ভারতীয় সমাজে পুঁজিবাদ বিকাশে প্রতিবন্ধকতাসমূহ আলোচনা কর

ভারতীয় সমাজে পুঁজিবাদ বিকাশে প্রতিবন্ধকতাসমূহ

ভূমিকা: বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে ভারতকে বলা হয় পৃথিবীর সারসংক্ষেপ। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এ অঞ্চল নানা সম্পদের প্রাচুর্যে ভরা। তবুও ইউরোপের মতো ভারতবর্ষে পুঁজিবাদ বিকাশ লাভ করেনি। এখানকার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সামন্তবাদের কাঠামোর জন্য পুঁজিবাদ বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছিল।

ভারতীয় সমাজে পুঁজিবাদ বিকাশে প্রতিবন্ধকতাসমূহ

ভারতীয় সমাজে পুঁজিবাদ বিকাশের অন্তরায়/প্রতিবন্ধকতাসমূহ:

নিম্নোক্ত বিষয়াবলি ভারতীয় উপমহাদেশে পুঁজিবাদ বিকাশের পথে অন্তরায় হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে-

১. স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামগোষ্ঠী:

ভারতবর্ষের ইতিহাস দেখলে দেখতে পাই যে, এখানে বিভিন্ন রাজার পরিবর্তন হয়েছিল। সিংহাসন একজনের হাত থেকে অন্যজনের হ্যায় হস্তান্তরিত হতো। কিন্তু এ পরিবর্তন ভারতবর্ষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রাম স্পর্শ করতে পারেনি। এ অপরিবর্তনীয় রূপ দেখে ইংরেজি মনীষী ১৮ Charles Metcaffe ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রাম Little Republic বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ এসব গোষ্ঠী ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাদের এই স্থিতিশীল সামাজিক কাঠামোর দ্বারা ব্যক্তিগত মালিকানা ও সম্পদের অধিকারী হওয়ার কোনো সুযোগ না থাকায় ভারতবর্ষে পুঁজিবাদ বিকশিত হয়নি।

২. স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম অর্থনীতি:

প্রাক-ব্রিটিশ আমলে ভারতের সমাজকাঠামো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারতের গ্রামগুলোতে ছিল স্বনির্ভর অর্থনীতি। গ্রামের মানুষ স্বনির্ভর (Self-sufficient)। তাদের ছিল গোয়লভরা গরু, গোলাভরা ধান আর পুকুর ভরা মাহু গ্রামবাসীধা নিজেদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি নিজেরাই তৈরি করত। অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থার জন্য গ্রামগুলো ছিল পরস্পরবিচ্ছিন্ন। বাইরের সাথে কোনো যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় এদের সমাজে নেমে এসেছিল স্থবিরতা, যার ফলে সমাজকাঠামো ছিল স্থিতিশীল। ইউরোপের মতো এদেশে শিল্প প্রসার লাভ করতে পারেনি। তা ছাড়া কৃমিনির্ভর অর্থনীতি থাকাতে ব্যক্তিগত মালিকানার ভিত্তিতে সমাজে আধিপত্য বিস্তারের পথও সুগম ছিল না। ফলে, ইউরোপের বণিকশ্রেণির মতো ধনসম্পাদর মালিক হয়ে সমাজে আধিপত্য বিস্তার ও মর্যাদা অর্জনের সুযোগ ছিল না। এ কারণেই পুঁজিবাদ বিকাশ সম্ভব হয়নি।

৩. জাতিভেদ প্রথা:

ভারতের সমাজব্যবস্থার জাতিভেদ প্রথা পুঁজি বিকাশের ক্ষেত্রে একটি বিরাট প্রতিবন্ধকতার কারণ ছিল। হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথার কঠোরতা থাকায় সকলে মিলে মিশে একসাথে কাজ করার কোনো সুযোগ ছিল না। তা ছাড়া ভারতের সমাজে এমন এক যুগ ছিল যখন একজন শূদ্রের তৈরি খাবার একজন ব্রাহ্মাণ ক্রয় করত না। এজন্য ভারতে ইউরোপীয় সয়াজের মতো ব্যবসা দ্রুত উন্নতি লাভ করতে পারেনি। পুঁজিবাদ উত্তরণের পথে ভারতীয় জাতিভেদ প্রথা ছিল এক কঠিন প্রাচীর বিশেষ। জাতিভেদ প্রথা অনুযায়ী পেশাগত জন্মগতভাবেই প্রকৃতি কর্তৃক নির্ধারিত। অতএব, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ব্যক্তিকে একটি বিশেষ পেশার মধ্যেই আবদ্ধ থাকতে হতো। অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপে ব্যক্তি তাই গতিশীল ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এ ছাড়া ছিল অস্পৃশ্যতার নীতি। অস্পৃশ্য নীতি থাকাতে শ্রম বিনিয়োগে বাধ্যবাধকতার সৃষ্টি হয়।

৪. সামন্তবাদের সম্পর্কের অভাব:

এদেশে ইউরোপীয় সামন্তবাদের মতো কৃষকদের বা সামন্ত প্রভুদের জমির মালিকানার দায়িত্ব না থাকার দরুন কৃষকরা নির্দিষ্ট আয়ের মাধ্যমে জীবিকানির্বাহ করত। ফলে এদেশের কৃষকদের হাতে যে টাকা-উপার্জিত হতো তা দিয়ে পুঁজিপতি হওয়ার সুযোগ ছিল না।

৫. ব্যক্তিগত সম্পক্তির অনুপস্থিতি:

ভারতবর্ষে মোগল সম্রাটের আমলে কেউ তার বংশধরকে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করতে পারত না। এখানে গোষ্ঠীগতভাবে জমি চাষ করা হতো। এদেশের সমাজবাসস্থায় ভূমি মালিকানা কেউ বাক্তিগতভাবে অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। ফলে ব্যক্তিগতভাবে মালিক হওয়া সম্ভব হয়নি। ব্যক্তিমালিকানার অনুপস্থিতিতে পুঁজিবাদ বিকাশ লাভ করতে পারেনি।

৬. শহর ও নগরের অভাব:

ভারতের গ্রামগুলো ছিল একদিকে স্বনির্ভর, অপরদিকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এজন্য এসেশে ইউরোপীয় দেশের মতো শহর ও নগর গড়ে উঠতে পারেনি। সমাজে এ স্থবিরতার জন্য বিদেশের পণ্য আমদানি ও বিদেশের সাথে যোগাযোগ সহজে গড়ে ওঠেনি। ব্যবসায় বাণিজ্যের ক্ষেত্র নিজস্ব গড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এদেশের ব্যবসায়ীরা জীবিকানির্বাহের প্রয়োজনে ব্যবসায় করত। সেজন্য পুঁজি ছিল সীমিত। এ সীমিত পুঁজি নিয়ে নগর পত্তনের কল্পনা কোনো ব্যবসায়ী করেনি।

৭. যোগাযোগব্যবস্থা:

পুঁজিবাদ বিকাশের জন্য সহায়ক উপাদান হচ্ছে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা। কিন্তু ভারতের যোগাযোগব্যবস্থা ছিল অনুন্নত। যোগাযোগব্যবস্থা অনুন্নত থাকার ফলে ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রসার লাভ করতে পারেনি। ফলে, পুঁজি সঞ্চয়ের পথে বাধার সৃষ্টি হয়েছে।

৮. ভৌগোলিক অবস্থা:

ভারতীয় উপমহাদেশ পুঁজিবাদ বিকাশের জন্য ভৌগোলিক অবস্থান একটা বড় ধরনের অন্তরায় ছিল। ভৌগোলিক কারণেই এখানে গড়ে উঠেছিল জলসেচ অর্থনীতি ও স্বৈরতন্ত্র। কার্স মার্কস ও কার্ল উইট ফোগেল ভারতীয় উপমহাদেশের বিশেষ ভৌগোলিক পরিবেশ ও জলসেচ অর্থনীতিকে পুঁজি বিকাশের অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

৯. জনসংখ্যার আধিক্য:

অনুকূল আবহাওয়ার ফলে ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল বেশি। বাড়তি জনশক্তি কৃষিকাজে নিয়োজিত থাকলেও কৃষি অর্থনীতিতে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়ন না থাকায় পুঁজি গঠনে তেমন কোনো সুব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারেনি।

১০. অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয়:

ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ রাজা ও সম্রাটরা ছিলেন বিলাসপ্রিয়। অর্থসম্পদ উৎপাদন খাতে ব্যয় না করে বিলাসব্যাসনে ব্যয় করত। তা ছাড়াও এদেশের সাধারণ মানুষ বিয়েশাদি বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে অযথা টাকা পয়সা খরচ করে তৃপ্তি লাভ করত। এহেন প্রবণতা পুঁজি গঠনে নিরুৎসাহিত করেছে।

১১. ধর্মের প্রভাব:

ভারতের সমাজব্যবস্থায় ধর্মের প্রভাব অপরিসীম। ধর্মকে অবহেলা করে কোনো কাজ কেউ সহজে করতে সাহস পায়নি। এ ধর্মীয় মনোভাবের প্রভাবের ফলে সুদ খাওয়া, অধিক মুনাফা অর্জন করা মুসলমানদের পক্ষে সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। হিন্দুদের মধ্যেও জাতিতেন থাকার সরুন এক জাতির তৈরি দ্রব্য অন্য জাতির ব্যবহার করা নিষিদ্ধ ছিল।

১২. ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন:

ভারতীয় সমাজে ইউরোপীয় সমাজের মংতা ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন দেখা যায়নি। Wahes এর মতে, "এখানে ধর্ম পার্থিব জগৎকে বেশি গুরুত্ব ভারতীয় সমাজে পুঁজিবাৰ বিকাশ না হওয়ার কারণ এদের বিশেষ। ধরনের ঐতিহ্য, যা ইহলৌকিক জগতের চেয়ে পারলৌকিক জগৎকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

১৩. বিনিয়োগের অভাব:

ভারতীয় সমাজে বিভিন্ন সামাজিক উৎসবসমূহও বিভিন্ন আচারানুষ্ঠানে ব্যয় করার রেওয়াজ থাকলেও উৎপাদনশীল খাতে অর্থ বিনিয়োগের তেমন উৎসাহ দেখা যায়নি। ফলে পুঁজিৰান বিকশিত হয়নি।

১৪. জীবন দর্শন:

ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ ছিল অতিথিপরায়ণ ও অল্পে তুষ্ট। কোনোরূপ মেয়ে-পরে জীবন কাটিয়ে দিতে পারাটাই তাদের জীবনের চাহিলা। অথবা অতিদি আগমনে তাকে কোথায় বসতে দেবে, কী খেতে দেবে এ নিয়ে সাড়া ফেলে দিত। জীবন দর্শনের এহেন পরিস্থিতি পুঁজিবাদ বিকাশে অন্তরায় হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।

১৫. উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বাজার পণ্যে পরিণত না হওয়া:

ভারতীয়দের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বাজারপণ্যরূপ পরিগ্রহ হরনি। তারা উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর উদ্বৃত্ত অংশ বাজারে নিয়ে বিক্রি করাকে অসম্মানের চোখে দেখত। তাই পুঁজি গঠনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে।

১৬. গারিশ্রমিক দেওয়া হতো পণ্যে:

ভারতীয় সমাজ কাঠামোর ব্যাখ্যায় দেখা যায় পারিশ্রমিক প্রদানের ক্ষেত্রে অর্থের পরিবর্তে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী দেওয়া হতো। যার রেওয়াজ বর্তমান বাংলাদেশের গ্রাম্য জীবনে এখনো রয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে মসজিদের ইমাম সাহেবের বেতন পরিশোধ করা হয় মৌসুমি ফসলের বিনিময়ে। তাই পুঁজিবাদ বিকশিত হতে পারেনি।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, পাক-ভারত উপমহাদেশে ধনতন্ত্রের বিকাশের অন্তরায় এককভাবে কোনো কারণ দায়ী নয়। অনেকগুলো কারণ একত্রিত হয়ে পুঁজি বিকাশের পথকে করেছে দুর্গম। প্রশাসন ব্যবস্থা, গ্রামীণ জনসাধারণের চিন্তাধারা, বিদেশি শাসন-শোষণ ও স্থায়ী অর্থনীতি ইত্যাদি বহুবিধ কারণ একত্রিত হয়ে সৃষ্ট প্রতিকূলতা উপমহাদেশে ধনতন্ত্র গড়ে ওঠার পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছিল। ফলে এখানে আর্থসামাজিক উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। কিন্তু ভারতবর্ষে যে ধনতন্ত্র ছিল না। এ কথা বলা যায় না। তবে তার বিকাশ ঘটে বহু পরে অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনামলে। তাই বলা যায়, "ভারতবর্ষের তখনকার ধনতন্ত্র ছিল মূলত ব্রিটিশদের কাছ থেকে আমদানিকৃত ধনতন্ত্র।"

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন