পণ্য বস্তুভক্তিবাদ কী? পণ্যের বিনিময় মূল্য ও ব্যবহারিক মূল্য
ভূমিকা: বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জনক হিসেবে খ্যাত জার্মান দাশনিক কার্ল মার্কস আধুনিককালের সমাজতাত্ত্বিক আলোচনার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত পরিচিত নাম। কার্ল মার্কসের একটি বিখ্যাত গ্রন্থ হচ্ছে পুঁজি, যেখানে তিনি পণ্যদ্রব্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে তার মতবাদ তুলে ধরেন। আর এর পাশাপাশি অন্যের ব্যবহার উপযোগিতাকে কেন্দ্র করে আরেকটি বিষয়ের অবতারণা করেন, যার নাম পণ্য বস্তুভক্তিবাদ।
পণ্য বস্তুভক্তিবাদ:
পণ্যের বস্তুভক্তিবাদ আদি ধর্মবিশ্বাসের একটি ধরন, যাতে বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে অতিপ্রাকৃত গুণাবলি কল্পনা করে ঐসব বস্তুর পূজা করা হতো। যেমন- বিশেষ কোন পাথর, পর্বত, মাটি ইত্যাদি। মার্কস পুঁজিবাদী সমাজে পণ্যের ক্ষেত্রে এরূপ বিশ্বাসের পুনারাবৃত্তি লক্ষ করে পণ্যকে বস্তুভক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন।
পণ্য একটি বস্তুভক্তি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কারণ এই যে, ব্যক্তিগত মালিকানাভিত্তিক পুঁজিবাদী সমাজে বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্ক প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নয়। বরং বাজার, যেখানে বিভিন্ন পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় তথা বিনিময় ঘটে থাকে, সেই বাজারের মাধ্যমেই তা কার্যকরী হয়। আর পণ্য বা বস্তু বাজারে বিক্রয়ের জন্য উৎপাদিত হয়ে থাকে বিধায় পণ্যের উৎপাদকগণ বিনিময়ের জন্য সম্পূর্ণভাবে বাজারের ওপর এবং সেখানে পণ্যের দামের ওঠা-নামার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ বাজারে নির্ভরশীলতার কারণে পণ্য, অর্থ ইত্যাদি উৎপাদকের কাছে অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতার অধিকারী বস্তু বলে বিবেচিত হয় এবং মানুষ বাজারে পাঠানোর পূর্বে পণ্যের জন্য মসজিদ, মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থা করে।
এভাবে মানুষের উৎপাদিত পণ্যই মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করতে শুরু করে। বস্তুত এ কর্তৃত্ব পণ্যের ব্যবহার মূল্য অথবা অলৌকিক কোনো শক্তির কারণে নয়। উপরন্ত শ্রম পুঁজির অধীনে চলে যাওয়ার পর পুঁজিবাদী শ্রম প্রক্রিয়ায় বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদনের কারণেই এটি সম্ভব হয়। এভাবে উৎপাদন সম্পর্কগুলো একপর্যায়ে অলৌকিক গুণবিশিষ্ট পণ্যের আকারে মানুষের মনে প্রতিফলিত হয়। পুঁজিবাদী পণ্য উৎপাদনব্যবস্থা পণ্য ও উৎপাদন প্রদানের ক্ষেত্রে মানুষের এরূপ বিকৃত ও ভ্রান্ত বিশ্বাসকেই মার্কস পণ্যের বস্তুভক্তিবাদ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
পণ্যের বিনিময় মূল্য:
পণ্য হলো এমন একটি বস্তু, যা দিয়ে মানুষের কোনো একটি চাহিদা মেটায়। অন্যভাবে বলা যায়, পণ্য এমন এক বস্তু, যার সঙ্গে অন্য বস্তুর বিনিময় চলে আয় সকল পণ্যই হলো মূলত মানুষের শ্রমের ফসল। পণ্য উৎপাদন হলো সামাজিক সম্পর্কের এমন একটি ব্যবস্থা, যাতে ভিন্ন ভিন্ন উৎপাদক ভিন্ন ভিন্ন বস্ত্র তৈরি করে এবং বিনিময়ের মাধ্যমে সেসব বস্তুর সমীকরণ ঘটে।
ঐতিহাসিকভাবে পরিলক্ষিত হয় যে, মানুষ যখন শুধু নিজের ভোগের জন্য গণ্য উৎপাদন করত তখন তার কোনো মূল্য ছিল না কিন্তু যখনই মানুষ বিনিময় বা বাজারের উদ্দেশ্যে পণ্য উৎপাদন শুরু করে তখনই পণ্য মূল্যের বাহক হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং পণ্যের ব্যবহারিক ও বিনিময় মূল্যের প্রকাশ ঘটতে থাকে। এ কারণেই বিনিময়ের ক্ষেত্রে পণ্যের উদ্দেশ্য ব্যবহারিক ক্ষেত্রে পণ্যের উদ্দেশ্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
অর্থনীতিবিদদের মতানুযায়ী, প্রকৃতি প্রদত্ত প্রতিটি দ্রব্যেরই একটি স্বাভাবিক মূল্য রয়েছে। আর এই দ্রব্যের সাথে মানুষের শ্রম মিশ্রিত হয়ে যখন তা একটি প্রক্রিয়াজাত পণ্যে পরিণত হয় তখন তার নতুন মূল্য সৃষ্টি হয়। এই মূ্যেকে কৃত্রিম মূল্য বা বিনিময় মূল্য বলা হয়। সাধারণভাবে বলা যায়, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে শ্রম সংগ্রহ করার জন্য শ্রমিককে যে মূল্য দেওয়া হয়, সেটিই হলো বিনিময় মূল্য। আর যেকোনো দ্রব্যের বিনিময় মূল্যের শতকরা ৯৯ ভাগই সৃষ্টি হয় মানুষের শ্রম মিশ্রিত হওয়ার ফলে।
পণ্যের ব্যবহারিক মূল্য:
সাধারণভাবে বস্তুর চাহিদা মেটানোর ক্ষমতা তথা উপযোগিতা থেকে যে মূল্যের সৃষ্টি হয় সেটিকে বলা হয় ব্যবহার মূল্য বা ব্যবহারিক মূল্য। অন্যভাবে বলা যায়, শ্রমের ফলে সৃষ্ট দ্রব্যাদি বাজারজাত করে পুঁজিপতিরা যে মূল্য অর্জন করে সেটিকে বলা হয় পণ্যের ব্যবহারিক মূল্য। পুঁজিবাদে শ্রমশক্তি একটি পণ্য এবং এ কারণে এর মূল্য ব্যবহার রয়েছে। শ্রমশক্তির মূল্য হলো শ্রমিক ও তার পরিবারের ভারণপোষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনসাধারণের উপায়গুলোর মূল্যের সমান। পুঁজিপতি শ্রমশক্তির দাম দেয় এবং প্রতিদানে এই পণ্যাটির ব্যবহার মূল্য সে তার নিজের স্বার্থে যেমন ইচ্ছা শ্রমিককে কাজে লাগাতে পারে। শ্রমশক্তির ব্যবহার মূল্য অন্যসব পণ্যের ব্যবহার মূল্য থেকে আলাদা, শেষোক্তটি শুধু মূল্যের মূর্তরূপ। পক্ষান্তরে, শ্রমশক্তির ব্যবহারিক মূল্য পণ্যের মূল্য সৃষ্টি করে। শ্রমশক্তির ব্যবহার মূল্য হলো শ্রম প্রক্রিয়ার ভাড়াটে শ্রমিকের সেই মূল্য সৃষ্টি করার ক্ষমতা, যা শ্রমশক্তির মূল্য ছাড়িয়ে যায়। আর এই ব্যবহারিক মূল্যই পুঁজিপতির মুনাফার উৎস।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, সমাজবিজ্ঞানের দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোচক কার্ল মার্কস সমাজের অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি পণ্য, শ্রম, পণ্যের বিনিময় মূল্য, পণ্যের ব্যবহারিক মূল্য, পণ্য বস্তুভক্তিবাদ ইত্যাদি বিষয়েও তাত্ত্বিক আলোচনা করেন। যেখানে তিনি পণ্যের ব্যবহার উপযোগিতার ওপর ভিত্তি করে দ্রব্যবস্তুর মূল্য নির্ধারণের কথা বলেন। তাই সামাজিক তত্ত্বের পাশাপাশি অর্থনীতিতেও তাঁর এসব আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
