বস্তুবাদ কী? মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ
ভূমিকা: প্রাচীন প্রাক-মার্কসীয় বস্তুবাদী ধারণা অনুসারে বস্তু হলো কেবল ভৌত সত্তা, ক্ষুদ্রকণা, পরমাণু বা সূক্ষ কণিকা, যা দিয়ে বিবিধ সত্তা গঠিত। আবার, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীদের বস্তু সম্পর্কের ধারণা কেবলমাত্র পরমাণুর গণ্ডিতে নিবদ্ধ। কিন্তু মার্কসীয় দার্শনিক চিন্তায় বস্তুবাদে বস্তুর ধারণাটি ব্যাপকতর অর্থে গৃহীত হয়েছে।
বস্তুবাদ:
বস্তুবাদ এমন একটি তত্ত্বভিত্তিক মতবাদ, যা জড় বা বস্তুকে বিশ্বজগতের আদি সত্তা বলে মনে করা হয়। এক্ষেত্রে গতি হলো বস্তুর ধর্ম। বস্তুবাদী ধারণা অনুসারে বস্তুই আগে এসেছে এবং চেতনা পরে। অর্থাৎ, বস্তু হলো প্রাথমিক ধারণা এবং চেতনা হলো গৌণ ধারণা। বস্তুবাদীরা নিরপেক্ষ বিষয়ের পৃথক অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। বস্তুবাদের মূল কথা হলো 'বস্তুই জগতের আদি উপাদান। জগতের সকল কিছুই বস্তু থেকেই উদ্ভূত।
মার্কসীয় দর্শনে বস্তুর ৪টি মূল বক্তব্য:
১. এটি (বস্তু) একটি দার্শনিক ধারণা। লেনিনের ভাষায়, এটি দর্শনশাস্ত্রের একটি প্রত্যয়, যা বস্তুর বাস্তবসত্তাকে প্রকাশ করে এবং যা মানুষের ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভূত হয়। ইন্দ্রিয়াগুলো বস্তুকে নকল করে, তার ছবি তুলে এবং আমাদের অনুভূতিতে বস্তুর প্রতিফলন ঘটে।"
২. বস্তুর রূপগত পার্থক্য সত্ত্বেও সকল বস্তুর একটা সাধারণ গুণ রয়েছে, তা হলো তাদের বস্তুসত্তা বা Materiality এবং
বাস্তবতা বা Olejectivity। স্বতন্ত্র অড়িত্ব ও রূপগত পার্থক্য সত্ত্বেও বস্তু এবং প্রাকৃতিক ঘটনাবলি সকলই হলো বস্তুময়।
৩. দার্শনিক বস্তুবান মনে করে বস্তুকে সৃষ্টি করা যায় না এবং ধ্বংসও করা যায় না। তবে বস্তুর পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটে। বস্তু স্থির ও নিশ্চল নয়। মার্কসীয় ধারণা অনুসারে বস্তু বলতে গতিময় বস্তুকে বুঝানো হয়। অর্থাৎ, বস্তু শাশ্বত পরিবর্তনশীল।
৪. বস্তু অজ্ঞেয় নয়, বস্তুবিশ্বের বাস্তবসত্তাই হলো এর প্রধান ধর্ম এবং মানবমনের বস্তুর প্রতিফলন ঘটে। তাই একে জানা যায়। দার্শনিক বস্তুবাদ মনে করে বিজ্ঞান ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে বস্তুজগৎ এবং নিয়মাবলিকে জানা যায়। প্রকৃত অর্থে এটাই মার্কলীয় দার্শনিক বস্তুবাদী ব্যাখ্যা।
পরিশেষে বলা যায় যে, মার্কসের বস্তুবাদের মূল ভিত্তিই হলো বস্তুজগৎ। বস্তুজগৎ-এর মধ্যকার পারস্পরিক সংযোগ, দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্যকে ঘিরে মার্কসের বস্তুবাদের বিকাশ লাভ করে।
মাকর্সের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের বৈশিষ্ট্য:
মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম একটি উপাদান হলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। জার্মান দার্শনিক হেগেলের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মার্কস তার দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ধারণাটির আলোচনা করেন। যদিও দুজনের বস্তুবাদের মধ্যে বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা যায়। নিম্নে মাকর্সের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরা হলো-
১. পরিবর্তনশীল
দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ হলো বিকাশের সর্বাপেক্ষা সার্বজনীন ও সুগভীর তত্ত্ব। এই তত্ত্ব পৃথিবীর যে-কোনো অস্ত্র ও মার্কসবাদকে অপরিবর্তনীয় বিষয় হিসেবে পরিগণিত করে না। এ মতবাদে সবকিছুই বিকাশমান ও সদা পরিবর্তনশীল।
২. বিকাশমান
মানুষের আজকের যে অবয়ব তা সুদীর্ঘ বিবর্তনের ফসল। নিজের চাহিদা অনুযায়ী মানুষ যে সমাজ বিনির্মাণ করেছে তা এই একই প্রক্রিয়ায় বিকশিত হচ্ছে। এক সমাজব্যবস্থা থেকে অন্য সমাজব্যবস্থায় উন্নীত হচ্ছে। তবে, বিকাশ বলতে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদে শুধু পরিবর্তনকেই বোঝায় না। যা কিছু নতুনভাবে উৎপত্তি হয়েছে এবং যা পুরাতন অবস্থা থেকে স্বতন্ত্র, তাই বিকাল।
৩. বস্তুজগৎ গতিশীল
দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব অনুযায়ী বস্তুজগৎ স্থির নয়, বরং গতিশীল। অপরিবর্তনীয় নয়, বরং পরিবর্তনশীল। প্রতিনিয়তই বস্তুজগৎ বিবর্তিত ও বিকশিত হচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোনো কিছুর উৎপত্তি ঘটছে আবার অবসানও ঘটছে। আয়তনে বৃহৎ হওয়াই বিকাশ নয়, বিকাশ বলতে বোঝায় পুরাতন পর্যায় হতে গুণগতভাবে স্বতন্ত্র এক নতুন পর্যায়ে উত্তরণ।
৪. উচ্চতর ও নতুনের দিকে অগ্রসরমান
দ্বন্দ্বিক বস্তুবাদে বিকাশ হলো সরল থেকে জটিল ও নিম্ন থেকে উচ্চ পর্যায়ে উত্তরণ। পুরাতনকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে নতুনের দিগ্বিজয় হলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। নতুনের সৃষ্টি হয় বিকাশের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ও অব্যাহত গতিতে ধ্বংস ও সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলমান। ফলে পুরাতনের অবসান আর নতুনের সূচনা ঘটছে। সুতরাং বস্তুজগতের বিকাশ বুঝতে হলে কাংস ও সৃষ্টি তথা পুরাতন ও নতুনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বুঝতে হবে। বিকাশের ধারায় নতুনের যে সূচনা ঘটেছে তা অপেক্ষাকৃত উন্নত, অপরাজেয় এবং প্রগতির দিকে ধাবিত।
৫. পুরাতনের বিলুপ্তি ও নতুনের উদ্ভব
দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মতে, পুরাতনের পরাজয় সুনিশ্চিত এবং নতুনের বিজয় অবশ্যম্ভাবী। এর কারণ হলো- পুরাতন রক্ষণশীল এবং ধ্বংসের দিকে ধাবমান, আর নতুন সৃষ্টি ও প্রগতিশীল। স্ট্যালিনের মতে, সমাজে যা নতুনভাবে জন্ম নেয়, তা শুরুতে দুর্বল হলেও শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। কারণ নতুন হলো প্রগতিশীল। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো সর্বহারা শ্রেণি। তারা বর্তমানে পুঁজিবাদী সমাজে শোষিত হলেও, ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে তারাই জয়ী হবে এবং পুঁজিবাদী (পুরাতন) ব্যবস্থার বিনাশ ঘটাবে।
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, মার্কসীয় দ্বন্দ্ববাদের মূল ভিত্তি হলো বস্তুজগৎ। আর বস্তুজগৎ সদ্য পরিবর্তনশীল ও বিকাশমান। সমাজ প্রতিনিয়ত এক ব্যবস্থা থেকে অন্য বাবস্থায় পদার্পণ করছে। এই পরিবর্তনশীল ও গতিশীল সমাজব্যবস্থাকে বুঝিয়েছেন কার্ল মার্কস তার দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মাধ্যমে।
