অর্থনৈতিক বস্তুবাদ কাকে বলে। বস্তুবাদ ও ভাববাদের মধ্যে পার্থক্য লিখ

অর্থনৈতিক বস্তুবাদ কী? মার্কসীয় বস্তুবাদ ও হেগেলীয় ভাববাদের মধ্যে পার্থক্য

ভূমিকা: অর্থনৈতিক বস্তুবাদ (Economic Determinism বা Economic Materialism) হলো কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস প্রবর্তিত একটি বিশেষ সমাজতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজের ভিত্তি হলো তার অর্থনৈতিক কাঠামো, যা সমাজের অন্যান্য সকল বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করে।

অর্থনৈতিক বস্তুবাদ কাকে বলে। বস্তুবাদ ও ভাববাদের মধ্যে পার্থক্য লিখ

অর্থনৈতিক বস্তুবাদ:

অর্থনৈতিক বস্তুবাদ, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মতো এতটা বিকাশমান বা প্রক্রিয়াশীল তত্ত্ব বা ধারণা নয়। এটি এক ধরনের একপেশে ঐতিহাসিক ধারণা, যার অর্থ হলো এই যে, সামাজিক বিকাশে অর্থনৈতিক উপাদানই একমাত্র শক্তি। এটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানাদি, ধারণা, মতবাদ ইত্যাদির তাৎপর্য স্বীকার করে না। বস্তুবাদী ধারণার একটি অর্বাচীন ধরন হিসেবে একপক্ষে অর্থনৈতিক বস্তুবাদ প্রচারিত হয়েছিল। পাশ্চাতে, বার্নস্টাইন এবং রাশিয়ার বিধানিক মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদগণ এ মতের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন। মার্কসবাদীগণ সমাজ বিকাশে রাজনীতি ও অর্থনীতিকে মিথস্ক্রিয় বলে মনে করেন। উপরিকাঠামোগত একটি উপাদান হিসেবে রাজনীতি একটি সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রতিফলিত করে। রাজনীতির মধ্যেই শ্রেণিগত স্বার্থসমূহ প্রকাশ পায় এবং সেই কারণে এটি অর্থনীতির উপর বিরাট প্রভাব বিস্তার করে। এদিক থেকে বলা যায়, অর্থনীতির উপর রাজনীতির প্রধান্য থাকে। কেননা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যতীত একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি তার অর্থনৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে বা বজায় রাখতে পারে না।

সহজ কথায় বলা যায়, অর্থনৈতিক বস্তুবাদ হলো এমন একটি মতবাদ যা বিশ্বাস করে যে একটি সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থা বা উৎপাদন পদ্ধতিই সেই সমাজের রাজনীতি, আইন, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং সামাজিক চিন্তাধারার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে।

মার্কসীয় বস্তুবাদ ও হেগেলীয় ভাববাদের মধ্যে পার্থক্য

সমাজতাত্ত্বিক দর্শনের ক্ষেত্রে দুটি বিপরীতধর্মী ধারণা বা তত্ত্ব বা মতবাদ হচ্ছে বস্তুবাদ ও ভাববাদ। বস্তুবাদী ধারণা অনুযায়ী বস্তুই প্রথম এবং প্রধান এবং বস্তু থেকেই যাবতীয় চিন্তার সূত্রপাত হয়। বস্তুজগতের বাইরে অন্য কিছু সম্পর্কে চিড়া করার অবকাশ নেই। বস্তুই শুরু এবং বস্তুই শেষ। অপরদিকে, ভাববাদের মূলকথা হলো সকল সত্তার ভিত্তি মন বা চেতনা। অর্থাৎ, মন বা জ্ঞানই প্রথম এবং প্রধান। মনই আসল এবং বস্তুর অস্তিত্ব নির্ভর করে মন না জ্ঞানের উপর।

বস্তুবাদ ও ভাববাদের মধ্যে পার্থক্য:

বস্তুবাদ এবং ভাববাদের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। নিম্নে বস্তুবাদ ও ভাববাদের মধ্যে পার্থক্যসমূহ তুলে ধরা হলো-

১. সংজ্ঞাগত: যে মতবাদ বা তত্ত্ব অনুযায়ী বস্তুই শুরু এবং বস্তুই শেষ, তথা বস্তু থেকেই যাবতীয় চিন্তার সূত্রপাত হয় বলে মনে করা হয় তাকে বলা হয় বস্তুবাদ। অপরদিকে, মন বা চেতনাকে সকল সত্তার ভিত্তি হিসেবে মনে করে মন বা জ্ঞানকে প্রথম এবং প্রধান হিসেবে বিবেচনা করে যে তত্ত্ব বা মতবাদ গড়ে ওঠে তাকে বলা হয় ভাববাদ।

২. বিষয়বস্তুগত: চারপাশের জগৎ সত্য না মিথ্যা এ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মতবাদকে বলা হয় বস্তুবাদ। বস্তুবাদের মূল বিষয়বস্তু হিসেবে বস্তুকেই গ্রহণ করা হয় এবং এখানে মন, চেতনা এবং ভাবকে অপ্রধান হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে, ভাববাদ জগৎ ব্যাখ্যার এমন এক পদ্ধতি, যেখানে মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে আত্মা বা চেতনা। এখানে বস্তুর তুলনায় আত্মা বা চৈতন্যকে আদি মনে করা হয়।।

৩. ধর্ম সংশ্লিষ্টতা: ভাববাদ মূলত ধর্ম বা ঈশ্বর তত্ত্ব। অতিপ্রকৃত শক্তি ও বিশ্বাসের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অপরদিকে, বস্তুবাদে ধর্মকে একপাশ করে বাস্তব জীবনকেই মুখ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়

৪. বৈপরীত্য: বস্তুবাদ ও ভাববাদ দুটি বিপরীত ধারণা বা মতবাদ। কারণ ভাববাদ যেখানে আত্মা বা মনকে বস্তুর চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়, সেখানে বস্তুবাদে বস্তুকেই প্রধান বলে স্বীকার করা হয়।

৫. জগৎ বিশ্বাস: ভাববাদ দুই জগতে বিশ্বাসী। যথা-ভাবজগৎ ও বস্তুজগৎ। আর বস্তুবাদ একটি জগতেই বিশ্বাসী। আর তা হলো বস্তুজগৎ।

৬. যৌক্তিকতা বনাম রক্ষণশীলতা: ভাববাদ একটি রক্ষনশীলতা ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। অপরদিকে, বস্তুরাদ একটি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত ধারণা।

৭. স্বতন্ত্র অস্তিত্ব: ভাববাদ অনুযায়ী, বস্তুর অস্তিত্ব নির্ভর করে মন বা জগতের উপর। বস্তুর মন বা জানের নিরাপদ্ধ কোনো সত্তা নেই। অন্যদিকে, বস্তুবাদ মন বা জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল, যা বস্তুর অস্তিত্ব অস্বীকার করে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অভিমত হলো বস্তুবাদ ও ভাববাদ। মানুষের চেতনার বিকাশে আদিকাল থেকেই মানুষের মাঝে এই দুই মতবাদের দ্বন্দ্ব চলে আসছে। তাই ভাববাদ ও পরিপূর্ণভাবে জান লাভ করতে হলে উপরে উবাদার্থক্যগুলো সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা আবশ্যক।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন