসেবে অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

২. শ্রমের ক্ষেত্রে যা সত্য সামাজিক ক্রিয়াকর্মের ক্ষেত্রে তা সাধারণভাবে সত্য। ধ্যানধারণাকে বাদ দিয়ে জনগণ তাদের সামাজিক কাজকর্ম সম্পাদন করে না। তদের মাথায় যে ধরনের ধ্যানধারণার উদয় হয় সমাজের বস্তুর জীবনব্যবস্থা ও বৈষয়িক কর্মাদি সেগুলোর উৎস নির্ণয় করে।

৩. বস্তুবাদী ধ্যানধারণার বশেই মানুষ কাজে নিযুক্ত হয়, যা বৈষয়িক জীবনের শর্তাবলির উপর প্রতিক্রিয়া ফেলে তাদের পরিবর্তিত করে।

৪. বৈষয়িক জীবনে নির্দিষ্ট শর্তাবলির ভিত্তিতে মানুষের সামাজিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়। এই শর্তগুলোই মস্তিষ্কপ্রসূত ধারণাতে প্রতিফলিত হয় এবং সেই ধারণা নিয়েই মানুষ সামাজিক কর্ম করে, যা বস্তুর জীবনব্যবস্থার উপর পাল্টা প্রভাব ফেলে।

৫. যা কিছু মানুষকে সচল করে তোলে সেটা তার মনের মধ্য দিয়ে সক্রিয় হতে বাধ্য। কিন্তু তার মনে এর কী রূপ দাঁড়াবে তা নির্ভর করে পরিস্থিতির উপর।

৬. সমাজ বিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে বস্তুর ধ্যানধারণাগুলো দ্বৈত ভূমিকা পালন করে। হয়ত তারা সমাজ বিকাশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। নয়ত তার সামনে বাধা সৃষ্টি করে।

৭. সামাজিক ধ্যানধারণার বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, বৈষয়িক জীবনের যে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিকাশের ভিত্তিতে তাদের জন্য হয়, সেই পরিস্থিতি লুপ্ত বা লুপ্তপ্রায় হয়ে যাবার পরেও তারা টিকে থাকে।

৮. পুরানো জীবনযাত্রা পদ্ধতিজাত যেসব ধ্যানধারণা পুরনো জীবনাবস্থা নিশ্চিহ্ন হবার পরও অথবা নিশ্চিহ্ন হবার মুখে এলেও তাদের প্রভাব বজায় রেখে চলে এবং সেগুলো আসলে প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীল শক্তি হিসেবে নতুন প্রগতিশীল সমাজবিকাশকে ব্যাহত করে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, শ্রেণিবিভক্ত মানব সমাজব্যবস্থায় ধ্যানধারণাগুলো বিভিন্ন শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রবণতাকে প্রতিফলিত করে। সমাজের মধ্যকার শ্রেণিসংগ্রামও পরিচালিত হয় ধ্যানধারণার মাধ্যমে। তাই শ্রেণিসংগ্রামের সমস্ত জটিলতার প্রতিবিম্বস্বরূপ ধ্যানধারণার জগতে কখনো আপাত শান্তি, কখনো প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব, জয়-পরাজয়, মৈত্রি-বিচ্ছেদ, আপোশ-মীমাংসা কৌশল এবং নেতৃত্বের পদ দখলের লড়াই দেখা যায়।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন