এমিল ডুর্খেইমের ধর্মের সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা: পবিত্র ও অপবিত্রের ধারণা
সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে যে কজন মনীষী সমাজকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেছেন, তাদের মধ্যে ফরাসী সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim) অন্যতম। তার অমর সৃষ্টি 'The Elementary Forms of Religious Life' (১৯১২) গ্রন্থে তিনি ধর্মের যে সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রদান করেছেন, তা আজও সমাজবিজ্ঞানের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। আজকের এই পোস্টে আমরা ডুর্খেইমের দৃষ্টিতে ধর্মের স্বরূপ, টোটেমবাদ এবং পবিত্র ও অপবিত্রের ধারণা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ধর্মের সমাজতাত্ত্বিক সংজ্ঞা
সাধারণত আমরা ধর্ম বলতে সৃষ্টিকর্তা বা অলৌকিক কোনো শক্তিতে বিশ্বাস করাকে বুঝি। কিন্তু এমিল ডুর্খেইম ধর্মকে অলৌকিকতার চশমায় না দেখে সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখেছেন। তার মতে, ধর্ম হলো একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান যা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে।
ডুর্খেইম ধর্মের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন: "ধর্ম হলো পবিত্র বস্তুসমূহকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিশ্বাস ও আচারের এক সুসংবদ্ধ ব্যবস্থা, যা তার অনুসারীদের একটি একক নৈতিক সম্প্রদায়ে রূপান্তরিত করে।"
অর্থাৎ, ধর্মের মূল কাজ হলো মানুষকে একটি সাধারণ বিশ্বাস ও নৈতিকতার বন্ধনে আবদ্ধ করা।
ধর্ম: পবিত্র (Sacred) ও অপবিত্র (Profane) ধারণা
ডুর্খেইমের ধর্মতত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো জগতকে দুটি ভাগে ভাগ করা: পবিত্র (Sacred) এবং অপবিত্র (Profane)। তার মতে, পৃথিবীর সব বস্তুই এই দুই ভাগে বিভক্ত।
১. পবিত্র (Sacred)
পবিত্র বলতে এমন সব বস্তু বা বিষয়কে বোঝায় যা সাধারণ জীবন থেকে আলাদা, শ্রেষ্ঠ এবং ভীতিমিশ্রিত সম্মানের উদ্রেক করে। কোনো বস্তু জন্মগতভাবে পবিত্র নয়; সমাজ যখন কোনো বস্তুকে বিশেষ মর্যাদা দেয়, তখনই তা পবিত্র হয়ে ওঠে। যেমন- একটি পাথর সাধারণ হতে পারে (অপবিত্র), কিন্তু সেই পাথরটি যদি কোনো মন্দিরের বিগ্রহ হয়, তবে তা পবিত্র মনে করা হয়।
২. অপবিত্র (Profane)
অপবিত্র বলতে এমিল ডুর্খেইম কোনো খারাপ বা মন্দ জিনিসকে বোঝাননি। বরং 'সাধারণ' বা 'দৈনন্দিন' জীবনের কার্যকলাপকে তিনি অপবিত্র বলেছেন। যেমন- খাওয়া-দাওয়া, চাকরি করা বা চাষবাস করা। যা পবিত্র নয়, তাই অপবিত্র।
অর্থাৎ- পবিত্র এবং অপবিত্রের মাঝে একটি অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর থাকে। ধর্মীয় আচারের মাধ্যমেই মানুষ সাময়িকভাবে অপবিত্র জগত থেকে পবিত্র জগতে প্রবেশ করে।
টোটেমবাদ: ধর্মের আদি রূপ
ডুর্খেইম ধর্মের উৎস সন্ধানে অস্ট্রেলিয়ার আদিম 'অ্যারান্টা' (Arunta) উপজাতির ধর্মবিশ্বাস পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি দেখেন যে, তারা কোনো ঈশ্বর নয় বরং 'টোটেম' (Totem)-কে কেন্দ্র করে জীবন পরিচালনা করে।
টোটেম: টোটেম হলো কোনো নির্দিষ্ট প্রাণী, গাছ বা বস্তু যা একটি গোত্রের প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়। গোত্রের মানুষ বিশ্বাস করে তাদের পূর্বপুরুষ বা তাদের শক্তির উৎস হলো এই টোটেম। টোটেমকে তারা চরম সম্মান করে এবং তার কোনো ক্ষতি করে না।
ডুর্খেইম যুক্তি দেন যে, টোটেম আসলে গোত্রেরই প্রতীক। যখন মানুষ টোটেমকে পূজা করছে, তখন তারা আসলে পরোক্ষভাবে নিজেদের সমাজকেই পূজা করছে।
ধর্মের সামাজিক ভূমিকা ও সংহতি
ডুর্খেইম বিশ্বাস করতেন, ধর্মের প্রধান কাজ হলো সামাজিক সংহতি (Social Solidarity) রক্ষা করা। এটি কীভাবে কাজ করে তা নিম্নে আলোচনা করা হলো:
যৌথ চেতনা (Collective Consciousness): ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান পালনের সময় মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থ ভুলে সমষ্টিগত ভাবনায় মগ্ন হয়। এর ফলে সমাজে একতা তৈরি হয়।
নৈতিক নিয়ন্ত্রণ: ধর্ম মানুষকে কিছু নিয়ম-নীতি ও মূল্যবোধ শেখায় যা সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
মানসিক প্রশান্তি: বিপদে বা দুর্যোগে ধর্মীয় প্রার্থনা মানুষকে ধৈর্য ধরতে শেখায় এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে রক্ষা করে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডুর্খেইমের ধর্মতত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা
অনেকে মনে করেন আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের প্রসারের ফলে ধর্মের প্রভাব কমে যাবে। কিন্তু ডুর্খেইমের তত্ত্ব অনুযায়ী, ধর্ম রূপান্তর হতে পারে কিন্তু বিলুপ্ত হবে না। আধুনিক সমাজে জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত বা বিশেষ বিশেষ দিবস পালনকেও ডুর্খেইমের তত্ত্বে 'নাগরিক ধর্ম' (Civil Religion) হিসেবে দেখা যায়। কারণ এগুলোও মানুষকে একটি 'পবিত্র' অনুভূতির মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ করে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, এমিল ডুর্খেইম ধর্মকে আধ্যাত্মিক জগত থেকে টেনে এনে বাস্তবের সাথে স্থাপন করেছেন। তার মতে, মানুষ যখন একসাথে উপাসনা করে, তখন তারা আসলে নিজেদের অস্তিত্ব এবং সামাজিক বন্ধনকেই উদযাপন করে। তার এই বিশ্লেষণ ধর্মের মনস্তাত্ত্বিক দিকের চেয়ে সামাজিক দিকটিকে অনেক বেশি জোরালোভাবে তুলে ধরেছে, যা সমাজবিজ্ঞানের গবেষণায় একটি মাইলফলক হয়ে আছে।
আরও পড়ুন সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও বিকাশে এমিল ডুর্খেইমের অবদানসমূহ বিস্তারিত।
