ফয়েরবাকের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি তত্ত্বটি সমালোচনাসহ আলোচনা কর

ফয়েরবাকের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি তত্ত্ব আলোচনা

ভূমিকা: জার্মান দর্শনের ইতিহাসে লুডভিগ ফয়েরবাক (Ludwig Feuerbach) এক অনন্য নাম। তিনি মূলত হেগেলের চরম ভাববাদী দর্শনের প্রবল বিরোধিতার মধ্য দিয়ে তাঁর নিজস্ব বস্তুবাদী চিন্তাধারা গড়ে তোলেন। হেগেল যেখানে 'ভাব' বা 'আইডিয়া'কে জগতের মূল চালিকাশক্তি মনে করতেন, ফয়েরবাক সেখানে ধারণাকে বর্জন করে দ্বান্দ্বিকতার ক্ষেত্রে যান্ত্রিক বস্তুবাদের (Mechanical Materialism) অবতারণা করেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তীতে কার্ল মার্কসকে তাঁর বিখ্যাত 'দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ' গঠনে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

ফয়েরবাকের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি তত্ত্বটি সমালোচনা

ফয়েরবাকের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির তত্ত্ব

মার্কসীয় বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ফয়েরবাকের বস্তুবাদী চিন্তাভাবনা যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। প্রখ্যাত জার্মান এ দার্শনিক ছিলেন বস্তুবাদী। আর এজন্য তিনি ভাববাদকে গ্রহণ না করে দর্শনকেও তার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করেন। তিনি দ্বান্দ্বিকতা সম্পর্কে তার নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে হেগেলের তত্ত্বের সমালোচনা করেন।

ধর্ম ও অতিপ্রাকৃত শক্তির বিরোধিতা:

হেগেল যেখানে মানুষ ও প্রকৃতির স্রষ্টা হিসেবে অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন, ফয়েরবাক সেখানে ধর্মের মূলে আঘাত করেন। তাঁর মতে, প্রকৃতি এবং মানুষই হলো একমাত্র বাস্তব অস্তিত্ব। এর বাইরে কোনো শক্তির ধারণা কেবল মানুষের অনুমান বা কল্পনা মাত্র।

প্রকৃতিই আদি সত্তা:

ফয়েরবাকের মতে, প্রকৃতিই মানুষকে সৃষ্টি করেছে। তাঁর বিখ্যাত উক্তি হলো "ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টি করেননি, বরং মানুষই তার প্রয়োজনে নিজের আদলে ঈশ্বরকে সৃষ্টি করেছে।"

যান্ত্রিক বস্তুবাদ:

ফয়েরবাক হেগেলের দ্বন্দ্ববাদকে সমালোচনা করতে গিয়ে এমন এক বস্তুবাদের কথা বলেন, যেখানে মানুষের চিন্তা ও কর্মের ভূমিকা কিছুটা চাপা পড়ে যায়। তিনি জগতকে একটি যন্ত্রের মতো গতিশীল মনে করতেন, যে কারণে কার্ল মার্কস তাঁর এই মতবাদকে 'যান্ত্রিক বস্তুবাদ' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

তবে এক্ষেত্রে আবার মার্কস ও এঙ্গেলস ফয়েরবাকের বস্তুবাদী দর্শনের এবং সমাজ সম্পর্কিত ভাববাদী ব্যাখ্যায় কঠোর সমালোচনা করেন। ফয়েরবাকের দর্শনের মধ্যে যে সকল ত্রুটি রয়েছে সেগুলো দূরীভূত করে তারা বস্তুবাদকে একটি সঠিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করেন।

সমালোচনা

ফয়েরবাকের দ্বান্দ্বিকতা সম্পর্কিত 'তত্ত্বটি ভাববাদী দার্শনিক হেগেলের দ্বান্দ্বিকতা সম্পর্কিত তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে উপস্থাপিত হলেও তার এ তত্ত্বটি বিভিন্ন সমালোচনা ও তাত্ত্বিকদের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে সমালোচিত হয়েছে। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১. ভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ তত্ত্ব

ফয়েরবাক মূলত হেগেলীয় দর্শনকে সমালোচনা করে তা প্রত্যাখ্যান করেন কিন্তু এটা করতে গিয়ে তিনি প্রাপ্তির বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। আর তা হলো হেগেলের ভাববাদ। এই ডাববাদকে খণ্ডন করতে গিয়ে ফয়েরবাক তার দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিকে বর্জন করেন। একদিকে তিনি ভাববাদকে খণ্ডন করেন আর অন্যদিকে তিনি দ্বান্দ্বিক তত্ত্বকে গুরুত্বহীন করে দূরত্বের সৃষ্টি করেন। ভাববাদ সাপেক্ষে থেকে তিনি দর্শনকে মুক্ত করতে চাইলেও তিনি নিজেই দর্শনকে আবার যান্ত্রিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ করেন।

২. একতরফা সমালোচনা

কোনো দর্শনকেই শুধুমাত্র সমালোচনার মাধ্যমে খণ্ডন করা যায় না, তেমনি হেগেলের দর্শন খণ্ডিত হয়ে যায় না। মূলত যে-কোনো তত্ত্ব বা দর্শনের সমালোচনার মাধ্যমে তার নেতিবাচক দিকটি মুছে ফেলে তার। ইতিবাচক দিকটি উদ্ধার করার চেষ্টা করা হয় কিন্তু ফয়েরবাক এ কাজটি করতে সক্ষম হন নি। তিনি তার সমালোচনার মাধ্যমে ভাববাদ ও দ্বন্দ্বতত্ত্ব উভয়েরই বিলোপ সাধন করেছেন।

৩. সুনির্দিষ্ট কোনো তত্ত্ব নয়

যদিও ফয়েরবাক ছিলেন বস্তুবাদী কিন্তু তাঁর ধর্ম ও নীতিসংক্রান্ত ধারণায় ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি এক নতুন ধরনের ধর্মের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, মানব মনই ধর্মের ভিত্তি। তার মতে, মানৰ হৃদয়ভিত্তিক ধর্মের পরিবর্তন দ্বারাই মানব ইতিহাসের যুগ বিভাগ করা যায়। প্রাকৃতিক জগতের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তাঁর দর্শন বস্তুবাদী, তবে মানব ইতিহাস বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তা ভাববাদী। এহেন পরিস্থিতিতে তার তত্ত্ব অসংগতিতে পর্যবসিত হয়।

৪. অর্থনৈতিক ভূমিকা অস্বীকার:

ফয়েরবাক তার তত্ত্বে মানবতার মুক্তির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক মুক্তির পরিবর্তে মানব হৃদয়ের পরিবর্তনের দিকটির কথা প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, তিনি মানবতার মুক্তির প্রত্যাশা করেছেন মানব প্রেমের মাধ্যমে। ভাববাদী অবস্থানের কারণে ফয়েরবাকের পক্ষে উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তনের মাধ্যমে মানব ইতিহাসের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়নি।

৫. বস্তুর অভ্যন্তরীণ শক্তির কথা অনুপস্থিত

ফয়েরবাকের বস্তুবাদ ছিল যান্ত্রিক। তিনি মনে করতেন বস্তুতে গতি সঞ্চার হয় কেবল বাহ্যিক শক্তির প্রভাবে। কিন্তু দ্বন্দ্ববাদের মূল কথা হলো বস্তুর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা শক্তি। ফয়েরবাক বস্তুর এই অভ্যন্তরীণ বিকাশের নিয়মটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

৬. মার্কসের সমালোচনা

মার্কসের মতে, ফয়েরবাকের বস্তুবাদের ত্রুটির অন্যতম দিক হলো এখানে বস্তুকে কেবলমাত্র Object হিসেবে দেখা হয়েছে কিন্তু Subject হিসেবে নয়। ফলশ্রুতিতে তিনি বস্তু ও চেতনার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বুঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন। আর এজন্যই তার বস্তুবাদ নিষ্ক্রিয় বস্তুবাদ, তথা যান্ত্রিক বস্তুবাদে পরিণত হয়েছে।

উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ফয়েরবাকের দ্বান্দ্বিকতা সম্পর্কিত তত্ত্ব বা ধারণাটি উপরিউক্তভাবে সমালোচিত হয়েছে। মূলত হেগেলের তত্ত্বের সমালোচনার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ফয়েরবাকের এ মতবাদ ছিল মূলত যান্ত্রিক বস্তুবাদ। আর কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস যৌক্তিক সমালোচনার মাধ্যমে ফয়েরবাকের দর্শনের ত্রুটি ও অসংগতি দূর করেন। তাঁরা দ্বান্দ্বিক তত্ত্বকে হেগেলীয় দর্শন থেকে মুক্ত করে বস্তুবাদী ভিত্তির উপর রচনা করেন এবং একই সঙ্গে বস্তুবাদকে ফয়েরবাকের যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের করে এনে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবেই মূলত সৃষ্টি হয় 'দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ' তত্ত্ব।

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন