কার্ল মার্কসের বস্তুভক্তিবাদ তত্ত্বটি মূল্যায়ন কর

কার্ল মার্কসের বস্তুভক্তিবাদ তত্ত্বটি মূল্যায়ন কর

ভূমিকা: আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোচক কার্ল মার্কসের পণ্য ব্যবহার ও মূল্য সম্পর্কিত একটি মতবাদ হচ্ছে বস্তুভক্তিবাদ। উনবিংশ শতকের বস্তুভক্তিবাদ, যা ছিল ধর্মীয় বিষয়কে ব্যাখ্যা করার জন্য, তা কার্ল মার্কসের আলোচনায় ভিন্নরূপ পরিগ্রহ করে। অর্থনীতিতে যেখানে পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে চাহিদা ও জোগানের ওপর নির্ভর করা হয় সেখানে বস্তুভক্তিবাদে পণ্যের ব্যবহার উপযোগিতার ওপর ভিত্তি করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। তাই পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বস্তুভক্তিবাদ প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

কার্ল মার্কসের বস্তুভক্তিবাদ তত্ত্বটি মূল্যায়ন

কার্ল মার্কসের বস্তুভক্তিবাদ:

সাধারণভাবে বস্তুভক্তিবাদ বলতে কোনো বস্তুর মধ্যে অলৌকিক ক্ষমতা বিদ্যমান বলে বিশ্বাস স্থাপন করাকে বোঝায়। আর এ বস্তুভক্তিবাদ সম্পর্কে যেসব মতবাদ প্রচলিত তার মধ্যে কার্ল মার্কস কর্তৃক প্রদত্ত মতবাদটি অন্যতম। যেটি উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত এবং উৎপাদন ও ব্যক্তিত্বের মধ্যবর্তী সম্পর্কের সাথে বস্তুর মূল্য সম্পর্কের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

কার্ল মার্কস তাঁর 'Political Economy নামক গ্রন্থে পণ্যের বস্তুভক্তিবাদ সম্পর্কে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেন। তাঁর মতে, সামাজিক সম্পর্ক নির্ভর করে উৎপাদন সম্পর্কের ওপর। এটা ব্যক্তিদের মধ্যে সম্পদের ওপর নির্ভর করে না বরং বাজারে বিনিময় করা তথা বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করে। তাঁর মতে, পণ্যের বস্তুভক্তিবাদ ব্যক্তি ভিত্তিতে পরিবর্তিত হয়। মূলত বস্তুর প্রকৃত মূলোর চেয়ে ব্যক্তি যখন কোনো বস্তুতে অতিরিক্ত মূল্য আছে বলে বিশ্বাস স্থাপন করে তখনই তা বস্তুভক্তিবাদে পরিণত হয়। আর এর ওপর ভিত্তি করেই কার্ল মার্কস তাঁর বস্তুভক্তিবাদ অত্ত্বটি উপস্থাপন করেন। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

(ক) পণ্যের মূল্য নির্ধারণে পণ্য বিনিময়ের ভূমিকা:

মার্কস তাঁর Critique of Political Economy গ্রন্থে দেখান যে, পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমের সামাজিক গঠন বাজারের পণ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি এটি পণ্য ও সেবার ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। মানুষের মধ্যে উৎপাদন সম্পর্কে বিশেষত শ্রমিক ও মালিকের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থনৈতিক চরিত্র সেটি বাজারের পণ্য বিনিময়ের দ্বারা নির্ধারিত হয়। কার্ল মার্কস পণ্য বস্তুভক্তিবাদকে একটি দার্শনিক ধারণা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। শ্রমের উৎপাদন হিসেবে পণ্যের ধরন ও মুল্য সম্পর্ক যেটি আমাদের গোচরীভূত হয় বাস্তবিকভাবে পণ্যের ও বস্তুর সম্পর্কের দৈহিক প্রকৃতির সাথে এর কোনা সম্পর্ক নেই। মানুয়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্কগুলো বস্তু ও মানুষের সম্পর্কের দ্বারা প্রতিফলিত হয়। মানুষের মস্তিষ্কের স্বাধীন চিন্তা যা মানুষের জীবনকে রূপদান করে, সেটি একই সাথে প্রায় পারস্পারিক সম্পর্কেরও রূপদান করে এবং পুঁজিবাদী সমাজে এই পৃথিবী হচ্ছে পণ্যের সমষ্টি এবং এসব পণ্য মানুষের শ্রম দ্বারা তৈরি। আর মার্কস একেই পণ্য বস্তুভক্তিবাদ হিসেবে চিহ্নিত করেন, যেটি পণ্যের উৎপাদন এবং শ্রমের উৎপাদানের সাথে সম্পর্কিত।

(খ) অ্যাডাম স্মিথের ধারণার বিপরীত আচরণ:

পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে মার্কস অ্যাডাম স্মিথের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। এ্যাডাম স্মিথ পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেখানে স্বাধীন বাজারের মতবাদ প্রদান করেন কার্র মার্কস সেখানে পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে একে ভ্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে পণ্যের মূল্য হচ্ছে ছদ্মবেশী মূল্য। তাই তিনি পণ্যের ব্যবহার উপযোগিতার ওপর ভিত্তি করে দ্রব্যের বাস্তব মূল্য নির্ধারণ করার কথা বলেন। আর তাই বস্তুর ওপর প্রকৃত বা উপযোগী মূল্যের চেয়ে যে ছদ্মবেশী বা কাল্পনিক মূল্য পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে গ্রহন করা হয়, মার্কসের দৃষ্টিতে সে প্রসঙ্গে কার্যকরী দিক-নির্দেশনা প্রদান করে তার এই বস্তুতক্তিবাদ।

(গ) পণ্যের হরবেশী মূল্য:

কার্ল মার্কসের মতে, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে পণ্য একটি মুখোশধারী কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। যাতে পুরুষ ও নারী সম্পৃক্ত থাকে। এটি একেকটি স্তরায়িত সামাজিক শ্রেণির দ্বারা গঠিত সমাজের সাথে সম্পর্কিত। বিশেষত বাজার বিনিময় ব্যবস্থা ও এর সম্পর্কের মধ্যে পণ্য ও সেবার ক্রয়-বিক্রয় এমনভাবে আবির্ভূত হয়, যেগুলো প্রকৃতপক্ষে সেরকম হয়। ক্রেতা ও বিক্রেতার ভূমিকার মধ্যেই পণ্যের এই ছদ্মবেশ তৈরি হয়।

(গ) পণ্য ও অর্থের সামাজিক সম্পর্ক:

মার্কসের মতে, পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক তার ব্যক্তিগত শ্রমশক্তিকে পুঁজিপতির নিকট বিক্রয় করার জন্য তার সাথে একটি চুক্তি করে, যার মাধ্যমে সে কোনো বস্তুকে পণ্য বা সেবায় পরিণত করে। এই শ্রমচুক্তিই হচ্ছে একটি ছদ্মবেশী চুক্তি, যেটি শ্রমিকের শ্রমকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করে। শ্রমিকের শ্রমযুক্ত হয়ে যে পণ্য ও সেবা তৈরি হয় সেটির তুলনায় শ্রমিককে অনেক কম মূল্য প্রদান করা। মার্কস প্রতিষ্ঠা করেন যে, একটি পুঁজিবাদী সমাজে সম্পদ তৈরি হয় শ্রমের পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মূল্যের বিনিময়ে। দ্রব্যের অনিয়মিত মুল্য, যা ক্রয় ও বিক্রয় করা হয় সেগুলোর চাহিদা ও জোগানের দোদুল্যমানতার ওপর নির্ভরশীল। কারণ এগুলোর সামাজিক সহাবস্থান এবং অর্থ বাজারের বিনিময় প্রকাশিত হয়। পণ্য ও অর্থের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কগুলো ক্রমাগত সম্পর্কের ও প্রকাশিত হয়ে থাকে। একজন শ্রমিক তার শ্রমের মাধ্যমে যে দ্রব্য উৎপাদন করে সেগুলোর ওপর তার কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। পণ্য ও সেবার অন্তর্নিহিত মূল্যের ধারণাটি ব্যক্তিতের মধ্যকার অর্থনীতির সম্পর্কগুলোকে নির্ধারণ ও প্রভাবিত করে। সচেতন ও অসচেতনভাবে ক্রেতা বা বিক্রেতাদের অর্থনৈতিক প্রত্যাশিত যেটি দ্রব্যের মূল্যর সাথে সম্পর্কিত সেটিকে মেনে নেয়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় কার্ল মার্কস পণ্যের বস্তুভক্তিবাদ সম্পর্কে তার আলোচনায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যাখ্যায় বুদ্ধিবৃদ্ধিক চিন্তার ধারাকে ব্যাখ্যা করেন। পণ্যের মূল্য সম্পর্কে রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদরা মতামত ব্যক্ত করেন যে, মানবশ্রম পণ্যের দাম বা মূল্য দ্বারা প্রকাশ পেয়ে থাকে এবং শ্রমের সামগ্রিক মূল্য ও পণ্যের জোগানের পারস্পরিক মূল্য সম্পর্ক দ্বারা নির্ধারিত হয়। কার্ল মার্কস তাঁর এই বস্তুভক্তিবাদ দ্বারা প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদদের এই মতামতকে ভুল প্রমাণিত করার চেষ্টা করেন। তাই তাঁর এ তত্বের গুরুত্বকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন