পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিনিময় ব্যবস্থার সাথে বস্তুভক্তিবাদের সম্পর্ক আলোচনা
ভূমিকা: কার্ল মার্কসের মতে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে কোন একটি বস্তু উপাদান পণ্যায়ন বা Commodification বা Commodization প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্রমশ ভোগ্য পণ্যতে রূপান্তরিত হয় যা পরে বস্তুভক্তিবাদ তৈরি করে বিভিন্নভাবে এই রূপান্তরণের ব্যাখ্যা মার্কসীয় মূল আলোচনায় পাওয়া যায়। তবে মার্কস-পরবর্তী তাত্ত্বিকরাও বিভিন্ন সময়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে পণ্যভক্তিবাদ তৈরি হবার প্রক্রিয়ার বিষয়ে আলোচনা বিস্তৃত করেছেন।
পুঁজিবাদী অর্থনীতি বিনিময় ব্যবস্থার সাথে বস্তুভক্তিবাদের সম্পর্ক
নিম্নে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বস্তুভক্তিবাদ উদ্বৃত হবার প্রক্রিয়াগুলো আলোচনা করা হলো-
১. পুঁজির বস্তুতে রূপান্তর
প্রকৃতিতে প্রাপ্ত বিভিন্ন বস্তু; যেমন- খাদ্য, বাতাস, ইত্যাদি যতদিন মানুষ সরাসরি ব্যবহার করতে পারত ততদিন পর্যন্ত এগুলোকে পণ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। কিন্তু যখন থেকে এইসব উপাদানের ওপর পুঁজিভিত্তিক বিনিয়োগ শুরু হয় তখন থেকে তা পণ্য রূপান্তরিত হয়। যেমন-বাতাস প্রকৃতিতে থাকে এবং তা আমরা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করি। তখন বাতাসকে পণ্য বলা হয় না। কিন্তু বাতাস দিয়ে যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন যন্ত্র তৈরি করা হয় পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে, তখন বাতাস পুঁজির বস্তুতে পরিণত হয়। অর্থাৎ, বাতাস তখন হয়ে ওঠে বিদ্যুৎ তৈরির কাঁচামাল বা পণ্য। পুঁজির বস্তুতে পরিণত হলে পণ্যের মূল্যের সাথে পুঁজির বিনিয়োগ মূল্যও যুক্ত হয়।
২. বিনিময় মূল্যব্যবস্থার প্রবেশ
যখন কোনো বস্তু উপাদান মানুষ এমনিই ব্যবহার করে তখন তার শুধু ব্যবহারিক মূল্য থাকে। কিন্তু যখন তা বিনিময়ের মাধ্যমে উপযোগ বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হয় তখন তার বিনিময় মূল্য বা exchange value তৈরি হয়। এই বিনিময় মূল্যের ধারণা যত বেশি বস্তুতে যুক্ত হতে থাকে, ততই বস্তু পণ্যে রূপান্তরিত হতে থাকে।
৩. শ্রমের বস্তুতে রূপান্তরিতকরণ
যত বেশি বস্তু উপাদান পুঁজির বস্তুতে পরিণত হতে থাকে ততই সেই উপাদানের ওপর শ্রম প্রয়োগ বাড়তে থাকে। এভাবে বস্তু উপাদান পুঁজির বস্তু হতে ক্রমশ শ্রমের বস্তুতে পরিণত হয়। শ্রম বস্তুতে পরিণত হলে তার ওপর যে শ্রম প্রয়োগ হয় সেই শ্রম মূল্য বস্তুর মূল্যের সাথে যুক্ত হয় এবং বস্তু পণ্যে রূপান্তরিত হয়।
৪. পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিবর্তন
সমাজ পুঁজিবাদীব্যবস্থায় সম্পূর্ণরূপে রূপান্তরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সমাজের বিভিন্ন বস্তুর পণ্যে রূপান্তরিত হবার প্রয়োজন অনুভূত হয়নি। কারণ পুঁজিবাদী সমাজের আগের সমাজগুলোতে পণ্যের বিনিময় মূল্যের ধারণা সক্রিয় ছিল না। কিন্তু পুঁজিবাদী রূপান্তরণের ফলে বিনিময় মূল্যের ধারণা আসে এবং ব্যবহার উপাদানকে পণ্যে রূপান্তরিত করা হয়।
৫. বস্তুর বিভিন্নমুখী ব্যবহারের ধারণা
একটি বস্তু দ্বারা যখন একটি মাত্র চাহিদা বা প্রয়োজন নিবৃত্ত হয় তখন তা পণ্য হয়ে উঠলেও তা উক্ত মূল্যের পণ্য হয়ে ওঠে না। কিন্তু যখন একটি উপাদান দ্বারা একাধিক চাহিদা নিবৃত্ত হয় তখন উক্ত মূল্যের পণ্যে পরিণত হয়। যেমন- খাদ্য শস্য দ্বারা যদি ক্ষুধা নিবৃত্ত করা হয় তখন তা পণ্যভিত্তিক উৎপাদন ছাড়াও শুধু ব্যবহারভিত্তিক উৎপাদন দ্বারাই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব কিন্তু খাদ্য। দ্বারা যদি মানর ক্ষুধা, পেটের ক্ষুধা ও চোখের ক্ষুধা তিন ধরনের ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে হয় তাহলে খাদ্যের বিভিন্নমুখী দাম বাড়তে থাকে এবং খাদ্য ক্রমশ একটি খাদ্যপণ্যে পরিণত হতে থাকে।
৬. উৎপাদনব্যবস্থার সামাজিকীকরণ
বস্তু উপাদান যখন সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে উৎপাদিত হয় তখন উৎপাদন ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন ধরনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। উৎপাদন মাত্রিক যেমন বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেন, ব্যবস্থাপক উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় অংশ নেন এবং শ্রমিক কাজে অংশগ্রহণ করেন। শ্রমিক এভাবে অংশগ্রহণের প্রেক্ষিতে উৎপাদনের প্রতিটি অংশের পণ্যের ওপর আংশিক অধিকারের ভিত্তি তৈরি হয়। এভাবে বস্তু উপাদান একটি ব্যক্তি উপাদানে পরিণত হয় অর্থাৎ পণ্যে রূপান্তরিত হয়।
৭. লভ্যাংশের ধারণা
যত দিন পর্যন্ত বস্তু উপাদান বিনিময়ের মাধ্যমে নিজের লভ্যাংশ তৈরি বা প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি করায় ধারণা সমাজের প্রচলিত ছিল না, ততদিন পর্যন্ত বস্তু উপাদানফে পণ্য হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। যখন থেকে বস্তু উপাদান ব্যবহার করে লাভ করার ধারণা বিকশিত হলো তখনো বস্তু উপাদান পণ্যে পরিণত হলো।
৮. উদ্বৃত্ত মূল্যের ধারণা
শ্রমিকের শ্রমকে কম মজুরিতে ক্রয় করে যন্ত্র উপদানের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মনোয়নের মাধ্যমে তার মূল্য উদ্বৃত্ত করে মালিকের নিজের লাভ বাড়ানোর প্রবৃত্তিকে উদ্বৃত্ত মূল্য বলে এবং উদ্বৃত্ত মূল্যকে আবৃত্ত বেশি উদ্বৃত্ত করার প্রভৃতি হতেই বস্তু উপাদান ক্রমশ পণ্যে পরিণত হতে থাকে।
৯. শ্রমবিভাজনের বিকাশ
সমাজে শ্রমবিভাজনের ধারণা যতদিন পর্যন্ত বিকশিত হয়নি ততদিন পর্যন্ত বস্তু উপাদানের উৎপাদন ও তার জোজাকরণ সরলভাবেই ঘটত, ফলে তা পণ্যয়নের দরকার ছিল না। কিন্তু সমাজের শ্রম বিভাজন যত বাড়তে থাকে, একটি বস্তু উপাদানকে তত বেশি শ্রম প্রক্রিয়ায় মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয় এবং এই বিভিন্ন প্রক্রিয়ার শেষে উপাদানটি আর সরল বস্তু উপাদান থাকে না, পণ্যে পরিণত হয়।
১০. বাজারজাতকরণ
উৎপাদনব্যবস্থা ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা যতদিন পৃথক হয়নি ততদিন সমাজে বিভিন্ন উৎপাদিত বস্তু পণ্য হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু বাজারব্যবস্থা প্রসারণের ফলে এবং উৎপাদন হতে পৃথকীকরণের ফলে বাজারের সামাজিক অংশের সদস্যদের আবার বস্তু উৎপাদনের বিপণন করার কথা শ্রম প্রদান করতে হয়। এভাবে বাজারের মানুষরাও বস্তু উপাদান হতে লভ্যাংশ সংগ্রহের চেষ্টা করে। এভাবে বস্তুর বাজায়ীকরণ প্রক্রিয়া তাকে পণ্যে পরিণত করে।'
১১. সম্পত্তির ধারণা বিকাশ
সমাজে যখন সম্পত্তির ধারণা বিকশিত হয়নি তখন সম্পত্তি বাড়ানোর প্রবৃত্তি মানুষের মধ্যে ছিল না। কিন্তু সম্পদের ধারণা বিকশিত হবার সাথে সাথে নিজের সম্পত্তি বাড়ানোর ধারণাও মানুষের মধ্যে বাড়তে থাকে। ফলে মানুষ বিভিন্ন ব্যবহার বস্তুকে তার সম্পত্তিতে পরিণত করে ফেলতে চায় এভাবে অনেক ব্যবহারিক বস্তুই ক্রমশ পণ্যে পরিণত হতে থাকে।
১২. বাণিজ্যিকীকরণ বিস্তার
বাণিজ্যিকীকরণের ধারণা যত বাড়তে থাকে তত বেশি লভ্যাংশ তৈরি এবং আরও বেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে পণ্যকে আরও বেশি মূল্যবান করবার প্রবৃত্তি বিস্তৃত হতে থাকে। ফলে খুব স্বাভাবিক সাধারণ বস্তুও বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের উপাদানে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ, পণ্যে পরিণত হয়।
১৩. বিপণন খাতের বিকাশ
সাধারণ বস্তু উপাদান বাণিজ্যিক করে তোলার জন্য তাকে এক ধরনের বিপণন প্রক্রিয়ায় মধ্য দিয়ে যেতে হয়, বিপণন যত বেশি স্তরবিশিষ্ট হয় তত বেশি ধাপের মধ্য দিয়ে পণ্যটিকে তার বাণিজ্যিক গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হয় এবং এই অগ্রসর হযায় প্রক্রিয়ায় বস্তুটি পণ্যে পরিণত হয়। পণ্যে পরিণত করবার জন্য বস্তুটিকে বিভিন্নভাবে ব্র্যান্ডিং, ও প্যাকেজিং ইত্যাদি করার মাধ্যমে পণ্যে পরিণত করে ফেলা হয়।
১৪. বস্তুভক্তিবাদ বিকাশ
ব্যবহারিক বস্তু বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যখন পণ্যে রূপান্তরিত হয় তখন এই পণ্যটির ওপর বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ ব্যয় এবং বিপণন ব্যয়ের মাধ্যমে উৎপাদন, বাজারীকরণ, বিপণন প্রতিটি স্তরের ব্যক্তিরা এর উপর একটি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেন এবং এই নিয়ন্ত্রণ মাত্রার ভিত্তিতে তারা ঐ বস্তুর বিক্রয়মূল্য হতে লাভের হিসাব করেন। পণ্যের উপর এই বিভিন্নমূখী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে পণ্যের বিভিন্নমুখী মালিকানা প্রতিষ্ঠা হয় এবং এর ফলে বস্তুটি বিভিন্ন মালিকানার পণ্যে পরিণত হয়।
১৫. মানবিকতা শূন্যকরণ
বস্তু বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যত সমগ্র মানবিক সম্পর্কের পরিসর হতে যত দূরে সরে যেতে থাকে তাতই এর পণ্য হয়ে ওঠার সম্ভাবণ্য বাড়তে থাকে। এর একটি সময়ে বস্তুর পণ্য সম্ভাবনা এত বেশি প্রবণ হয়ে ওঠে যে তার থেকে সবধরনের মানবিকতাবিবর্জিত হয়ে যায় এবং তা সম্পূর্ণ পণ্যে রূপান্তর হয়।
১৬. বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম প্রয়োগ
যখন থেকে বস্তুতে শারীরিক শ্রমের সাথে সাথে যুক্তিবৃত্তিক শ্রম প্রদানও শুরু হলো তখন থেকেই বস্তুর বিনিময় মূল্য আরও বেড় গেল এবং তা আরও বেশি পণ্য হয়ে উঠতে শুরু করে।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও বস্তুভক্তিবাদ গভীর সম্পর্কে সম্পর্কিত। কেননা কতকগুলো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এ দুয়ের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সর্বপ্রথম বস্তুর প্রচলন হলেও পুঁজিবাদী বিনিয়োগের মাধ্যমেই তা পণ্যে রূপান্তরিত হয়।
